10>||-পরা প্রকৃতি ও অপরা প্রকৃতি-||
<---------আদ্যনাথ-------->( © )
সপ্তম ও অষ্টম অধ্যায়-----
সহস্র সহস্র মনুষ্যের মধ্যে হয়ত একজন
প্রকৃত জ্ঞান লাভের জন্য চেষ্টা করেন,
তাহার মধ্যে কেহ হয়তো যত্ন করিয়া সিদ্ধি লাভ করিয়াছেন।
এহেন সিদ্ধি প্রাপ্ত সহস্রের মধ্যে হয়ত
একজন ঈশ্বরের প্রকৃত স্বরূপ
জানিতে পারেন ।
"যাঁহাদিগকে তত্ত্বজ্ঞানী বা আত্মজ্ঞানী বলে, তাঁহাদিগেরও সহস্র জনের মধ্যে হয়ত একজন আমার প্রকৃত স্বরূপ জানেন । উহা অতি গুহ্য বিষয় ।"
"অচেতনা অপরা প্রকৃতি দেহাদিরূপে (ক্ষেত্র) পরিণাম প্রাপ্ত হয়, চেতনা পরা প্রকৃতি বা জীবচৈতন্য (ক্ষেত্রজ্ঞ) ভোক্তৃরূপে দেহে প্রবেশ করিয়া দেহাদি ধারণ করিয়া রাখে । এই দুই প্রকৃতি আমারই প্রকৃতি, আমা হইতেই উৎপন্ন বা আমারই বিভাব, সুতরাং আমিই প্রকৃতপক্ষে জগতের কারণ ।"
"সকল পদার্থেরই যাহা সার, যাহা প্রাণ, তাহাতেই আমি অধিষ্ঠান করি । আমা ব্যতীত জল রসহীন, শশিসূর্য্য প্রভাবহীন, আকাশ শব্দহীন, পুরুষ পৌরুষহীন হয়; অর্থাৎ আমার সত্তায়ই সকলের সত্তা ।"
ক্ষিতি, অপ্ (জল), তেজ, মরুৎ (বায়ু), ব্যোম (আকাশ), মন, বুদ্ধি, অহঙ্কার,
ঈশ্বর প্রকৃতি এইরূপ অষ্টভাগে ভেদ প্রাপ্ত হইয়াছে । এই অষ্টবিধা প্রকৃতিই ঈশ্বরের অপরা প্রকৃতি ।
আর জীবরূপা চেতনাত্মিকা হইল
পরা প্রকৃতি।
শ্রী কৃষ্ণ অর্জুনকে বলিলেন----
"হে মহাবাহো,
সেই পরা প্রকৃতিদ্বারা জগৎ বিধৃত রহিয়াছে।
সমস্ত ভূত এই দুই প্রকৃত হইতে জাত, ইহা জানিও । সুতরাং আমিই নিখিল জগতের উৎপত্তি ও লয়ের কারণ । (সুতরাং আমি প্রকৃতপক্ষে জগতের কারণ) । "
"হে ধনঞ্জয়, আমা অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ পরমার্থ-তত্ত্ব অন্য কিছুই নাই; সূত্রে মণি-সমূহের ন্যায় সর্বভূতের অধিষ্ঠানস্বরূপ আমাতে এই সমস্ত জগৎ রহিয়াছে । "
"হে কৌন্তেয়, জলে আমি রস, শশিসূর্য্যে আমি প্রভা, সর্ববেদে আমি ওঙ্কার, আকাশে আমি শব্দ, মনুষ্য মধ্যে আমি পৌরুষরূপে বিদ্যমান আছি । "
"আমি পৃথিবীতে পবিত্র গন্ধ, অগ্নিতে তেজ, সর্বভূতে জীবন এবং তপস্বীদগের
তপঃস্বরূপ।"
"হে পার্থ, আমাকে সর্বভূতের সনাতন বীজ বলিয়া জানিও । আমি বুদ্ধিমান্দিগের বুদ্ধি এবং তেজস্বিগণের তেজঃস্বরূপ।"
"হে ভরতর্ষভ, আমিই বলবান্দিগের কামরাগরহিত বল (অর্থাৎ স্বধর্মানুষ্ঠান সমর্থ সাত্ত্বিক বল) এবং প্রাণিগণের ধর্মের অবিরোধী কাম (অর্থাৎ দেহ ধারণাদির উপযোগী শাস্ত্রানুমত বিষয়াভিলাষ) ।"
"শমদমাদি সাত্ত্বিক ভাব, হর্ষদর্পলোভাদি রাজসিক ভাব, শোকমোহাদি তামসিক ভাব, এই সকলই আমা হইতে জাত । কিন্তু আমি সে সকলে অবস্থিত নহি (অর্থাৎ জীবের ন্যায় সেই সকলের অধীন নহি), কিন্তু সে সকল আমাতে আছে (অর্থাৎ তাহারা আমার অধীন) ।"
"এই ত্রিবিধ গুণময় ভাবের দ্বারা (সত্ত্বরজস্তমোগুণ দ্বারা) সমস্ত জগৎ মোহিত হইয়া রহিয়াছে, এ-সকলের অতীত অক্ষয় আনন্দস্বরূপ আমাকে স্বরূপতঃ জানিতে পারে না ।"
"এই ত্রিগুণাত্মিকা অলৌকিকী আমার মায়া নিতান্ত দুস্তরা । যাহারা একমাত্র আমারই শরণাগত হইয়া ভজনা করেন, তাহারাই কেবল এই সুদুস্তরা মায়া উত্তীর্ণ হইতে
পারেন।"
"পাপকর্মপরায়ণ, বিবেকশূন্য নরাধমগণ মায়াদ্বারা হতজ্ঞান হইয়া আসুর স্বভাব প্রাপ্ত হওয়ায় আমাকে ভজনা করে না ।"
"হে ভরতর্ষভ, হে অর্জুন, যে সকল সুকৃতিশালী ব্যক্তি আমাকে ভজনা করেন, তাহারা চতুর্বিধ - আর্ত, জিজ্ঞাসু, অর্থাথী এবং জ্ঞানী ।"
"ইহাদিগের মধ্যে জ্ঞানী ভক্তই শ্রেষ্ঠ । তিনি সতত আমাতেই যুক্তচিত্ত এবং একমাত্র আমাতেই ভক্তিমান্ । আমি জ্ঞানীর অত্যন্ত প্রিয় এবং তিনিও আমার অত্যন্ত প্রিয় ।"
"ইহারা সকলেই মহান্ । কিন্তু জ্ঞানী আমার আত্মস্বরূপ, ইহাই আমার মত; যেহেতু মদেকচিত্ত সেই জ্ঞানী সর্বোৎকৃষ্ট গতি যে আমি সেই আমাকেই আশ্রয় করিয়া
থাকেন ।"
"জ্ঞানী ভক্ত অনেক জন্মের পর “বাসুদেবই সমস্ত” এইরূপ জ্ঞান লাভ করিয়া আমাকে প্রাপ্ত হন; এইরূপ মহাত্মা অতি দুর্লভ ।"
"(স্ত্রীপুত্র ধনমানাদি বিবিধ) কামনাদ্বারা যাহাদের বিবেক অপহৃত হইয়াছে, তাহারা নিজ নিজ কামনা-কলুষিত স্বভাবের বশীভূত হইয়া ক্ষুদ্র দেবতাদের আরাধনায় ব্রতোপবাসাদি যে সকল নিয়ম আছে তাহা পালন করিয়া অন্য দেবতার ভজনা করিয়া থাকে । (আমার ভজনা করে না)।"
"যে যে সকাম ব্যক্তি ভক্তিযুক্ত হইয়া শ্রদ্ধাসহকারে যে যে দেবমূর্তি অর্চনা করিতে ইচ্ছা করে, আমি (অন্তর্যামিরূপে) সেই সকল ভক্তের সেই সেই দেবমূর্তিতে ভক্তি অচলা করিয়া দেই ।"
"সেই দেবোপাসক মৎবিহিত শ্রদ্ধাযুক্ত হইয়া সেই দেবমূর্তির অর্চনা করিয়া থাকে এবং সেই দেবতার নিকট হইতে নিজ কাম্যবস্তু লাভ করিয়া থাকে, সেই সকল আমাকর্তৃকই বিহিত (কেননা সেই সকল দেবতা আমারই অঙ্গস্বরূপ)।"
"কিন্তু অল্পবুদ্ধি সেই দেবোপাসকগণের আরাধনালব্ধ ফল বিনাশশীল; দেবোপাসকগণ দেবলোক প্রাপ্ত হন, আর আমার ভক্তগণ আমাকেই লাভ করিয়া থাকেন ।"
"অল্পবুদ্ধি ব্যক্তিগণ আমার নিত্য সর্বোৎকৃষ্ট পরম স্বরূপ না জানায় অব্যক্ত আমাকে প্রাকৃত মনুষ্যবৎ ব্যক্তিভাবাপন্ন মনে করে।"
"আমি যোগমায়ায় সমাচ্ছন্ন থাকায় সকলের নিকট প্রকাশিত হই না । অতএব মূঢ় এই সকল লোক জন্মমরণরহিত আমাকে পরমেশ্বর বলিয়া জানিতে পারে না ।"
"হে অর্জুন, আমি ভূত, ভবিষ্যৎ, বর্তমান সমস্ত পদার্থকে জানি; কিন্তু আমাকে কেহই জানে না ।"
"হে ভারত, হে পরন্তপ, সৃষ্টিকালে অর্থাৎ স্থূলদেহ উৎপন্ন হইলেই প্রাণিগণ রাগদ্বেষজনিত সুখ-দুঃখাদি দ্বন্দ্ব কর্তৃক মোহ প্রাপ্ত হইয়া হতজ্ঞান হয় (সুতরাং আমাকে জানিতে পারে না) ।"
" কিন্তু পুণ্যকর্ম দ্বারা যাহাদের পাপ বিনষ্ট হইয়াছে, সেই সকল দ্বন্দ্বমোহনির্মুক্ত ধীরব্রত ব্যক্তি আমাকে ভজনা করিয়া থাকেন ।"
" যাহারা আমাতে চিত্ত সমাহিত করিয়া জরামরণ হইতে মুক্তি লাভের জন্য যত্ন করেন, তাহারা সেই সনাতন ব্রহ্ম, সমগ্র অধ্যাত্মবিষয় এবং সমস্ত কর্মতত্ত্ব অবগত হন ।"
" যাহারা অধিভূত, অধিদৈব এবং অধিযজ্ঞের সহিত আমাকে (অর্থাৎ আমার এই সকল বিভিন্ন বিভাবসহ সমগ্র আমাকে) জানেন, সেই সকল ব্যক্তি আমাতে আসক্তচিত্ত হওয়ায় মৃত্যুকালে আমাকে জানিতে পারেন । মরণকালে মূর্চ্ছিত হইয়াও আমাকে বিস্মৃত হন না । (সুতরাং মদ্ভক্তগণের মুক্তিলাভের কোন বিঘ্ন নাই) ।"
========================
জ্ঞান ও বিজ্ঞান :------
'এই নশ্বর সৃষ্টি-প্রপঞ্চের মধ্যে যে অবিনশ্বর পরতত্ত্ব অন্তর্নবিষ্ট রহিয়াছেন তাহা জানিবার নাম জ্ঞান, আর সেই একই নিত্য পরম তত্ত্ব হইতে এই বিবিধ নশ্বর পদার্থের উৎপত্তি কিরূপে হয়, তাহা বুঝিবার নাম বিজ্ঞান ।' [লোকমান্য তিলক]
<---------আদ্যনাথ-------->( © )
সপ্তম ও অষ্টম অধ্যায়-----
সহস্র সহস্র মনুষ্যের মধ্যে হয়ত একজন
প্রকৃত জ্ঞান লাভের জন্য চেষ্টা করেন,
তাহার মধ্যে কেহ হয়তো যত্ন করিয়া সিদ্ধি লাভ করিয়াছেন।
এহেন সিদ্ধি প্রাপ্ত সহস্রের মধ্যে হয়ত
একজন ঈশ্বরের প্রকৃত স্বরূপ
জানিতে পারেন ।
"যাঁহাদিগকে তত্ত্বজ্ঞানী বা আত্মজ্ঞানী বলে, তাঁহাদিগেরও সহস্র জনের মধ্যে হয়ত একজন আমার প্রকৃত স্বরূপ জানেন । উহা অতি গুহ্য বিষয় ।"
"অচেতনা অপরা প্রকৃতি দেহাদিরূপে (ক্ষেত্র) পরিণাম প্রাপ্ত হয়, চেতনা পরা প্রকৃতি বা জীবচৈতন্য (ক্ষেত্রজ্ঞ) ভোক্তৃরূপে দেহে প্রবেশ করিয়া দেহাদি ধারণ করিয়া রাখে । এই দুই প্রকৃতি আমারই প্রকৃতি, আমা হইতেই উৎপন্ন বা আমারই বিভাব, সুতরাং আমিই প্রকৃতপক্ষে জগতের কারণ ।"
"সকল পদার্থেরই যাহা সার, যাহা প্রাণ, তাহাতেই আমি অধিষ্ঠান করি । আমা ব্যতীত জল রসহীন, শশিসূর্য্য প্রভাবহীন, আকাশ শব্দহীন, পুরুষ পৌরুষহীন হয়; অর্থাৎ আমার সত্তায়ই সকলের সত্তা ।"
ক্ষিতি, অপ্ (জল), তেজ, মরুৎ (বায়ু), ব্যোম (আকাশ), মন, বুদ্ধি, অহঙ্কার,
ঈশ্বর প্রকৃতি এইরূপ অষ্টভাগে ভেদ প্রাপ্ত হইয়াছে । এই অষ্টবিধা প্রকৃতিই ঈশ্বরের অপরা প্রকৃতি ।
আর জীবরূপা চেতনাত্মিকা হইল
পরা প্রকৃতি।
শ্রী কৃষ্ণ অর্জুনকে বলিলেন----
"হে মহাবাহো,
সেই পরা প্রকৃতিদ্বারা জগৎ বিধৃত রহিয়াছে।
সমস্ত ভূত এই দুই প্রকৃত হইতে জাত, ইহা জানিও । সুতরাং আমিই নিখিল জগতের উৎপত্তি ও লয়ের কারণ । (সুতরাং আমি প্রকৃতপক্ষে জগতের কারণ) । "
"হে ধনঞ্জয়, আমা অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ পরমার্থ-তত্ত্ব অন্য কিছুই নাই; সূত্রে মণি-সমূহের ন্যায় সর্বভূতের অধিষ্ঠানস্বরূপ আমাতে এই সমস্ত জগৎ রহিয়াছে । "
"হে কৌন্তেয়, জলে আমি রস, শশিসূর্য্যে আমি প্রভা, সর্ববেদে আমি ওঙ্কার, আকাশে আমি শব্দ, মনুষ্য মধ্যে আমি পৌরুষরূপে বিদ্যমান আছি । "
"আমি পৃথিবীতে পবিত্র গন্ধ, অগ্নিতে তেজ, সর্বভূতে জীবন এবং তপস্বীদগের
তপঃস্বরূপ।"
"হে পার্থ, আমাকে সর্বভূতের সনাতন বীজ বলিয়া জানিও । আমি বুদ্ধিমান্দিগের বুদ্ধি এবং তেজস্বিগণের তেজঃস্বরূপ।"
"হে ভরতর্ষভ, আমিই বলবান্দিগের কামরাগরহিত বল (অর্থাৎ স্বধর্মানুষ্ঠান সমর্থ সাত্ত্বিক বল) এবং প্রাণিগণের ধর্মের অবিরোধী কাম (অর্থাৎ দেহ ধারণাদির উপযোগী শাস্ত্রানুমত বিষয়াভিলাষ) ।"
"শমদমাদি সাত্ত্বিক ভাব, হর্ষদর্পলোভাদি রাজসিক ভাব, শোকমোহাদি তামসিক ভাব, এই সকলই আমা হইতে জাত । কিন্তু আমি সে সকলে অবস্থিত নহি (অর্থাৎ জীবের ন্যায় সেই সকলের অধীন নহি), কিন্তু সে সকল আমাতে আছে (অর্থাৎ তাহারা আমার অধীন) ।"
"এই ত্রিবিধ গুণময় ভাবের দ্বারা (সত্ত্বরজস্তমোগুণ দ্বারা) সমস্ত জগৎ মোহিত হইয়া রহিয়াছে, এ-সকলের অতীত অক্ষয় আনন্দস্বরূপ আমাকে স্বরূপতঃ জানিতে পারে না ।"
"এই ত্রিগুণাত্মিকা অলৌকিকী আমার মায়া নিতান্ত দুস্তরা । যাহারা একমাত্র আমারই শরণাগত হইয়া ভজনা করেন, তাহারাই কেবল এই সুদুস্তরা মায়া উত্তীর্ণ হইতে
পারেন।"
"পাপকর্মপরায়ণ, বিবেকশূন্য নরাধমগণ মায়াদ্বারা হতজ্ঞান হইয়া আসুর স্বভাব প্রাপ্ত হওয়ায় আমাকে ভজনা করে না ।"
"হে ভরতর্ষভ, হে অর্জুন, যে সকল সুকৃতিশালী ব্যক্তি আমাকে ভজনা করেন, তাহারা চতুর্বিধ - আর্ত, জিজ্ঞাসু, অর্থাথী এবং জ্ঞানী ।"
"ইহাদিগের মধ্যে জ্ঞানী ভক্তই শ্রেষ্ঠ । তিনি সতত আমাতেই যুক্তচিত্ত এবং একমাত্র আমাতেই ভক্তিমান্ । আমি জ্ঞানীর অত্যন্ত প্রিয় এবং তিনিও আমার অত্যন্ত প্রিয় ।"
"ইহারা সকলেই মহান্ । কিন্তু জ্ঞানী আমার আত্মস্বরূপ, ইহাই আমার মত; যেহেতু মদেকচিত্ত সেই জ্ঞানী সর্বোৎকৃষ্ট গতি যে আমি সেই আমাকেই আশ্রয় করিয়া
থাকেন ।"
"জ্ঞানী ভক্ত অনেক জন্মের পর “বাসুদেবই সমস্ত” এইরূপ জ্ঞান লাভ করিয়া আমাকে প্রাপ্ত হন; এইরূপ মহাত্মা অতি দুর্লভ ।"
"(স্ত্রীপুত্র ধনমানাদি বিবিধ) কামনাদ্বারা যাহাদের বিবেক অপহৃত হইয়াছে, তাহারা নিজ নিজ কামনা-কলুষিত স্বভাবের বশীভূত হইয়া ক্ষুদ্র দেবতাদের আরাধনায় ব্রতোপবাসাদি যে সকল নিয়ম আছে তাহা পালন করিয়া অন্য দেবতার ভজনা করিয়া থাকে । (আমার ভজনা করে না)।"
"যে যে সকাম ব্যক্তি ভক্তিযুক্ত হইয়া শ্রদ্ধাসহকারে যে যে দেবমূর্তি অর্চনা করিতে ইচ্ছা করে, আমি (অন্তর্যামিরূপে) সেই সকল ভক্তের সেই সেই দেবমূর্তিতে ভক্তি অচলা করিয়া দেই ।"
"সেই দেবোপাসক মৎবিহিত শ্রদ্ধাযুক্ত হইয়া সেই দেবমূর্তির অর্চনা করিয়া থাকে এবং সেই দেবতার নিকট হইতে নিজ কাম্যবস্তু লাভ করিয়া থাকে, সেই সকল আমাকর্তৃকই বিহিত (কেননা সেই সকল দেবতা আমারই অঙ্গস্বরূপ)।"
"কিন্তু অল্পবুদ্ধি সেই দেবোপাসকগণের আরাধনালব্ধ ফল বিনাশশীল; দেবোপাসকগণ দেবলোক প্রাপ্ত হন, আর আমার ভক্তগণ আমাকেই লাভ করিয়া থাকেন ।"
"অল্পবুদ্ধি ব্যক্তিগণ আমার নিত্য সর্বোৎকৃষ্ট পরম স্বরূপ না জানায় অব্যক্ত আমাকে প্রাকৃত মনুষ্যবৎ ব্যক্তিভাবাপন্ন মনে করে।"
"আমি যোগমায়ায় সমাচ্ছন্ন থাকায় সকলের নিকট প্রকাশিত হই না । অতএব মূঢ় এই সকল লোক জন্মমরণরহিত আমাকে পরমেশ্বর বলিয়া জানিতে পারে না ।"
"হে অর্জুন, আমি ভূত, ভবিষ্যৎ, বর্তমান সমস্ত পদার্থকে জানি; কিন্তু আমাকে কেহই জানে না ।"
"হে ভারত, হে পরন্তপ, সৃষ্টিকালে অর্থাৎ স্থূলদেহ উৎপন্ন হইলেই প্রাণিগণ রাগদ্বেষজনিত সুখ-দুঃখাদি দ্বন্দ্ব কর্তৃক মোহ প্রাপ্ত হইয়া হতজ্ঞান হয় (সুতরাং আমাকে জানিতে পারে না) ।"
" কিন্তু পুণ্যকর্ম দ্বারা যাহাদের পাপ বিনষ্ট হইয়াছে, সেই সকল দ্বন্দ্বমোহনির্মুক্ত ধীরব্রত ব্যক্তি আমাকে ভজনা করিয়া থাকেন ।"
" যাহারা আমাতে চিত্ত সমাহিত করিয়া জরামরণ হইতে মুক্তি লাভের জন্য যত্ন করেন, তাহারা সেই সনাতন ব্রহ্ম, সমগ্র অধ্যাত্মবিষয় এবং সমস্ত কর্মতত্ত্ব অবগত হন ।"
" যাহারা অধিভূত, অধিদৈব এবং অধিযজ্ঞের সহিত আমাকে (অর্থাৎ আমার এই সকল বিভিন্ন বিভাবসহ সমগ্র আমাকে) জানেন, সেই সকল ব্যক্তি আমাতে আসক্তচিত্ত হওয়ায় মৃত্যুকালে আমাকে জানিতে পারেন । মরণকালে মূর্চ্ছিত হইয়াও আমাকে বিস্মৃত হন না । (সুতরাং মদ্ভক্তগণের মুক্তিলাভের কোন বিঘ্ন নাই) ।"
========================
জ্ঞান ও বিজ্ঞান :------
'এই নশ্বর সৃষ্টি-প্রপঞ্চের মধ্যে যে অবিনশ্বর পরতত্ত্ব অন্তর্নবিষ্ট রহিয়াছেন তাহা জানিবার নাম জ্ঞান, আর সেই একই নিত্য পরম তত্ত্ব হইতে এই বিবিধ নশ্বর পদার্থের উৎপত্তি কিরূপে হয়, তাহা বুঝিবার নাম বিজ্ঞান ।' [লোকমান্য তিলক]