Tuesday, December 9, 2025

37>|| পূণ্যভূমি ভারতবর্ষ ||

   37> || পূণ্যভূমি ভারতবর্ষ  ||


   শ্রী শ্রী রামকৃষ্ণ পরমহংস দেব--

 (18/02/1836 ---16/08/1886)

   শ্রী শ্রী মা সারদা দেবী--

 (22/12/1853---20/07/1920)


আজ 1951 সালে ঘটে যাওয়া দুটি চিরস্মরণীয় ঘটনার কথা একটু বলবো।

আমাদের আনন্দপূর্ন প্রার্থনা করা এবং চিরস্বরণীয়  সেই বিশেষ দিন হল

 11 ই মে 1951  শঙ্করপঞ্চমীর দিন।


এইদিনেই ঘটেছিল বিশেষ কিছু পূণ্য কর্ম যে পূণ্য কর্মের আশীষে ধন্য আমরা, ধন্য আমাদের পূণ্যভূমি  ভারতভূমি।

এই 11 মে 1951 শঙ্করপঞ্চমীর দিনটি 

শঙ্করাচার্য ও রামানুজাচার্যের  জন্ম তিথি।

এ-হেন বিশেষ দিনেই সংগঠিত হয়ে ছিল দুই মহান পূণ্য কর্ম।


প্রথমটি-- ইতিহাস থেকে জানতে পারি  যে  গজনীর সুলতান মামুদ সোমনাথের শিবমন্দিরকে ভেঙে লুট করে, তছনছ করে দিয়েছিল 1025 সালে।

 সেই  সোমনাথ মন্দির আবার পুনঃনির্মিত হয়েছে এই বিশেষ দিনেই--

 "নবনির্মিত মন্দিরে নয়শো পঁচিশ বছর পরে পুনঃঅধিষ্ঠিত হয়েছেন সোমনাথে শিবজী ওই 11 মে 1951 তারিখেই। 'বেদান্ত কেশরী' তাই ওই তারিখটিকে বর্ণনা করেছিলেন ভারতের 'নতুন মে দিবস'

 বলে।"

 

দ্বিতীয়টি:--11 মে1951 কামারপুকুর শ্রী রামকৃষ্ণ মন্দির প্রতিষ্ঠার তারিখ। 

 "ধন্য কামারপুকুর। তুমি এ যুগের শ্রেষ্ঠ তীর্থ; ভগবানের পদযুগল বক্ষে ধারণ করিয়া তুমি মহাপুণ্যভূমিতে পরিণত হইয়াছ। বহু মানুষের মনের কথা যথোপযুক্ত এই ভাবে ও ভাষায় লিপিবদ্ধ করেছিল উদ্বোধন পত্রিকা, তার 1353 রের অক্টোবর সংখ্যায়, কামারপুকুরের মন্দির প্রতিষ্ঠার উৎসবের বিবরণ প্রকাশ করতে গিয়ে।"

 জমিদারের অসৎ ব্যবহারে অতিষ্ঠ হয়ে সচ্ছল ব্রাহ্মণ ক্ষুদিরাম রাতারাতি নিঃস্ব হয়ে যখন সপরিবার দেরেগ্রাম ছাড়লেন।

তখন সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন তাঁর বন্ধু কামারপুকুরের সুখলাল গোস্বামী। জিনি নিজ সম্পত্তির এক অংশে চিরকালের জন্য আশ্রয় দিলেন একান্ত বন্ধু সৎজন ক্ষুদিরামকে।

যেটি আমাদের হৃদয়ের কাছেই

আমাদের হৃদস্পন্দনে সর্বদা অনুভূত হয়।

"শান্তির শ্রীনিকেতন শ্রীরামকৃষ্ণের পৈতৃক ভিটা। কিন্তু সে স্থানটি আজ চেনা দুষ্কর। অতি মনোরম এক মন্দির-সেখানে গড়ে উঠেছে সেই ঢেঁকিশালটির উপর, যেখানে জন্ম নিয়েছিলেন শ্রীরামকৃষ্ণ।..."


"মন্দির-প্রতিষ্ঠা উৎসব হয়েছিল এই 

  11 মে 1951 তারিখে। এই অনুষ্ঠানের বিশেষ অঙ্গ হচ্ছে পূজা-অনুষ্ঠান। বিরাট পূজাপর্ব চলেছিল তিনদিন ব্যাপী। প্রতিষ্ঠার আগের দিন সন্ধ্যায় অধিবাস, তারপর যাগযজ্ঞ, হল-রুদ্রযাগ, সপ্তশতী হোম, কালীপূজা, গভীর নিশীথে দশমহাবিদ্যার পূজা প্রভৃতি বহুবিধ অনুষ্ঠানে পূজামণ্ডপ দিবারাত্র মুখর হল। পূজামণ্ডপটি সুন্দরভাবে সাজানো হয়েছে, মঙ্গলঘট, বিরাট হোমকুণ্ড, মণ্ডপের উপরের নানা রঙের পতাকা প্রভৃতিতে একটি অপরূপ আবহাওয়ার সৃষ্টি হল। শ্রীরামকৃষ্ণ সঙ্ঘের বিশিষ্ট পূজকেরা এসেছেন ব্রতী হয়ে, এসেছেন কাশীধাম থেকে দক্ষ পুরোহিতেরা-তাঁদের ছন্দোবদ্ধ শুদ্ধ সংস্কৃত উচ্চারণে প্রাচীনকালের সামগান মুখরিত আশ্রমপ্রাঙ্গণের কথা কারু মনে পড়েছিল।..."

১০ মে রাত্রিবেলাতেই উপস্থিত সবাইকে জানিয়ে দেওয়া হল যে,,--"পরের দিন মঙ্গল উষায় মন্দিরের দ্বারোদ্ঘাটন হবে। রাত পোয়াতেই সকলেই প্রস্তুত সেই শুভক্ষণটির জন্য। মন্দির প্রদক্ষিণ করে [করতে?] একটি শোভাযাত্রা বেরুল, সন্ন্যাসীরা রয়েছেন পুরোভাগে, গান আরম্ভ হোল, 'এসেছে আজ নতুন মানুষ দেখবি যদি আয় চলে।' ঐ নতুন মানুষটিরই মর্মর বিগ্রহ রয়েছেন মন্দিরের ভেতরে।”------ "মন্দির প্রদক্ষিণ আরম্ভ হল, পূজ্যপাদ স্বামী শঙ্করানন্দী নিয়েছেন - আত্মারামকে, বিশুদ্ধানন্দজীর মাথায় রয়েছেন শ্রীশ্রীঠাকুরের ছবি, যতীশ্বরানন্দজী নিয়েছেন শ্রীশ্রীমাকে,

আর আত্মপ্রকাশানন্দজীকে দেখা যাচ্ছে স্বামীজীর ছবি মাথায় নিতে। গানের সহযোগে মন্দির তিনবার প্রদক্ষিণ করা হল। এরপর গর্ভমন্দিরের দ্বার খুলে গেল-জয় শ্রীগুরু মহারাজজী কী জয়, জয় মহামায়ী কী জয়, জয় স্বামীজী মহারাজ কী জয় প্রভৃতি জয়ধ্বনি সহ মহারাজরা মন্দিরে প্রবেশ করলেন। সঙ্ঘাধ্যক্ষের শ্রীহস্ত থেকে প্রাপ্ত 'আত্মারামের কৌটা' পূজ্যপাদ স্বামী শঙ্করানন্দজী মহারাজ তাঁরই প্রতিনিধিস্বরূপ মন্দির অভ্যন্তরে প্রতিষ্ঠা করলেন।"----- “শ্রীশ্রীঠাকুর, শ্রীশ্রীমা ও স্বামীজীর ছবি রাখা হল মন্দিরের সামনে পূজামণ্ডপে।”--------

"শিল্প-বোদ্ধা আর এক প্রত্যক্ষদর্শী সন্ন্যাসী বর্ণনা করেছেন মন্দির ও বিগ্রহের নান্দনিক বৈশিষ্ট্যগুলি :----

"সরলরৈখিক এবং কৌণিকভাবে এটি একটি অনন্যসুন্দর স্থাপত্যকীর্তি। এটি অতীতের অনুকরণমাত্র নয় বা একটি স্থাবর ধারণাও নয়। এটি একটি মৌলিক কীর্তি, যা সম্ভবত ভারতীয় স্থাপত্যের ধরনে একটি নতুন গতিশীলতার সূচনা। মন্দিরটির সৌন্দর্য প্রধানত তার সরলতা এবং আলঙ্কারিক অনাড়ম্বরতার মধ্যে নিহিত। শিবলিঙ্গের আকৃতিতে গঠিত চূড়াটি অসাধারণ অভিব্যক্তিপূর্ণ। শ্রীরামকৃষ্ণের জন্মের ঠিক পূর্বে যুগী শিবের থেকে উদ্ভূত উজ্জ্বল আভা শ্রীরামকৃষ্ণের মাতা চন্দ্রাদেবীর শরীরে লীন হয়ে যায়, যা ঐশ্বরিক সন্তানের পৃথিবীতে আগমনের ইঙ্গিত দিয়েছিল, মন্দির চূড়ায় প্রতীকীভাবে তাঁকে উপস্থাপন করা হয়েছে।

মন্দিরটি ধূসর চুনার পাথরে শান্ত মর্যাদা দিয়েছে এবং তাকে শ্রীরামকৃষ্ণের পৈতৃক বাড়ির মাটির কুটির এবং কামারপুকুরের গ্রামীণ পরিবেশের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করেছে। রঘুবীরের জন্য একটি ছোট মন্দিরও তৈরি করা হয়েছে। 

এই মন্দিরটিও অত্যন্ত মনোরম এবং পরিবেশের সঙ্গে নিখুঁতভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ।... শ্রীরামকৃষ্ণ মন্দিরের অভ্যন্তরে মনোমুগ্ধকর স্তম্ভ এবং সুন্দর কাঠের আচ্ছাদন সম্বলিত একটি মার্বেল বেদী নির্মিত হয়েছে। উক্ত বেদীর সামনের দিকে একটি ঢেঁকি, একটি উনুন এবং একটি বাতিস্তম্ভের উপরে রাখা প্রদীপের ছবি খোদাই করা রয়েছে। পরিবারের ধান ভানার ঢেঁকিটি যে-ছোট চালাঘরে রাখা থাকত, সেই চালাঘরটিকে স্মরণীয় করে রাখার জন্য এই শিল্প-প্রয়াস; 


কারণ --মাটির সেই চালাঘরটিরই এক কোণে শিশু শ্রীরামকৃষ্ণের জন্ম হয়েছিল। বেদীতে স্থাপিত হয়েছে শ্রীরামকৃষ্ণের একটি সুন্দর মার্বেল মুর্তি। মূর্তিটি প্রায় দুই ফুট ছয় ইঞ্চি উচ্চ এবং দেখতে জীবন্ত। মূর্তিটির নির্মাতা কুমারটুলির বিখ্যাত মৃৎশিল্পী ও ভাস্কর শ্রীমণি পাল।""

মন্দির ও বিগ্রহের উদ্বোধনের পর সন্ন্যাসী ও ভক্তদের এক বিরাট শোভাযাত্রা ঠাকুর, মা ও স্বামীজীর প্রতিকৃতি নিয়ে কামারপুকুর থেকে রওনা হয়ে শ্রীরামকৃষ্ণের বাল্য ক্রীড়াক্ষেত্র মাণিকরাজার আম্রকাননের দিকে এগোতে থাকে।

অপর দিকে জয়রামবাটি থেকেও এক বিরাট শোভাযাত্রা ঠাকুর ও মায়ের প্রতিকৃতি সহ কামারপুকুরের দিকে অগ্রসর হতে থাকে। বহু সাধু, ভক্ত নরনারী, গায়কের দল, লাঠি ও মাদলসহ নৃত্যরত অসংখ্য সাঁওতাল তাতে যোগদান করতে অবশেষে থাকে। করে। শ্রীশ্রীমায়ের প্রতিকৃতি বহন করে আনছিলেন মহিলারা। উভয় শোভাযাত্রা মাণিকরাজার আমবাগানে মিলিত হলে বিপুল উদ্দীপনার সৃষ্টি হয়। এরপর সম্মিলিত শোভাযাত্রাটি কামারপুকুরে শ্রীরামকৃষ্ণের লীলাবিজড়িত প্রতিটি স্থান প্রদক্ষিণ করতে থাকে।

অবশেষে নবনির্মিত শ্রীরামকৃষ্ণ-মন্দির, শ্রীরঘুবীরের মন্দির ও শ্রীরামকৃষ্ণের বাসগৃহ প্রদক্ষিণ করে শোভাযাত্রা শেষ হয়। শোভাযাত্রাটির সমগ্র যাত্রাপথে সর্বক্ষণ অগণিত গ্রামবাসী দুপাশে ভক্তিবিগলিত চিত্তে দাঁড়িয়ে মুহুর্মুহু শ্রীরামকৃষ্ণের জয়ধ্বনি দিয়েছিল।

১১ মে-র অনুষ্ঠানে পার্শ্ববর্তী গ্রাম থেকে এসেছিলেন প্রায় কুড়ি হাজার মানুষ। প্রসাদ বিতরণ চলেছিল দুপুর একটা থেকে বিকেল চারটে পর্যন্ত এবং প্রায় সাড়ে সাত হাজার মানুষ আনন্দ ও ভক্তি সহকারে প্রসাদ গ্রহণ করেছিলেন। মাইক্রোফোনে ও লাউডস্পিকারের মাধ্যমে সারাদিন বিভিন্ন ভাষায় শ্রীরামকৃষ্ণের জীবন ও উপদেশ সম্বন্ধে বক্তৃতা, শ্রীরামকৃষ্ণ-পুঁথি ও স্বামীজীর গ্রন্থাবলী থেকে পাঠ এবং ভজন, সংগীত প্রভৃতি চলছিল। সংগীতের মধ্যে কোয়েম্বাতোর রামকৃষ্ণ মিশন বিদ্যালয়ের ছাত্রদের দ্বারা পরিবেশিত দক্ষিণ-ভারতীয় সংগীত শ্রোতাদের বিশেষ ভাল লেগেছিল। 'ভূতির খাল'-এর কাছে একটি মঞ্চে প্রসিদ্ধ ব্যায়ামবীর বিষ্ণু ঘোষের দল ব্যায়াম প্রদর্শন করেন এবং শ্রীবুদ্ধ বসু কেদারনাথ, বদরিনাথ ও কৈলাস-মানস যাত্রার চলচ্চিত্র প্রদর্শন করেন। তৃতীয় দিন অর্থাৎ ১২ মে অনুষ্ঠিত হয় 'সপ্তশতী হোম'। তিনদিনের সম্মিলিত অনুষ্ঠানে প্রায় পঞ্চাশ হাজার নরনারী যোগদান করেছিলেন। গ্রামবাংলায় যাত্রা অত্যন্ত জনপ্রিয়, তাই বিখ্যাত 'হাওড়া সমাজ'কে আনা হয়েছিল যাত্রাভিনয়ের জন্য। মন্দিরের সামনের বিরাট মঞ্চে ১১ মে রাতে তাঁরা পরিবেশন করেন 'নদের নিমাই' এবং ১২ মে 'নীলাচলে শ্রীচৈতন্য।' অভিনয় ও পরিবেশনা অতীব উচ্চমানের হলেও সাধারণ গ্রামবাসীরা শহরে শিল্পীদের নাটকীয় উৎকর্ষ অনুধাবন করতে পারে না। তারা বলতে থাকে "রাজা নেই, মন্ত্রী নেই, ঢাল-তলোয়ার নেই, যুদ্ধ নেই-এ কোন্ দেশী

যাত্রা? একে আবার যাত্রা বলে?" উৎসবের তিনদিন খাওয়া-দাওয়া, অনুষ্ঠান সবকিছু ঘড়ি ধরে হয়েছে। কোনও দুর্ঘটনা ঘটেনি,"

তিনদিনের এই অভূতপূর্ব অনুষ্ঠান দেখে, সরল গ্রামবাসীরা সন্ন্যাসীদের অলৌকিক শক্তিমান ভেবেছিলেন। তাই সাধুরা যখন উৎসবের পাট চুকিয়ে ফিরে আসছেন, তখন তাঁদের কেউ কেউ সাধুদের কাছে সনির্বন্ধ অনুরোধ জানিয়েছিলেন: আপনাদের উৎসব তো হয়ে গেল; এবার দয়া করে বৃষ্টির ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নিন-যাতে আমরা চাষবাস করতে পারি।

পূজ্যপাদ বিরজানন্দজী গুরুতর অসুস্থ থাকায় মন্দির প্রতিষ্ঠার পরদিনই, ১২ মে, শঙ্করানন্দজী বেলুড় মঠে ফিরে আসেন এবং পূজনীয় মহারাজের ঘরে গিয়ে উৎসবের সমস্ত বিবরণ দেন। উৎসব নির্বিঘ্নে সম্পন্ন হয়েছে জেনে মহারাজের মুখে গভীর পরিতৃপ্তির চিহ্ন ফুটে ওঠে। তাঁর জন্য শঙ্করানন্দজী ঠাকুরের পূজার যে-নির্মাল্য সঙ্গে এনেছিলেন, পরম শ্রদ্ধায় তিনি তা গ্রহণ করেন। ওই মাসেরই ৩০ তারিখে তিনি শ্রীরামকৃষ্ণ-সারদাপদে লীন হলেন। পূজনীয় শঙ্করানন্দজী সপ্তম সঙ্ঘাধ্যক্ষ-পদে বৃত হলেন ১৯ জুন ১৯৫১।

কামারপুকুরের মন্দির প্রতিষ্ঠা প্রসঙ্গে পরবর্তী কালে শঙ্করানন্দজী বলেছিলেন, "মহারাজ (স্বামী ব্রহ্মানন্দ) আমায় তাঁর ব্যবহৃত একখানি কাপড় ও চাদর দিয়েছিলেন, বলেছিলেন, 'অমূল্য এ দুটো কাছে রেখে দাও-পরে কাজে লাগবে।' আমি যত্ন 144 করে রেখে দিয়েছিলাম। ওই শুভদিনে (১১ মে ১৯৫১) মন্দির ও ঠাকুরের মূর্তি প্রতিষ্ঠা করলাম ঐকাপড় পরে, চাদর গায়ে দিয়ে। মহারাজকে উপস্থিত দেখলাম ঠাকুরঘরে-ঠাকুরের পাশে দাঁড়িয়ে আছেন। মহারাজের কথা আজ অক্ষরে অক্ষরে ফলে গেল।"

শ্রীরামকৃষ্ণ-ভক্তদের মধ্যে কথামৃতকার শ্রীম-ই প্রথম কামারপুকুর দর্শন করেছিলেন। ঠাকুর তখন স্থলশরীরে ছিলেন। শ্রীম সমগ্র কামারপুকুরকে জ্যোতির্ময় দেখেছিলেন। সে-বোধ এতটাই স্পষ্ট একটি বিড়ালকেও জ্যোতির্ময় দেখেছিলেন এবং তাকে সাষ্টাঙ্গ প্রণাম করেছিলেন পথের উপরেই। 'জ্যোতির জ্যোতি'-কে হৃদিকন্দরে ধারণ করে যে-কামারপুকুর চিরজ্যোতির্ময় হয়ে আছে, সেই পুণ্যক্ষেত্রকে আমাদের নিরন্তর প্রণাম। শ্রীমন্দিরের পঁচাত্তর বছর পূর্তির প্রাক্কালে তাঁকে আমাদের বিশেষ প্রণাম!

======================

  || ঠাকুর ও শ্রী মা ||


ঠাকুর নিজেই খুঁজে নিয়েছিলেন নিজের  সহধর্মিনী, সংসারপথে চলার জন্য নয়,তাঁর নিজের ইষ্ট পথের সহায়ক সঙ্গিনী রূপে সাধনার পথে  এগিয়ে যাবার জন্য।


উনিশ শতকে প্রচলিত প্রথা অনুযায়ী, সারদা দেবীর মাত্র 5 বছর বয়সে 

(1859 সালে) তাঁর বিবাহ হয়েছিল, যখন শ্রীরামকৃষ্ণ দেবের  বয়স ছিল 23 বছর।


যদিও সারদা দেবীর 18 বছর বয়সে

 তাঁর পিত্রালয় ছেড়ে স্বামীর সঙ্গে দেখা করতে দক্ষিণেশ্বরে আসেন, যখন শ্রীরামকৃষ্ণদেব তাঁর দেহ ও মন ঈশ্বরের সন্ধানে উৎসর্গ করে সন্ন্যাসীর জীবন যাপন করছিলেন।

ঠাকুর শ্রী রামকৃষ্ণদেব ও মা সারদা দেবীর  

এই বিবাহ কোনো জাগতিক উদ্দেশ্য নিয়ে হয়নি, বরং এটি ছিল এক পবিত্র আধ্যাত্মিক সম্পর্ক স্থাপনের নিদর্শন, যা জগতে আদর্শ দাম্পত্য জীবন ও নারী-পুরুষের পবিত্র সম্পর্কের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হিসাবে বিবেচিত হয়।

যেখানে শ্রীরামকৃষ্ণদেব সারদা দেবীকে ষোড়শী পূজার মাধ্যমে দেবী রূপে পূজা করেছিলেন। 

 সারদা দেবী রামকৃষ্ণ পরমহংসের পত্নী ও সাধনাসঙ্গিনী হিসেবে রামকৃষ্ণ আন্দোলন ও রাকৃষ্ণ মিশন ও রামকৃষ্ণ মাঠের প্রসারে এক অনস্বীকার্য ভূমিকা পালন করেন এবং ভক্তদের কাছে 'শ্রীশ্রীমা' নামে পরিচিত হন। 



            "সংগ্রহীত"

স্বামী বলভদ্রানন্দের  ( সহকারী সাধারণ সম্পাদক রামকৃষ্ণ মঠ ও রসমকৃষ্ণ মিশন)  লেখা 

"কমারপুকুর শ্রী রামকৃষ্ণ-মন্দিরের পঁচাত্তর বছর" এর  কিছু অংশ মাত্র।

  <----আদ্যনাথ রায় চৌধুরী---->

=======================

Saturday, November 15, 2025

36>|| ★★ बहुत जरूरी सत्य वचन★★

   36>|| ★★ बहुत जरूरी सत्य  वचन★★


             || सत्य  वचन  ||


इस दुनिया में लगभग सभी लोग संशय तथा संदेह और असंशय तथा निःसंदेह के बीच तनाव के कारण बेचैन रहते हैं।


संदेह से हमेशा बेचैनी, असंतोष, सदा दुःख,  अज्ञानता उत्पन्न होती है।

और निःसंदेह से शांति, संतोष, सच्चा खुश,

शाश्वत ज्ञान प्राप्त होता है।

    <-----आद्यनाथ राय चौधरी---->


【【【|| সংশয় এবং অসংশয় ||


এ-জগতে সংশয় ও অসংশয় ,তথা

সন্দেহ ও নিঃসন্দেহর টানাপোড়েনে প্রায় সব মানুষের মন দোলায়িত হয়।

সংশয় থেকে আসে অশান্তি, অতৃপ্ত , দুঃখ, চির অজ্ঞান; 

আর অসংশয় থেকে আসে শান্তি,তৃপ্তি ও সুখ, প্রকৃত জ্ঞান।】】】

=================



======================




             थोड़ा ध्यान से पड़े।

संभव होतो सोम बार करे ।

प्रत्येक सोमवार करे तो बहुत अच्छे।

21 सोमवार करे तो और अच्छे।

मै तो बोलेंगे लगातार 21 सोमवार करे।


फिर 21 दिन बाद ।(21 days off)


फिर 21 दिन पाठ करे।(again 21 days pray)



 बहुत इंपॉर्टेंट तीन मंत्र बहुत सावधानी से 

निर्देश अनुसार जप करना है।

इस मंत्र कोई ना देखे,  ना कोई सुने।

ऐसे तो हर किताब में इस मंत्र लिखे हुए है।

किंतु इस लिखको कोई ना देखे नहीं मंत्र पाठ करते कोई ना सुने।


प्रत्येक मंत्र की शक्ति अलग अलग।

अतः एकसाथ में तीन मंत्र नहीं करना है।

प्रत्येक  मंत्र 21बार करनेकी अंत में एकबार प्रार्थना करना है।

    ★★ॐ हनुमते नमः।

     ★★ॐ हं हनुमते नमः।

     ★★ॐ श्री बज्र हनुमते नमः।

===================


★★"ॐ हनुमते नमः।" इस मंत्र की 21 बार जप के बाद में एक बार :----

  प्रार्थना करे::----

ॐ नमो हनुमते  रुद्रावताराय 

सर्व शत्रु संहारणाय,

सर्व रोग हराय,

सर्व वशीकरणाय,

राम दूताय स्वाहा।


एक बार इस प्रार्थना की अंत में थोड़ा भाखड़ा सिंदूर हनुमानजिकी चरण में अर्पित करे(हनुमान जीकी फोटो होनेसेभी कोई दिक्कत नहीं)

●●●●●●●●●●●●●●●

★★★★★★★★★★★★★★★

●●●●●●●●●●●●●●●


★★"ॐ हं हनुमते नमः।" इस मंत्र की भी 

  21 बार जप के बाद में एक बार :----

  प्रार्थना करे::----

ॐ नमो हनुमते  रुद्रावताराय 

सर्व शत्रु संहारणाय,

सर्व रोग हराय,

सर्व वशीकरणाय,

राम दूताय स्वाहा।


एक बार इस प्रार्थना की अंत में थोड़ा भाखड़ा सिंदूर हनुमानजिकी चरण में अर्पित करे(हनुमान जीकी फोटो होनेसेभी कोई दिक्कत नहीं)

===================

★★★★★★★★★★★★★★

■■■■■■■■■■■■■■■■


★★"ॐ श्री बज्र हनुमते नमः।"

इस मंत्र की भी 21 बार जप के बाद में एक बार :----

  प्रार्थना करे::

ॐ नमो हनुमते  रुद्रावताराय 

सर्व शत्रु संहारणाय,

सर्व रोग हराय,

सर्व वशीकरणाय,

राम दूताय स्वाहा।


एक बार इस प्रार्थना की अंत में थोड़ा भाखड़ा सिंदूर हनुमानजिकी चरण में अर्पित करे(हनुमान जीकी फोटो होनेसेभी कोई दिक्कत नहीं)

■■■■■■■■■■■■■■■■

===================

मंत्र जप 21x 3

एवं प्रार्थना तीन बार होंगे।


सारे मंत्र पाठ एवं प्रार्थना की अंत में हनुमान जी की चरण से उस भाखड़ा सिंदूर की टीका लीजिए। घर की सभीको  सिंदूर की टीका दीजिए।

=====================


Every day morning 


पूर्व तरफ मुंह करके इस प्रार्थना प्रत्येक दिन करे।

ऐसा तो ----

महा रोग शोक तथा  सर्व पाप से मुक्ति के लिए

प्रति सोमवार दिन जप करना उचित।


मै तो बोलूं कि प्रत्येक दिन करे----

 

आशुतोष शशाँक शेखर,

चन्द्र मौली चिदंबरा,

कोटि कोटि प्रणाम शम्भू,

कोटि नमन दिगम्बरा ॥


निर्विकार ओमकार अविनाशी,

तुम्ही देवाधि देव,

जगत सर्जक प्रलय करता,

शिवम सत्यम सुंदरा ॥


निरंकार स्वरूप कालेश्वर,

महा योगीश्वरा,

दयानिधि दानिश्वर जय,

जटाधार अभयंकरा ॥


शूल पानी त्रिशूल धारी,

औगड़ी बाघम्बरी,

जय महेश त्रिलोचनाय,

विश्वनाथ विशम्भरा ॥


नाथ नागेश्वर हरो हर,

पाप साप अभिशाप तम,

महादेव महान भोले,

सदा शिव शिव संकरा ॥


जगत पति अनुरकती भक्ति,

सदैव तेरे चरण हो,

क्षमा हो अपराध सब,

जय जयति जगदीश्वरा ॥


जनम जीवन जगत का,

संताप ताप मिटे सभी,

ओम नमः शिवाय मन,

जपता रहे पञ्चाक्षरा ॥


आशुतोष शशाँक शेखर,

चन्द्र मौली चिदंबरा,

कोटि कोटि प्रणाम शम्भू,

कोटि नमन दिगम्बरा ॥

कोटि नमन दिगम्बरा..

कोटि नमन दिगम्बरा..

कोटि नमन दिगम्बरा..

==================

मंगलम भगवान् विष्णु

मंगलम गरुड़ध्वजः ||

मंगलम पुन्डरी काक्षो

मंगलायतनो हरि ||


सर्व मंगल मांग्लयै शिवे सर्वार्थ साधिके |

शरण्ये त्रयम्बके गौरी नारायणी नमोस्तुते ||


त्वमेव माता च पिता त्वमेव,

त्वमेव बंधू च सखा त्वमेव,

त्वमेव विद्या द्रविणं त्वमेव,

त्वमेव सर्वं मम देव देव ||

=====================


अगर आप मेरा इस निर्देश ठीक ठाक पालन करने में समर्थ हुआ तथा 

निर्देश अनुसार मंत्र पाठ,प्रार्थना करे सके तो

मै उम्मीद करते है कि आपकी सारे बाधाएं दूर होंगे एवं सारे काम अच्छे से सम्पन्न होंगे,

आगे की बहुत काम आप आरामसे करनेमे समर्थ होंगे।

======================



35>|| আমাদের শ্রীশ্রীমা ||স্বামী গৌতমানন্দ

 

   35>|| আমাদের শ্রীশ্রীমা ||স্বামী গৌতমানন্দ।
পৃষ্ঠা::----199
শ্রীশ্রীমা স্বয়ং শব্দব্রহ্ম: ব্রহ্মাণ্ডপ্রসবিনী। অথচ সাধারণ মহিলার মতো কঠোর পরিশ্রম করতেন এবং বলতেন, "ঠাকুরের কাজ করবে, আর সাধন-ভজনও করবে: কিছু কিছু কাজ করলে মনে বাজে চিন্তা আসে না। একাকী বসে থাকলে অনেকরকম চিন্তা আসতে পারে।” ভোর তিনটে থেকে শ্রীশ্রীমায়ের দিন শুরু হত। গঙ্গাস্নান করে জপধ্যান করতেন। মায়ের বিন্দুমাত্রও অবসর ছিল না। সর্বদাই তাঁর মন ঈশ্বরচিন্তায় ডুবে থাকত। তবুও অন্যান্যদের কাছে উদাহরণস্বরূপ একটি আদর্শ প্রতিস্থাপন করতে তিনি বলতেন, এক মুহূর্তও কাজ ছেড়ে থাকতে নেই, কারণ অলস মনে যত কুচিন্তার উদয় হয়। শ্রীশ্রীমা খুব ভাল রাঁধতে পারতেন। পান সাজা, মা কালীর মালা গাঁথা সব কাজই অতি অনায়াসে সুচারুভাবে করতেন।
সকলের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের প্রতি মায়ের সযত্ন দৃষ্টি ছিল তাঁর শাশুড়ি-মা, শ্রীরামকৃষ্ণ এবং আগত ভক্তশিষ্য সবার ওপর। তিনি খুব ভাল সাঁতার জানতেন, জলে তাঁর যেমন ভয় ছিল না, তেমনই সংসারে কেউ হাবুডুবু খাক তাও মা চাইতেন না। পড়তে-লিখতে শিখেছিলেন; যখন অধিকাংশ মেয়েই লেখাপড়া জানতেন না। শ্রীশ্রীমা তাদের জন্যও একটি অনুসরণীয় আদর্শ স্থাপন করেছিলেন। খুব সুন্দর গানও গাইতেন; একদিন একটু জোরে গান গাওয়ায় শ্রীরামকৃষ্ণ শুনতে পেয়ে বলেছিলেন, "তুমি তো বেশ গাও। তা বেশি উঁচু গলায় গেও না, আপনমনে নিজেকে শোনাবার জপধ্যান ও প্রার্থনায় তিনি ছিলেন অদ্বিতীয়। সব মতো গুনগুন করে গাইবে।" আর অবশ্যই মেয়ের কর্তব্য এগুলি শিক্ষা করা, বিশেষ করে পবিত্রতা, সহানুভূতি, সুরক্ষা, আত্মশক্তি, সেবা, জপ, ধ্যান প্রভৃতির অনুশীলন। নারীদের উচিত নিজেদের দৈহিক দিক থেকে সক্ষম রাখা। শ্রীশ্রীমা পঞ্চাশ পেরিয়েও একাই আট কিলো আটা ঠেসে রুটি গড়তে পারতেন। তিনি বলতেন, ছেলেমেয়েদের ইংরেজি শেখা উচিত, কারণ ভবিষ্যতে দেশ-বিদেশ থেকে ঠাকুরের কত শিষ্য আসবে, তাদেরকে শ্রীরামকৃষ্ণের কথা, কামারপুকুর, জয়রামবাটা, বেলুড় মঠ প্রভৃতি স্থানের পবিত্রতা ও মাহাত্ম্যের কথা, আমাদের সংস্কৃতি, দর্শন সব ব্যাখ্যা করে বলতে হবে। এটি তাঁর দূরদর্শিতার এক উল্লেখযোগ্য নিদর্শন। এসব কথা মা বলেছেন ১৯১০-১১ সালে। আর এখন সেসমস্ত সত্যিই ঘটছে। স্বামীজীও নিজের মাতৃভাষা, ও সংস্কৃত ভাষা চর্চার সঙ্গে সঙ্গে ইংরেজি শেখার উপরও জোর দিতেন, যেহেতু ইংরেজি আন্তর্জাতিক ভাষা।
শ্রীশ্রীমা নারী-স্বাধীনতায় উৎসাহ দিতেন। শ্রীরামকৃষ্ণের প্রতি গভীর প্রেমে তিনি তাঁর প্রতিটি বাক্য মেনে চলতেন। কিন্তু তিনি ছিলেন স্বাধীন, কখনও কারও কাছে মাথা নোয়াননি, মেয়েদেরও তিনি সাহস, আত্মবিশ্বাস অবলম্বন করতে উৎসাহ জোগাতেন। একবার তেলোভেলোর মাঠ পার হওয়ার সময় শ্রীশ্রীমা ডাকাতের সম্মুখীন হন,
 
সেসময় তিনি বয়সে তরুণী। তিনি বিচলিত না। হয়ে স্থিরভাবে ডাকাতের মুখোমুখি হয়ে বললেন, “বাবা, আমার সঙ্গীরা আমাকে ফেলে গেছে, আমি বোধহয় পথ ভুলেছি; তুমি আমাকে সঙ্গে করে যদি তাদের কাছে পৌঁছে দাও।” ইতোমধ্যে ডাকাতের স্ত্রীও এসেছে। শ্রীশ্রীমা তার হাত ধরে বললেন, “মা, আমি তোমার মেয়ে সারদা, সঙ্গীরা ফেলে যাওয়ায় বিষম বিপদে পড়েছিলুম; ভাগ্যে বাবা ও তুমি এসে পড়লে, নইলে কি করতুম বলতে পারি নে।” এইরকম সাহস প্রত্যেকের থাকা উচিত, যা আসে পবিত্রতা ও ঈশ্বরে বিশ্বাস থেকে এবং আমরা নিঃসঙ্গ নই, ঈশ্বর সর্বদা সঙ্গে রয়েছেন-এটি নিত্য স্মরণে রেখে।
একবার শ্রীশ্রীমা জয়রামবাটী থেকে বিষ্ণুপুর যাত্রা করেছেন। পথে একটি বন পেরোতে হয়, সেখানে ডাকাতের ভয়। পালকিতে বসে মায়ের পা ধরে গেছে, তাই মা দোকান দেখতে পেয়ে একটু তেল আনতে বললেন। সেইসময় মাকুদির জলতেষ্টা পাওয়ায় তিনিও জল খেতে চাইলেন। দোকানের সামনে ত্রিশ-বত্রিশজন মানুষের জটলা দেখে আর সকলে যখন ভয় পেলেন, মা তখন নির্বিকার বললেন পুকুরে গিয়ে জল খেয়ে আসতে। কোনও পরিস্থিতিতেই মা সাহস হারাতেন না।
অত্যাধুনিক নগরে এবং শহরেও কোনও না কোনও কুসংস্কার থাকেই। যেমন, বিধবারা মস্তক মুণ্ডন করবেন, তাঁরা কোনও অলংকার পরবেন না, বা পাড়যুক্ত শাড়ি পরবেন না। শ্রীরামকৃষ্ণের মহাসমাধির পর শ্রীশ্রীমা তাঁর হাতের বালা খুলে ফেলতে চেয়েছিলেন, কিন্তু শ্রীরামকৃষ্ণ তাঁর সামনে আবির্ভূত হয়ে বললেন, “আমি কি মরেছি যে, তুমি এয়োস্ত্রীর জিনিস হাত থেকে খুলে ফেলছ?” শ্রীশ্রীমায়ের হাতের বালা আর খোলা হল না, লালপাড় শাড়ি পরাও অব্যাহত রইল। তিনি বলতেন, “ঠাকুর আমাকে রেখে গেছেন ঈশ্বরের মাতৃভাব জগৎসংসারে প্রচারের জন্য।” শ্রীশ্রীমাকে দেখে নারীদের মধ্যে অর্থহীন কুসংস্কার এবং পাপের ভয়, যার সঙ্গে আধ্যাত্মিক জীবনের কোনও সম্পর্ক নেই তা ত্যাগ করার সাহস বিকশিত হয়ে উঠছে।
শ্রীশ্রীমা শান্তির উৎস। একটি বালবিধবা মেয়ে তাঁর কাছে এসেছে, শোকে দিশেহারা। মা তাকে নানাভাবে শান্ত করলেন, শেষে বললেন, “কচি বয়সে বিধবা হয়েছ, তাতে কি হয়েছে? ভগবান তোমাকে আজীবন একটি পুরুষের দাসত্ব থেকে মুক্তি দিয়েছেন। অল্পবয়সে বিধবা হয়েছ, এ তো মহা সৌভাগ্য!” কার কখন, কী কারণে মৃত্যু হবে, কেউই বলতে পারে না। মানুষের মৃত্যুর জন্য দায়ী তার আপন কর্মফল। অপরের কর্মের এতে কোনও ভূমিকা নেই। ঈশ্বরের ইচ্ছায় মানুষের জন্ম হয়, ঠিক সেভাবে তাঁরই ইচ্ছায় মানুষের মৃত্যু হয়। বৈধব্যও বহু শুভকর্মের ফলস্বরূপ হতে পারে। শ্রীরামকৃষ্ণের ভাইঝি লক্ষ্মীর যখন বিয়ে হয়, তিনি বলেছিলেন, “ও বিধবা হবে।” পাত্র নির্বাচন ঠিকঠাক হয়নি। লক্ষ্মী শীতলা দেবীর অংশ। দেবীর বিবাহ কোনও সাধারণ মানুষের সঙ্গে হতে পারে না। তাঁর বৈধব্য কোনও পাপের ফলে নয়, বরঞ্চ স্বামীর তুলনায় তাঁর মহত্তর সত্তার কারণে হয়েছিল।
মেয়েদের শ্রীশ্রীমা উপদেশ দিতেন, "মেয়েদের আসল অলংকার পবিত্রতা ও দিব্য ভাব। অতএব আপন পবিত্রতা রক্ষা করে চলবে। পরিবার, স্বামী, সন্তানের আস্থাভাজন হয়ে থাকতে হয়। পবিত্রতার চেয়ে মূল্যবান অলংকার আর হয় না। নিজের
২০০
========================
পরের পৃষ্ঠা 201---->

মধ্যে মাতৃত্বের প্রকাশ ঘটাও। এটাই তোমার একমাত্র কাজ। সরল ও অনাড়ম্বর জীবনযাপন করো।” শ্রীশ্রীমায়ের মতো সরল অথচ মহিমময়ী আর কাউকে আমরা দেখি না। সুস্বাস্থ্য, আধ্যাত্মিক চিন্তা ও পবিত্র চরিত্র-এই হল সৌন্দর্যের সংজ্ঞা। যখন মনে বিরাজ করে মহৎ চিন্তারাশি এবং সেইসঙ্গে প্রত্যেকের প্রতি হৃদয় থেকে উৎসারিত হয় মাতৃস্নেহ, এর থেকে বেশি সৌন্দর্য আর কী হতে পারে?
ভোগবাদী সমাজে শ্রীশ্রীমায়ের ধারণা সর্বদা প্রাসঙ্গিক, যেহেতু তিনি সমস্যার মূল দেখেন। তিনি শিখিয়েছেন, যা আছে তাই নিয়েই সন্তুষ্ট থাকতে হয়, জিনিসপত্র ব্যবহার করার সময় সাশ্রয়ের দিকটা দেখতে হয়। আনাজপাতি কিনে এনে ঝুড়িটা ফেলে দিতে নেই। কার্পণ্যও নয়, আবার বেহিসাবি খরচও নয়, এই দুইয়ের মাঝামাঝি অর্থাৎ মধ্যম পন্থা অবলম্বন। যখন প্রয়োজন, কেবল তখনই খরচ করতে হবে। শ্রীশ্রীমা বলতেন, "যার যেটি প্রাপ্য সেটি তাকে দিতে হয়। যা মানুষে খায়, তা গরুকে দিতে নেই; যা গরুতে খায়, তা কুকুরকে দিতে নেই; গরু ও কুকুরে না খেলে পুকুরে ফেললে মাছ খায় তবু নষ্ট করতে নেই।” মা খুবই সাশ্রয়ী ছিলেন, কোনওকিছু অপচয় করতেন না। একজন ঘর ঝাঁট দিয়ে ঝাঁটাটি ছুঁড়ে ফেললে মা বলেছিলেন, “ও কি গো, কাজটি হয়ে গেল, আর অমনি ওটি অশ্রদ্ধা করে ছুঁড়ে দিলে? ছুঁড়ে রাখতেও যতক্ষণ, আস্তে ধীর হয়ে রাখতেও ততক্ষণ। ছোট জিনিস বলে কি তুচ্ছবোধ করতে আছে? যাকে রাখ, সেই রাখে। আবার তো ওটি দরকার হবে? তাছাড়া, এ সংসারে ওটিও তো একটা অঙ্গ। সেদিক দিয়েও তো ওর একটা সম্মান আছে। যার যা সম্মান, তাকে সেটুকু দিতে হয়।
ঝাঁটাটিকেও মান্য করে রাখতে হয়। সামান্য কাজটিও শ্রদ্ধার সঙ্গে করতে হয়।"
শ্রীশ্রীমায়ের বেশ কৌতুকবোধ ছিল। আমাদের জীবনেও এর প্রয়োগ শিখতে হবে। সাংসারিক ঝড়ঝাপটার দিনেও আমাদের হাসিখুশি থাকা দরকার। নিজেকে নিয়ে হাসতে শেখা উচিত। একবার নিবেদিতা গভীর শ্রদ্ধা সহ শ্রীশ্রীমাকে বললেন, "মাতাদেবী, আপনি হন আমাদের কালী।” ক্রিস্টিনও ইংরেজিতে একই কথার পুনরাবৃত্তি করলেন। কথাগুলি শুনে মা হাসতে হাসতে বললেন, "না, বাপু, আমি কালীটালী হতে পারব না। জিব বার করে থাকতে হবে তাহলে।”১০ লীলাবসানের কিছুকাল আগে, খুব অসুস্থ অবস্থায় শ্রীশ্রীমাকে পথ্য হিসাবে কেবল বার্লি খেয়ে থাকতে হচ্ছিল। আগে তিনি সামান্য ফলমিষ্টি যা কিছু খেতেন, তার অবশিষ্টাংশ প্রসাদরূপে ভক্তদের মধ্যে বিতরণ করা হত। যখন কেবল বার্লি-জল খেয়ে থাকতেন, তখন মা বলতেন, “কি গো, আজ যে প্রসাদে ভক্তি নেই?"
এমন একটি সর্বাঙ্গসুন্দর কল্যাণময় জীবন অনুধ্যান করলে আমাদের সর্বতোমুখী কল্যা হবে। আমাদের বিনম্র প্রার্থনা, "মা, আমাদে মানুষ করো।"

---------------------
                  সহায়ক গ্রন্থ
১। স্বামী গম্ভীরানন্দ, শ্রীমা সারদা দেবী, উে
কার্যালয়, কলকাতা, ২০১২
প্রবন্ধটি 'Vedanta Kesari' পত্রিকার জা ২০০২ সংখ্যায় প্রকাশিত 'The Holy Mo প্রবন্ধের সুমনা সাহা কৃত অনুবাদ।
পৃষ্ঠা ২০১
======================
        (সংগ্রহীত)
      নিবোধত--39 বর্ষ,  সংখ্যা--3
      সেপ্টেম্বর----অক্টোবর
      পূজাসংখ্যা--2025

Friday, November 14, 2025

34>|| মাতৃপ্রসঙ্গ ||স্বামী সুহিতানন্দ

     34> ||  মাতৃপ্রসঙ্গ ||স্বামী সুহিতানন্দ

স্বামী সুহিতানন্দ

পরমপূজনীয় সহ সঙ্ঘাধ্যক্ষ, রামকৃষ্ণ মঠ ও রামকৃষ্ণ মিশন

এ কটি ব্যক্তিগত ঘটনা দিয়ে শুরু করি। ১৯৬৪ সাল, কাশীধামে স্বামী প্রেমেশানন্দ মহারাজ আছেন। তখন তিনি অন্ধ এবং অথর্ব। দিনরাত তাঁকে সেবা করতে হয়। আমিও তাঁর সেবকমণ্ডলীর মধ্যে একজন ছিলাম। রাত্রি দেড়টার সময় তাঁর সেবা করার জন্য গিয়েছি। নিজের পরিচয় দিয়ে আমি তাঁকে একটা প্রশ্ন করলাম-

আচ্ছা মহারাজ, ঠিক এইসময় আপনি কী ভাবছেন? উনি সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিলেন-সর্বব্যাপী শ্রীরামকৃষ্ণ।

তা আমি বললাম-মহারাজ, শ্রীরামকৃষ্ণ কী তা বুঝলাম। সর্বব্যাপী চৈতন্য বা ব্রহ্ম এটাও বুঝতে পারি; কিন্তু বুঝতে পারছি না যে সর্বব্যাপী এবং শ্রীরামকৃষ্ণ-এটা কীরকম করে হয়? উনি উত্তর দিলেন-হচ্ছে তো! এই বলে চুপ করে গেলেন। আমি আর কোনও প্রশ্ন করতে সাহস করলাম না। কিছুকাল পর আশুতোষ মিত্রের লেখা 'শ্রীমা' বইটি পড়ছিলাম। সেখানে দেখলাম, মা বলছেন, “একবার দেখি কী তা জান? দেখি না, ঠাকুর সব হয়ে রয়েছেন। যেদিকে দেখি, সেই দিকেই ঠাকুর। কানাও ঠাকুর, খোঁড়াও ঠাকুর, ঠাকুর ছাড়া আর কেউ নেই। একটা ডেয়ো পিঁপড়ে যাচ্ছে, রাধু তাকে মারবে-দেখলাম কি তা জান? দেখলাম সেটা পিঁপড়ে তো নয়, ঠাকুর। ঠাকুরের সেই নাক, কান, মুখ, চোখ-সব সেই। রাধিকে আটকালুম। ভাবলুম-তাই তো, সবই যে ঠাকুরের। আমি আর কী করতে পারছি। কজনকে দেখতে পাচ্ছি? তিনি যে সকলের ভার আমার উপর দিয়েছেন। সকলকে দেখতে পারতুম, তবে তো হত!” মায়ের জীবনের ঘটনাগুলি যদি আমরা পর্যালোচনা করি, তাহলে দেখতে পাব এই সর্বব্যাপী শ্রীরামকৃষ্ণের সাধনাই তাঁর জীবনের মূল সুর।

২০২

======================

পৃষ্ঠা====203

দেওঘরের ঘটনা। আমি সেইসময় সেখানকার দায়িত্বে। একদিন ঘরে গিয়েছি, হঠাৎ টেলিফোন বেজে উঠল। টেলিফোনের অপরপ্রান্তে এক ভদ্রমহিলা, তাঁর সন্তান দেওঘর বিদ্যাপীঠে পড়ে।

তিনি ব্যাকুল হয়ে আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, "মহারাজ ও কেমন আছে?” বললাম, "ভাল আছে।" উনি বললেন, "আপনি ঠিক বলছেন? ভাল আছে?” আমি বললাম, "হ্যাঁ, আমি এই তো দেখে এলাম, ও ফুটবল খেলছে, গোলপোস্টে আছে। গোলকিপার হয়ে খেলছে।” তবু উনি বললেন, "ঠিক বলছেন?" দুবার বললেন, তারপর ফোন ছেড়ে দিলেন। আবার ফোন বেজে উঠল।

আমাদের ইনডোর হসপিটাল থেকে ফোন এসেছে, ওই ছেলেটির কমপাউন্ড ফ্র্যাকচার হয়ে গেছে, ওকে এখনই কলকাতার হাসপাতালে পাঠাতে হবে।

এরকমভাবেই সকল মা তাঁদের সন্তানের কষ্ট বুঝতে পারেন বা সন্তানের জন্য কষ্ট অনুভব করেন। দেশ-কালের গণ্ডি ছাড়িয়ে এই যে মাতৃত্ব, দুনিয়ার সব মায়েদের হৃদয়ের এই যে অনুরণন, এটিকে যদি সাকার বিগ্রহ রূপ দেওয়া যায়, তাহলে সেই রূপটিই হবেন আমাদের মা সারদা। প্রেমেশানন্দ মহারাজ লিখেছেন, "নিখিলমাতৃ-হৃদয়সাগর-মন্থনসুধামুরতি।" পৃথিবীর সব মাতৃত্বকে যদি একত্র করা যায়, সেই মাতৃত্বের প্রকাশ বা সাকার রূপ শ্রীশ্রীমাকে বলা যাবে।

ভগিনী নিবেদিতা বলেছেন: সত্যই ভগবানের অপূর্ব রচনাগুলি সবই নীরব। তা অজানিতে আমাদের জীবনের মধ্যে প্রবেশ করে-যেমন বাতাস, যেমন সূর্যের আলো, বাগানের মধুগন্ধ, গঙ্গার মাধুরী-এইসব নীরব জিনিসগুলি সব তোমারই মতো (মায়ের মতো)।

মায়ের কাছে দীক্ষা নিতে প্রভু মহারাজ গেছেন জয়রামবাটীতে। মা তখন পুরনো বাড়িতে দীক্ষা দিতেন। মহারাজ দক্ষিণ ভারত থেকে এসেছেন,

বাংলা জানেন না। পরে তাঁকে প্রশ্ন করা হল-"মায়ের কথা আপনি বুঝতে পারলেন কী করে?" উনি বললেন, "কী জানি। আমি যা বললাম মা বুঝলেন, আবার মাও যা বললেন আমি সবই বুঝতে পারলাম।" আরও আকর্ষণীয়ভাবে একথা বলেছেন গুরুদাস মহারাজ-অতুলানন্দ স্বামী। তিনি জাতিতে ডাচ। আমেরিকায় তিনি স্বামীজীর সংস্পর্শে আসেন এবং ভারতবর্ষে চলে এসে জীবন দিয়ে স্বামীজীর সেবা করেন। তাঁকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল-"আপনি মায়ের সঙ্গে কী করে কথা বলেছিলেন দীক্ষার সময়?" তিনি বললেন অপূর্ব ভাষায়: "যখন শিশু মায়ের কোলে জন্ম নেয়, সে মায়ের সঙ্গে কোন ভাষাতে কথা বলে? আমিও ঠিক ওই ভাষাতেই মায়ের সঙ্গে কথা বলেছিলুম।"

মায়ের এই বিশ্বমাতৃত্বকে কীভাবে বুঝব? শ্রীরামকৃষ্ণ বলেছেন, ঈশ্বরলাভ না হলে বোঝা যায় না যে স্ত্রীলোক কী বস্তু। সুতরাং শ্রীশ্রীমায়ের ভিতরে 'স্ত্রীভাবটি কী রূপে ছিল ঠাকুরই বুঝেছিলেন, স্বামীজীও কিছুটা বুঝেছিলেন। অনেক সাধক অনুভব করেন-তোতাপুরীর মতো-জলে মা, স্থলে মা, অন্তরিক্ষে মা-"ঘটে ঘটে বিরাজ করেন।” এই সর্বব্যাপী রূপটি কোনও কোনও ভাগ্যবান সাধক উপলব্ধি করে থাকেন।

প্রেমেশানন্দ মহারাজের মুখে আর একটি ঘটনা শুনেছিলাম। একবার তিনি জয়রামবাটী গিয়েছেন। মা ঠাকরুন পা মেলে বসে আছেন, মহারাজ গিয়ে

মাকে প্রণাম করলেন। মায়ের ঘোমটা টানা আছে, মুখটা দেখা যাচ্ছে না। উনি বাচ্চা ছেলের মতন ঘোমটার তলা দিয়ে মায়ের মুখখানি দেখার চেষ্টা করছেন। দেখছেন মায়ের দুটি চোখ যেন দুটো জ্বলন্ত টর্চ। মহারাজ মজা করে বলছিলেন, "মা বেটি এইরকম করেই সমাধিস্থা থাকতেন।” মায়ের মন সবসময় না জানি কোন উঁচুস্তরে থাকত! পতঞ্জলির যোগসূত্রে আছে, একে বলে 'ধর্মমেঘ সমাধি'।

২০৩

====================

পৃষ্ঠা--204


পৃষ্ঠা--204

যখন জগতের সবকিছু সাধকের করতলগত তখনও। তিনি জগতের ঐশ্বর্য থেকে সম্পূর্ণ নিস্পৃহ থাকেন। এই সমাধির নাম ধর্মমেঘ সমাধি। মা এইরকম একটা অবস্থায় থাকতেন। এইরকম ধর্মমেঘ অবস্থাতেই তাঁর প্রতিটি চলন, বলন, কথাবার্তা-যার দ্বারা জগতের কল্যাণ ছাড়া আর কিছুই হয় না।

সুহাসিনী দেবী একবার অনুযোগ করে মাকে বলেছিলেন, "আমরাও তো আপনার পেটে হইনি, তা বলে কি আমরা আপনার ছেলেমেয়ে নই?" শুনে মা বললেন, "কী বললে, আমার পেটে হওনি? তবে কার পেটে হয়েছ? আমার ছেলেমেয়ে নও? তবে কার ছেলেমেয়ে? আমি ছাড়া মা আর কেউ আছে নাকি? সব মেয়ের ভেতরেই আমি, সব মায়ের মধ্যেই আমি রয়েছি। যে যেখান থেকেই আসুক সব্বাই আমার ছেলেমেয়ে। এটা সত্যি সত্যি জানবে।"

শ্রীরামকৃষ্ণ শ্রীমা সম্পর্কে বলেছেন, "ও কি যে সে? ও আমার শক্তি।" বলেছেন, "ও সারদা, সরস্বতী, জ্ঞান দিতে এসেছে।" স্বামীজীও বলেছেন, "রামকৃষ্ণ পরমহংস ঈশ্বর ছিলেন কি মানুষ ছিলেন, যা হয় বলো... কিন্তু যার মায়ের উপর ভক্তি নাই, তাকে ধিক্কার দিও।"

স্বামীজী, বলরামবাবু, রাজা মহারাজ, বাবুরাম মহারাজ, নিরঞ্জন মহারাজ-এঁরা শ্রীরামকৃষ্ণের সময় থেকেই ঈশ্বরজ্ঞানে মাকে হহৃদয়ের ভক্তি, ভালবাসা দিয়েছেন। বলরামবাবুই হোন বা গিরিশবাবু, প্রত্যেকেই সমাজে লব্ধপ্রতিষ্ঠ। প্রায় সকলেই সচ্ছল পরিবারের ছেলে এবং উচ্চশিক্ষিত। এমন মানুষ তাঁরা কেউই নন যে, মা-ঠাকরুন শুধু পরমহংসদেবের স্ত্রী বলেই তাঁরা মনপ্রাণ তাঁর পায়ে সঁপে দেবেন। মা তাঁর নিজস্ব মর্যাদায়, তাঁর সাধনাতে, তাঁর পবিত্রতাতে, তাঁর সিদ্ধিতে-এমন একটা পর্যায়ে ছিলেন যে, যখন শ্রীরামকৃষ্ণ

স্কুলদেহে নেই, মায়ের সঙ্গে তাঁদের কোনও প্রত্যক্ষ যোগাযোগ নেই, তবু মাকে না দেখতে পেয়েও তাঁরা হৃদয়ের ভক্তি মায়ের প্রতি উজাড় করে দিয়েছেন।

মায়ের আশীর্বাদে তাঁর এই অপরূপ রূপ আমরা পেয়েছি। শ্রীরামকৃষ্ণের মাত্র চারখানা ছবি আমরা পাই। তুলনায় মায়ের অনেক ছবি পাওয়া গেছে। এর জন্য আমরা কৃতজ্ঞ আশুতোষ মিত্র এবং গণেনের কাছে। তাঁরাই মায়ের রূপটি ধরে রেখেছেন। এক্ষেত্রেও মায়ের মাতৃত্বই দেখা যায়। লজ্জাপটাবৃতা মা ধ্যান করছেন, পুজো করছেন-সেইসব ছবি সন্তান তুলছেন। মা আপত্তি করছেন না। কেন? মা বলেছিলেন, "ছেলেদের জন্য আমি সব করতে পারি।" ঘটনাটি এইরকম উদ্বোধনে মায়ের একদিন দুপুরে প্রসাদ পাওয়া হয়ে গেছে। দেখা গেল যে একজন সন্তান আসবে কিন্তু তাকে দেওয়ার মতো প্রসাদ নেই। তখন মা আবার একটু অন্ন নিয়ে প্রসাদ করে দিলেন। তা দেখে পরে একজন তাঁকে বলল, "মা, আপনি বামুনের মেয়ে হয়ে দুবার ভাত খেলেন-মুখ এঁটো করলেন?” মা উত্তর দিলেন, "ছেলেদের কল্যাণের জন্য আমি সব করতে পারি।" সন্তানদের জন্য সব করতে পারেন বলেই দুর্লভ সম্পত্তির মতো মায়ের এই ছবিগুলি আমরা পেয়েছি।

তাছাড়া রয়েছে মায়ের লীলা। লীলা না করলে মানুষের পক্ষে অবতারের ভাব চিন্তা করা বড় কঠিন।

মানুষের ধীরে ধীরে আধ্যাত্মিক উন্নতি হবে। মু সেজন্য আমাদের মতো হয়ে তাঁরা নেমে আসেন, এসে মানুষের মতো ব্যবহার করেন। মায়ের লীলায় দেখি অতুলনীয় সেবিকার রূপ। এটিই সর্বব্যাপী শ্রীরামকৃষ্ণের পূজা। অনন্ত মাধুর্য নিয়ে তিনি সর্বব্যাপী শ্রীরামকৃষ্ণের সেবিকারূপে আবির্ভূতা হয়েছেন। তাঁর এইসব লীলা চিন্তা করতে করতে মানুষের ধীরে ধীরে  আধ্যাত্মিক উন্নতি হবে।

২০৪

 ( সংগ্রহীত)

       নিবোধত

     পূজাসংখ্যা--2025

XXXXXXXXXXXXXXX

====================


Tuesday, October 21, 2025

33>|| ঠাকুরের উপদেশ::--(আহার ও নিদ্রা সংযম)

 

33>||ঠাকুরের উপদেশ::--(আহার ও নিদ্রা সংযম)

আমাদের শাস্ত্রে খাদ্য বিষয়ে একটি সুন্দর উপদেশ আছে—হিতভুক, মিতভুক, ঋতভুক—হিতকারী পুষ্টিকর খাদ্য খাবে, পরিমিত খাবে ও সময়মতো খাবে। ঠাকুরের সাধারণ উপদেশ—যার যা পেটে সয় তা-ই খাও। শ্রীমকে তিনি বলেছিলেন ভাতের সঙ্গে একটু ঘি মেখে খেতে এবং শেষে দুধ খেতে।

    আহার সংযমের সঙ্গে সঙ্গে ঠাকুর নিদ্রা সংযমেরও নির্দেশ দিয়েছিলেন। লাটু মহারাজ কুস্তি করতেন, সেজন্য একটু ঘুমকাতুরে ছিলেন। একদিন তিনি সন্ধ্যা বেলায় ঘুমিয়ে পড়েন। তাতে ঠাকুর গম্ভীর ভাবে বলেন, "হ্যাঁরে ! এখনই যদি ঘুমোবি, তবে জপধ্যান করবি কখন ? রাত নটা বাজে নি, এরই মধ্যে ঘুমোচ্ছিস ! কোথায় তুই রাতভর ধ্যান করবি, ধ্যান করতে করতে কখন যে রাত কেটে যাবে জানতে পারবিনি, তা না, এরই মধ্যে ঘুমে চোখ ঢুলে পড়ছে ! তুই কি এখানে শুধু ঘুমোতে এসেছিস?" এই বকুনি খেয়ে লাটু মহারাজ চিরজীবনের জন্য রাতের ঘুম বিসর্জন দিয়েছিলেন।

    লাটু মহারাজ বলেছেন, "উনি (ঠাকুর) বলতেন—'যাগে-যোগে জেগে থাকবি, ঘুমের কালে তাঁকে ডাকবি, কাজের মাঝে তাঁকে ধরবি, আর হরদম্ তাঁর সেবায় লাগবি।'" কি সংক্ষিপ্ত অমূল্য উপদেশ ! 'যাগে-যোগে জেগে থাকবি' অর্থাৎ সদাসর্বদা তাঁর দিকে মন ফেলে রাখবি। 'ঘুমের কালে তাঁকে ডাকবি'—রাত্রে নির্জনে তাঁকে ডাকবি; মনে তামস ভাবের উদয় হলেই তাঁকে ডাকবি। 'কাজের মাঝে তাঁকে ধরবি'—কোন কাজেই নিজের অহংকারকে বাড়তে দিবি না ‌। 'হরদম্ তাঁর সেবায় লাগবি'—বৃথা আলস্যে দিন কাটাবি না, সদাসর্বদা তাঁর কাজ নিয়ে মশগুল থাকবি।   🙏🙏🪷🪷🙏🙏

—(ধ্যানলোকে শ্রীরামকৃষ্ণ, ধ্যানতত্ত্বে কৃষ্ণ ও রামকৃষ্ণ, পৃ. ৩৯১-৩৯২

  (আহার ও নিদ্রা সংযম)

Friday, October 10, 2025

32>|| ভিক্ষার অন্ন শুদ্ধ অন্ন / ঠাকুর //

    || ভিক্ষার অন্ন শুদ্ধ অন্ন / ঠাকুর //


সন্ন্যাসের পর থেকে তিনদিন বাইরে ভিক্ষা করে খেতে হয়। ধুতি ও সুতির চাদর ছাড়া আর কিছু পরা চলবে না, আগুনের ব্যাবহারও নিষেধ।

    সকাল ন’টা নাগাদ বেরিয়ে পড়লাম ভিক্ষায়। দু’জন করে সন্ন্যাসীর গ্রুপ। এক-এক গ্রুপ একেক দিকে যাবে। একই বাড়িতে একাধিক সন্ন্যাসী ভিক্ষা করবে না। তিন বা পাঁচ বাড়ির বেশি থেকে ভিক্ষা নেয়া যাবে না। শুধু রান্না করা খাবার নেয়া যাবে, ফলও, কিন্তু টাকা-পয়সা নয়। গেরুয়া কাপড়ের একাংশ ছিঁড়ে ঝোলা তৈরী করলাম (বৈষ্ণবদের সাপুই)। ওটাই ভিক্ষার ঝুলি। দুপুর বারোটার মধ্যে সবাইকে ফিরে আসতে হবে----রথীন মহারাজ বলে দিলেন। 

   মঠের মেন গেটের কাছে অনেক মহিলা ও পুরুষ দাঁড়িয়ে আছেন খাবার নিয়ে। নবীন সন্ন্যাসীদের ভিক্ষা দেবেন। আমরা কয়েকজন তাই পেছনের গেট দিয়ে লুকিয়ে চলে গেলাম। ইচ্ছা ছিল সেই অঞ্চলে যাব যেখানে কেউ আমাদের চেনে না। 

   প্রায় মাইল খানিক হেঁটে আমরা দু’জন একটা পাড়ায় ঢুকলাম। সঙ্গী গেল একদিকে, আমি অন্যদিকে। এক বাড়ির সামনে গিয়ে দাঁড়াতেই উপরের বারান্দা থেকে একজন প্রৌঢ়া মহিলা বললেন ---এসেছো বাবা? একটু দাঁড়াও। আমি আসছি। তিনি নিচে নেমে আমার ঝুলির মধ্যে ঢেলে দিলেন ভাত, আলু ও পটল ভাজা, ফুলকপির তরকারি। ডালের বাটি দিতে গেলে বললাম—ডাল ভেতরেই ঢেলে দিন। তিনি অবাক হলেন --- সে কি বাবা? চুঁইয়ে-চুঁইয়ে পড়বে যে নীচে দিয়ে। বললাম— এভাবেই ভিক্ষা নেয়ার নিয়ম আমাদের। সব মাখামাখি হয়ে যাবে, তা যাক। 

    ওখান থেকে বেশ কিছুটা হেঁটে অন্য এলাকায় গেলাম। জবরদস্ত অভিজ্ঞতা হলো। দরজা খুলে এক ভদ্রলক জিজ্ঞেস করলেন—  আপনি কোন আশ্রমের? বললাম— বেলুড়মঠের। শুনেই তিনি চোখ গোল গোল করে বিস্ময় প্রকাশ করলেন— সে কি? মঠের সাধু হয়ে ভিক্ষা করছেন? বেলুড়মঠের আর্থিক অবস্থা এতো খারাপ যে সাধুরা রাস্তায় রাস্তায় ভিক্ষা করছেন? ওগো শুনছো— স্ত্রীকে  ডাক দিলেন তিনি— মঠের সাধুরা পথে পথে বেরিয়ে ভিক্ষা চাইছে। তাঁর স্ত্রী এসে দাঁড়ালেন। ভ্রূ কুঁচকে আমার দিকে তাকালেন। পরে স্বামীকে বললেন — আমার সন্দেহ হচ্ছে। কালই তো বেলুড়মঠে খিচুড়ি প্রসাদ খেয়েছি। একদিনেই অবস্থা এতো খারাপ? না আমার মনে হয় এই সাধু ঠগ। বেলুড়মঠের নাম করে ভিক্ষা চাইছে। ওদিকে পাড়ার কয়েকজন এসে আমায় ঘিরে ধরেছে। ভদ্রলোক চেঁচাচ্ছেন --- “চোর-টোর নয় তো! গেরুয়ার ছদ্মবেশে এসেছে। এই, আপনারা একে ধরে রাখুন। আমি পুলিশে ফোন করছি।” আমি তো নার্ভাস।      

সন্ন্যাস নিতে-না-নিতেই এমন বিপত্তি! তাদের বুঝিয়ে বললাম— “আমি বেলুড়মঠের ফোন নাম্বার দিচ্ছি। আপনারা ফোন করে জেনে নিন আমার বিষয়ে।” এভাবেই রক্ষা পেয়েছিলাম সেদিন। ভিক্ষা তো দিলই না, উল্টে পুলিশের হুমকি! 

   দ্বিতীয় দিন এক মুসলমান বস্তিতে গেলাম। একটা বাড়ির বারান্দায় দু’জন মহিলা কথা বলছিলেন। সেখানে গিয়ে ভিক্ষা চাইলাম। এক ভদ্রমহিলা “আসছি বাবা” বলে ভেতরে ঢুকে বেরিয়ে এলেন খালি হাতে। এসেই গল্প করতে শুরু করলেন। কোথায় থাকি, বাড়ি কোথায় ছিল, কতদূর পড়াশোনা ইত্যাদি। ১০-১২ মিনিট ধরে তিনি গল্প চালিয়ে যেতে লাগলেন। আমি ভাবছি — ভিক্ষা না দিলে বলে দিলেই হয়! এতো প্রশ্ন কেন? এমন সময় একটি বাচ্চা ছেলে বাইরে থেকে এলো। হাতে ঠোঙা। তাকে নিয়ে ভদ্রমহিলা ভেতরে গেলেন। পরে এক বাটিতে মুড়ি এনে আমায় ভিক্ষে দিলেন। জানলাম যে বাড়িতে খাবার নেই। স্বামী রিকশা চালান। বারোটা নাগাদ চাল-ডাল নিয়ে আসবেন, তখন রান্না হবে। তাই ছেলেকে পাঠিয়েছিলেন বাজার থেকে মুড়ি নিয়ে আসতে। এজন্যই গল্প করে আমায় ব্যস্ত রেখেছিলেন এতক্ষণ। সন্ন্যাসী ভিক্ষা চাইতে এসেছেন। খালি হাতে বিদায় করতে নেই। 

   মজা হয়েছিল ললিত মহারাজকে নিয়ে। বেলুড় অঞ্চলে যুবকদের মধ্যে তিনি খুব জনপ্রিয়। এক পাড়ায় ঢুকতেই ৮-১০ জন ছেলে তাঁকে ঘেরাও করে বসলো — আমাদের ক্লাবে চলুন, ভিক্ষা দেবো। মহারাজ আপত্তি করলেন, কি করছিস তোরা? বাড়ি থেকে ভিক্ষা নেয়ার নিয়ম। ছেলেরা কথা শুনবে না। জোর করে নিয়ে গেল ক্লাবে। চেয়ারে বসিয়ে গলায় মালা দিল। বলল— মহারাজ, আজ আমাদের পুণ্য অর্জন করতে দিন। প্রচুর ফল কিনে রেখেছে ক্লাবের সদস্যেরা। কোল্ড ড্রিংস খেতে দিল। ইতিমধ্যে একজন গিয়ে এক সাইকেল-রিকশা ডেকে এনেছে। চাঙ্গাড়ি ভর্তি ফল। কমলা, আপেল, কলা, সন্দেশ। ৫-৬ টা বড় বড় ঝুড়ি। মহারাজের সীটে বসিয়ে দিল তারা। পায়ের কাছে, সীটে, হাতের পাশে ফলের ঝুড়ি। “কি করছিস বল তো তোরা!” মহারাজ ধমকে দিলেও ছেলেরা পাত্তা দিল না। সীটের এককোণায় মহারাজ কোনরকমে বসলে তারা মহারাজের হাতে কয়েকটা ডাব ধরিয়ে দিল। আর রিকশাওয়ালাকে পাঁচটাকা দিয়ে বলল--- “সোজা বেলুড়মঠে যাও। মাঝপথে মহারাজকে নামতে দেবে না।” 

     এক বাড়িতে ভিক্ষা নিচ্ছি। ভদ্রমহিলা রুটি আর আলুর তরকারি দিচ্ছেন। পাশেই তাঁর বাচ্চা ছেলে। চকোলেট খাচ্ছিল, মাকে দেখলো কিছুক্ষণ। পড়ে আমার দিকে তাকালো। হঠাৎ ছুটে এসে পকেট থেকে একটা চকোলেট দিল আমার ঝুলিতে। ভদ্রমহিলা “কি করছো” বলে চেঁচিয়ে উঠতেই বাচ্চাটি অম্লান বদনে বললো— আমিও ভিক্ষা দিচ্ছি।

তার দিকে তাকিয়ে আমি হাসিমুখে “থ্যাংকিউ” বলতে বাচ্চাটি হতভম্ব হয়ে আমাকে দেখলো কয়েক সেকেন্ড। তারপর মা’র উদ্দেশ্যে বলল— মামমি ভিখারী ইংরেজি বলছে। মা লজ্জিত। 

     একদিন ভিক্ষার শেষে বেলুড়মঠে ফিরে আসছি। একটা গলিতে ঢুকতেই একজন ভদ্রমহিলা থামালেন আমাকে। বললেন— একটু দাঁড়ান, ভিক্ষা দেব। তাঁকে বললাম যে আজ আর ভিক্ষা নিতে পারবো না, পাঁচ বাড়ি হয়ে গেছে। তিনি করুণ মুখে বল্লেন---দু’ঘণ্টা ধরে অপেক্ষা করে আছি, আপনারা কেউ এলে ভিক্ষা দেবো। কেউ না আসায় ভগবানের কাছে খুব প্রার্থনা করছিলাম যেন কেউ আসেন। আপনি এলেন, আর আমার ভিক্ষা নেবেন না? তিনি প্রায় কেঁদে ফেললেন। আমি অপ্রস্তুত। বললাম— নেবো, ভিক্ষা নিয়ে আসুন। 

     মঠে যখন ফিরলাম ভিক্ষার শেষে তখন ঝোলার অবস্থা খুবই খারাপ। ডাল চুঁইয়ে পড়ছে। ভেতরে ফুলকপির ঝোলে মিশে বেগুনভাজা নিস্তেজ। রুটিগুলির একপাশে দই লেগে আছে, অন্যপাশে চাটনী। খিচুড়ি আর পায়েস একসাথে মিশে গিয়ে অদ্ভুদ অবস্থা। শুক্তোর ঝোলে জিলিপি পড়ে ভেঙ্গে গেছে। 

    বারোটা নাগাদ আমরা সবাই ফিরে এলাম ভিক্ষা থেকে। মঠে লেগেট হাউসের কাছে বিশ্রাম করতে লাগলাম। তিনদিন ফাঁকা জায়গায় বসেই খেতে হবে, কোনো ঘরে নয়। সবার ঝুলি থেকে ভিক্ষান্ন নিয়ে একসঙ্গে রাখা হলো বিশাল গামলায়। সবকিছু মাখামাখি হয়ে একাকার। সেদ্ধ চাল, বাসমতী, আতপ চালের ভাত, মুগ-ছোলা-মুসুরী ডাল, ঝোল-চচ্চড়ি-শাক- সেদ্ধ-ভাজা, সন্দেশ-আচার-শুক্তো-পায়েস — সব মিলে মিশে মহাপ্রসাদ। হাতা দিয়ে ভাল করে মিশিয়ে দেয়া হল সব। 

     হ্যাঁ, এর নাম মহাপ্রসাদই। খাবার ঘরে সাধুরা বসে অপেক্ষা করছেন। মহাপ্রসাদ আগে খেয়ে পরে দৈনন্দিনের খাবার। প্রেসিডেন্ট মহারাজ, অন্যান্য প্রধান মহারাজরা, সবাই অপেক্ষা করছেন এর জন্য। শ্রীরামকৃষ্ণ বলতেন — ভিক্ষার অন্ন শুদ্ধ অন্ন। 

     বাইরে গাছের নীচে লাইন করে আমরা নবীন সন্ন্যাসীরা, বসে গেলাম। শালপাতায় পরিবেশন করা হলো মহাপ্রসাদ। আমরা ক্লান্ত, ক্ষুধার্ত। তাড়াতাড়ি খাওয়া শুরু করলাম। কি খাচ্ছি, কেমন স্বাদ, কিচ্ছু বোঝা যাচ্ছে না। খিদে লাগলে সবই অমৃত। 

 

            — স্বামী সোমেশ্বরানন্দ

 ("আমার সন্ন্যাস-জীবন ও বেলুড়মঠ")


লেখাটা যতবার পড়ি ততবার মন ছুঁয়ে যায়,, তাই আবার সকলের সঙ্গে ভালোলাগাটা ভাগ করে নিলাম। (পুরনো একটি পোস্ট থেকে)


ছবি-- স্বামী শোভাত্মানন্দ মহারাজ। বেলুড় মঠ

দেব দ্যুতি এর পাতা থেকে সংগৃহিত।

======================


Friday, August 15, 2025

31>"সর্বধর্মান্ পরিত্যজ্য মামেকং শরণং ব্রজ

 31>"সর্বধর্মান্ পরিত্যজ্য মামেকং শরণং ব্রজ। অহং ত্বাং সর্বপাপেভ্যো মোক্ষয়িষ্যামি মা শুচঃ" ।।


এর অর্থ : সর্ব প্রকার ধর্ম পরিত্যাগ করে কেবল আমার শরণাগত হও । আমি তোমাকে সমস্ত পাপ থেকে মুক্ত করবো । তুমি শোক করো না ॥গীতা ১৮ অধ্যায় ৬৬ শ্লোক।

Wednesday, August 13, 2025

30>|| "ওঁ সর্বে ভবন্তু সুখিনঃ---"

   30>|| "ওঁ সর্বে ভবন্তু সুখিনঃ---"


"ওঁ সর্বে ভবন্তু সুখিনঃ সর্বে সন্তু নিরাময়াঃ

সর্বে ভদ্রাণী পশ্যন্তু মা কশ্চিদ দুঃখ ভাবভবেৎ।।"


অর্থ- সকলে সুখী হোন,নিরোগ হোন এবং শান্তি লাভ করুন, কেউ যেন দুঃখ ভোগ লাভ না করে।। 


ওঁ শান্তি, ওঁ শান্তি, ওঁ শান্তি।।


ওঁ স্থাপকায় চ ধর্মস্য সর্ব ধর্ম স্বরূপিণে।

অবতার বরিষ্ঠায় রামকৃষ্ণায় তে নমঃ ।।


ওঁ যথাগ্নের্দাহিকাশক্তিঃ রামকৃষ্ণে স্থিতা হি য়া।

সর্ববিদ্যাস্বরূপাং তাং সারদাং প্রণমামি-অহম্।।


ওঁ জননীং সারদাং দেবীং রামকৃষ্ণে জগদগুরুম্।

পাদপদ্মে তয়োঃ শ্রিত্বা প্রণামামি মুর্হুমুহুঃ৷।


ওঁ নমঃ শ্রীযতিরাজায় বিবেকানন্দ সুরয়ে।

সচ্চিৎ সুখস্বরূপায় স্বামিণে তাপহারিণে।।

【 এই শ্লোকের অর্থ হল: "যতিদের রাজা, বিদ্যার আলো, যিনি সত্য, চিৎ (জ্ঞান), এবং আনন্দ স্বরূপ, যিনি স্বামী এবং যিনি তাপ (কষ্ট) হরণ করেন, সেই বিবেকানন্দের উদ্দেশ্যে প্রণাম।"


এই শ্লোকে, স্বামী বিবেকানন্দকে 'যতিরাজ'---> (যতিদের রাজা), 'বিবেকানন্দ সুর'--> (বিবেকানন্দের আলো), 

'সচ্চিৎ সুখস্বরূপ'---> (যিনি সত্য, জ্ঞান ও আনন্দ স্বরূপ), 

এবং 'তাপহারী'---> (দুঃখ দূরকারী) হিসাবে বর্ণনা করা হয়েছে। 

এই শ্লোকটি মূলত স্বামী বিবেকানন্দের উদ্দেশ্যে শ্রদ্ধা ও ভক্তি নিবেদনের একটি মন্ত্র। 】



ওঁ পরতত্ত্বে সদালীনো রামকৃষ্ণসমাজ্ঞয়া।

যো ধর্মস্থাপনরতো বীরশং তং নমাম্যহম্।।

【এই শ্লোকটির অর্থ হল: যিনি পরতত্ত্বে (পরম সত্যে) সদা লীন এবং রামকৃষ্ণের আজ্ঞা দ্বারা ধর্ম সংস্থাপনে রত, সেই বীরকে আমি প্রণাম করি।

অর্থাৎ, শ্লোকটিতে পরম সত্যের সাথে একাত্ম হওয়া এবং শ্রীরামকৃষ্ণের আদর্শে ধর্ম সংস্থাপনে রত একজন বীরকে প্রণাম জানানোর কথা বলা হয়েছে।


এই শ্লোকের মূল শব্দগুলির অর্থ: 

ওঁ: -->একটি পবিত্র মন্ত্র যা ঈশ্বরের প্রতীক।

পরতত্ত্বে:--> পরম সত্য বা সর্বোচ্চ সত্য।

সদালীনো:--> সর্বদা নিমগ্ন বা যুক্ত।

রামকৃষ্ণসমাজ্ঞয়া:--> শ্রীরামকৃষ্ণের আজ্ঞা বা নির্দেশ অনুসারে।

যো:--> যিনি।

ধর্মস্থাপনরতো:--> ধর্ম প্রতিষ্ঠায় রত।

বীরশং:--> বীরকে, সাহসী ব্যক্তিকে।

তং:--> তাকে।

নমাম্যহম্:--> আমি প্রণাম করি।】



জয় ভগবান রামকৃষ্ণদেব কী জয়,

জয় মহামায়েকী জয়,

জয় স্বামীজি মহারাজ কী জয়,

জয় গুরু মহারাজ কী জয়,,,

=========================

29>|| কৃপা লাভের উপায় ||

    29>|| কৃপা লাভের উপায় ||


কৃপা কিভাবে আসে ?

_শ্রীরামকৃষ্ণ দেবের একটি গল্প আছে::--


   ভগবতী হিমালয়ের ঘরে তাঁর কন্যা হয়ে জন্মেছেন , কন্যার মতোই হেসে খেলে বেড়াচ্ছেন। একদিন হিমালয় তাঁকে বললেন , ' তোমাকে তো আমি আমার কন্যারূপেই দেখছি , তোমার স্বরূপ কি তা জানতে ইচ্ছে হচ্ছে।' জগজ্জননী তাঁকে বললেন , ' বাবা , আমার স্বরূপ যদি প্রত্যক্ষ করতে চাও , তাহলে মুনিঋষিরা যেমন আমার স্বরূপ প্রত্যক্ষ করার আগে জন্ম-জন্ম ধরে তপস্যা করেছিলেন , তোমাকেও তাই করতে হবে। আমি তোমার কন্যা হয়ে এসেছি বলেই যে তুমি তা প্রত্যক্ষ করতে পারবে , তাই হয় না।' আধ্যাত্মিক জীবনে এইটিই  সত্য ! আমরা যখন আমাদের সর্বশক্তি নিয়োগ করে ভগবানলাভ করতে চাই , তখনই তিনি কৃপা করেন , তাছাড়া নয়।_

       _কৃপা কিভাবে আসে তার আর একটি গল্প আছে --- দুটি পাখির গল্প। পাখি দুটি সমুদ্রের বেলাভূমিতে ডিম পেড়েছিল। ডিম সেখানেই রেখে তারা খাদ্যের সন্ধানে বেরুলো। ফিরে এসে দেখে সেই ফাঁকে সমুদ্রের ঢেউ এসে ডিম দুটিকে ভাসিয়ে নিয়ে গেছে। দেখে খুব রাগ হলো তাদের ; তারা স্থির করলে , সমুদ্রের জল শুষে ফেলে ডিম দুটি ফিরিয়ে আনবে। তখনই কাজে লেগে গেল --- ঠোঁটে করে জল এনে বালির উপর ফেলতে লাগল। দিনরাত একইভাবে এই কাজ চললো। সমুদ্রের দেবতা বরুণদেব এদের কাণ্ড দেখে দুঃখ পেয়ে কাছে এসে জিজ্ঞেস করলেন , " কি  করছ তোমরা ?" পাখি দুটি বলল , " সমুদ্র আমাদের ডিম ভাসিয়ে নিয়ে গেছে। আমরা ডিম দুটি ফিরে পাবার জন্য সমুদ্রকে শুকিয়ে দেবার চেষ্টা করছি।" তাদের অধ্যাবসায় ও সঙ্কল্পের দৃঢ়তা দেখে বরুণদেব ডিম দুটি ফিরিয়ে দিলেন।_


- স্বামী বীরেশ্বরানন্দ

(তথসূত্রঃ👉 ভগবানলাভের পথ)

➖➖➖➖➖


Thursday, July 17, 2025

28>দক্ষিণেশ্বর সভায় শ্রীরামকৃষ্ণদেব তাঁকে বলতেন, ‘মাস্টার।

28>দক্ষিণেশ্বর সভায় শ্রীরামকৃষ্ণদেব তাঁকে বলতেন, ‘মাস্টার। 

 দক্ষিণেশ্বর সভায় শ্রীরামকৃষ্ণদেব তাঁকে ‘হেডমাস্টার’, ‘ইংলিশম্যান’ ইত্যাদি নানা নামে পরিচয় করিয়ে দিতেন। কখনও তাঁকে বলতেন, ‘মাস্টার’।


উপেক্ষিত ও বিলম্বিত হয়ে শেষ পর্যন্ত নিজের খরচেই ‘শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণকথামৃত’ ছেপেছিলেন মাস্টারমশাই


                 ✍️শংকর


জমিদার, আইসিএস জজ, বিসিএস মুনশেফ সায়েব, উকিল, ব্যারিস্টার, ডাক্তার— কারা ভারতীয় মধ্যবিত্তের মুখ রক্ষা করলেন মানবসেবায়, এর উত্তর দিতে গেলে মনে পড়ে যায় এই শ্রেষ্ঠ সম্মান যাঁরা পাওয়ার যোগ্য, তাঁদের নাম মাস্টারমশায়। এই শিক্ষকেরাই জাতীয় জীবনের নানা পর্যায়ে মধ্যবিত্ত ভারতীয়ের নিরন্তর সেবা করেছেন। এঁদের কেউ ‘মাস্টারদা’ নামে শাসকের অস্ত্রাগার লুণ্ঠন করে ফাঁসির মঞ্চে আরোহণ করেছেন, কেউ মন্দিরের অখ্যাত পুরোহিতের বাক্যসুধার দিনলিপি লিখে তাঁকে বিশ্ববন্দিত করেছেন, সেই সঙ্গে বিদেশিনি দিদি নিবেদিতা ও বিদেশিনি এন্টালির দিদিমণি মাদার টেরেজাকে যদি ধরেন, তা হলে মানতেই হবে, এঁরাই আমাদের মুকুটমণি। উৎসাহীরা এই তালিকায় যোগ করে দেন আর একজন মাস্টারকে, যাঁকে স্বয়ং বিদ্যাসাগর পদত্যাগপত্র পাঠাতে বাধ্য করেছিলেন।


এই মধ্যবিত্ত মাস্টারমশায়ের অতুলনীয় জীবনকথা এ দেশের মানুষের অমূল্য সম্পদ। ‘কনটেম্পোরারি’ বা সমকালীন বলে একটা কথা আছে। আমি অন্য অনেকের মতো সগর্ব দাবি করতে পারি, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, কাজী নজরুল ইসলাম, আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়, জগদীশচন্দ্র বসু, মহাত্মা গাঁধী, সুভাষচন্দ্র বসুর সমসাময়িক। কারণ আমার কালে তাঁরা বেঁচে ছিলেন। সেই দাবি শ্রীম বা মহেন্দ্রনাথ গুপ্ত সম্বন্ধে একটুর জন্য হাতছাড়া হয়েছে, মাত্র এক বছরের জন্য। তাঁর কর্মময় ও কীর্তিময় জীবনের অবসান ১৯৩২ সালে এবং আমার জন্ম ১৯৩৩ সালে।


ভাবছি, এই মাস্টারমশায়ের নাম প্রথম কবে শুনলাম? আমাদের হাওড়ার বাড়ির খুব কাছে অরোরা বুক ডিপোতে খুব কম বয়সে গল্প করতে যেতাম এবং সেখানেই মাঝে মাঝে আসতেন এক ভদ্রলোক, একটা থলেতে এক মূল্যবান বইয়ের প্রচারের জন্য। বইটির নাম ‘শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণকথামৃত’। আমি ভেবেছিলাম, তিনি মূল প্রকাশকের সেলসম্যান, কিন্তু পরে শুনলাম, তিনি বইটির গুণগ্রাহী সেবক, সুযোগ পেলেই বেরিয়ে পড়েন ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ ও শ্রীমকে ঘরে ঘরে পৌঁছে দেওয়ার জন্য। সেও এক আশ্চর্য ব্যাপার, কোনও বই পছন্দ হলে মানুষ তা কেনে। কিন্তু সেই বই ঘরে ঘরে প্রচারের জন্য কেউ পথে বেরিয়ে পড়ে, তা আমার জানা ছিল না।


মনে পড়ে সেই বাল্যস্মৃতির কথা, অরোরা বুক ডিপোর মালিকের দুঃখ, রামকৃষ্ণকথামৃতের কপিগুলো বিক্রি করতে পারছি না, অথচ সেই ভক্ত ভদ্রলোক বলছেন ক্রমশই চাহিদা বাড়ছে। তার পর আমাদের চোখের সামনেই কথামৃতের চাহিদা বিপুল বাড়ল, গীতাকেও ছাড়িয়ে গেল। কেউ কেউ বলতে লাগল, শেষযাত্রার আগে মৃতের শয্যায় গীতা দেওয়া হয় ডজন দরে, আর জ্যান্ত সংসারীদের বিশেষ প্রয়োজন দক্ষিণেশ্বরের পুজুরি বাউনের অমৃতকথা।

চাটুজ্যে বাউনের জুটে গিয়েছে

বদ্যি পাবলিসিটি অফিসার—

নাম তাঁর মহেন্দ্রনাথ গুপ্ত। কেউ তাঁকে দেখেনি, নিজের পয়সায় তিনি বই ছাপিয়েছেন। মা সরস্বতী ও মা লক্ষ্মী দু’জনেই একসঙ্গে দয়া করেছেন।


আমাদের বিবেকানন্দ স্কুলের প্রধান শিক্ষক হাঁদুদার সংগ্রহে দুটো বইয়ের সমস্ত খণ্ড ছিল— স্বামী সারদানন্দের লীলাপ্রসঙ্গ ও শ্রীম রচিত কথামৃত। দুটো বই থেকেই হাঁদুদা উদ্ধৃতি দিতেন। তবে বলতেন, ‘কথামৃতের জন্য কোনও মানে বইয়ের প্রয়োজন নেই। হাজার হোক, একজন হেডমাস্টারের লেখা তো, যে পড়বে সে-ই বিনা পরিশ্রমে পাশ করে যাবে।’


আমাদের স্কুলের বেয়ারা গজেনও চুপিচুপি কথামৃত পড়েছিল। তার মুখেই শুনেছি, স্বয়ং ঠাকুর স্বপ্নে এই বই ডিকটেট করেছিলেন এক হেডমাস্টারকে। এই হেডমাস্টার হাওড়া নয়, কলকাতায় থাকতেন। স্কুলের সিনিয়র শঙ্করীপ্রসাদ বসু আমার ভুল ভাঙালেন। বললেন, ‘আমি খোঁজ নিয়েছি, ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণের চেয়ে ইনি আঠেরো বছরের ছোট ছিলেন। স্বামীজিরা দশ ভাইবোন আর এঁরা আট ভাইবোন।’


অনেকের ধারণা, যাঁরা পড়াশোনায় তেমন দড় নন, তাঁরাই স্কুল মাস্টার হতেন, পরীক্ষায় কৃতীরা ব্যারিস্টারি কিংবা ডাক্তারির দিকে ঝুঁকতেন। কিন্তু এই মহেন্দ্রনাথ গুপ্ত হেয়ার স্কুল থেকে প্রবেশিকা পরীক্ষায় দ্বিতীয় স্থান অধিকার করেন। এফ.এ পরীক্ষায় গণিতের একটি বিভাগে উপস্থিত না থেকেও পঞ্চম হন এবং প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে সসম্মান বি.এ।


কেউ কেউ প্রশ্ন করেন, মহেন্দ্রনাথের কথামৃত রচনায় আগ্রহের পটভূমি কী ? তিনি নিজেই বলেছেন, ছাত্রজীবনে ‘চৈতন্যচরিতামৃত’ তাঁকে মুগ্ধ করে, ‘আমি পাগলের মতো এই বই পড়তাম।’ ওকালতির ব্যাপারে তাঁর বিখ্যাত উক্তি, ‘ওকালতি করো আর না করো, আইন পড়ো।’ পরবর্তী কালে ডাক্তার ভক্তদের বলতেন, ‘গরিব-দুঃখীদের কেউ দেখবার নেই, কেউ তাদের খবর নেয় না।’


আঠেরো বছর বয়সে সেকালের রীতি অনুসারে মহেন্দ্রনাথের বিবাহ। অর্থাভাবে আইন পরীক্ষায় না বসে, বাবার অফিসে তিনি কিছু দিন চাকরি করেন এবং তার পরেই তাঁর মাস্টার জীবনের শুরু যশোহরের নড়াইল হাই স্কুলে। এ বার একের পর এক কর্মস্থান পরিবর্তন। জীবনীকারেরা তালিকা দিয়েছেন— কলকাতায় সিটি ও রিপন কলেজিয়েট স্কুল, মেট্রোপলিটন, ওরিয়েন্টাল সেমিনারি, এরিয়ান, মডেল প্রভৃতি স্কুলের তিনি হেডমাস্টার। এক সময়ে তিনি কলেজে ইংরেজি, ইতিহাস, অর্থনীতি পড়িয়েছেন।


অনেকের প্রশ্ন, যখন দক্ষিণেশ্বরে শ্রীরামকৃষ্ণ দর্শন, তখন মহেন্দ্রনাথ গুপ্ত কী করতেন? উত্তর— তখন তিনি শ্যামবাজার মেট্রোপলিটন শাখা বিদ্যালয়ের প্রধান। তাঁর ছাত্ররা শ্রীরামকৃষ্ণের বাঘা বাঘা শিষ্য— স্বামী ব্রহ্মানন্দ, স্বামী প্রেমানন্দ, স্বামী সুবোধানন্দ। শুরুতেই স্বয়ং ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ তাঁকে ‘মাস্টার’ নামে ডাকতেন।


রামকৃষ্ণের সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎ এক মানসিক দুর্যোগের সময়ে, তারিখটা ভক্তজনেরা আজও ভোলেন না— ২৬ ফেব্রুয়ারি ১৮৮২, রবিবার দক্ষিণেশ্বরে। এই ঠাকুরই তাঁকে পরিচয় করিয়ে দেন নরেন্দ্রনাথ দত্তের সঙ্গে। গান গাইতে বলায় উৎসাহ না দেখানোয় শ্রীরামকৃষ্ণের সেই বিখ্যাত মন্তব্য, ‘ও স্কুলে দাঁত বার করবে আর এখানে গান গাইতেই যত লজ্জা।’


নিজে মাস্টার হয়ে তিনিই তো পিতৃবিয়োগ ও অন্নকষ্টে কাতর নরেন্দ্রনাথকে মেট্রোপলিটন স্কুলে মাস্টারি জোগাড় করে দেন। গোপনে নরেন্দ্রনাথের জননীকে তিনি অর্থসাহায্য করতেন। তাঁর জীবনীকার স্বামীজির চিঠি থেকে উদ্ধৃতি দিয়েছেন— ‘মাস্টারমহাশয়, আমি এখন ভিক্ষা করিয়া খাইতেছি। আমাকে কিছু ভিক্ষা দিবেন?’


মহেন্দ্র জীবনীকারেরা বলেছেন, সেই সময়ে কৃতী শিক্ষকেরা একই সঙ্গে একাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মাস্টারি করতেন। ১৮৭৫ থেকে ১৯০৫ পর্যন্ত নানা স্থানে শিক্ষকতা করে শেষ পর্বে তিনি নকড়ি ঘোষের কাছ থেকে ঝামাপুকুরের মর্টন ইনস্টিটিউট ক্রয় করেন। এই স্কুলই কিছু দিন পরে ৫০ নম্বর আমহার্স্ট স্ট্রিটে স্থানান্তরিত হয়। তাঁর উপাধি তখন রেক্টর।


ঠাকুরের প্রথম দর্শনলাভের পরে অর্ধশতাব্দী বেঁচে থেকে, ১৯৩২ সালের ৪ জুন কলকাতায় তাঁর দেহাবশেষ। তার পূর্বরাত্রে ন’টার সময়ে পঞ্চমভাগ ‘কথামৃত’র প্রুফ দেখা শেষ হয়, এ কথা আজও ভক্তজনের মুখে মুখে।


মহেন্দ্রনাথ গুপ্তের দেহাবসানের পর দুর্গাপদ মিত্র ‘উদ্বোধন’ পত্রিকার পরপর চার সংখ্যায় লেখক মহেন্দ্রনাথের অনেক খবর লিপিবদ্ধ করেন। ঠাকুরের মহাপ্রয়াণ ১৮৮৬-র অগস্ট মাসে আর মহেন্দ্রনাথের সাহিত্যযাত্রার সময় ১৮৯৭ থেকে ১৯৩২— অর্থাৎ ৩৫ বছর। দুর্গাপদ মিত্র জানাচ্ছেন, যখন তিনি দক্ষিণেশ্বর সভায় যেতেন, ঠাকুর কখনও কখনও তাঁকে ‘হেডমাস্টার’, ‘সাড়ে তিনটে পাশ’, ‘ইংলিশম্যান’ ইত্যাদি নানা নামে তাঁর পরিচয় দিতেন। কখনও তাঁকে বলতেন, ‘মাস্টার’— ‘মহেন্দর মাস্টার’।


দুর্গাপদ মিত্রের মন্তব্য, ‘বাহ্য দৃষ্টিতে মহেন্দ্রনাথ গৃহী বটে, কিন্তু জীবনযাত্রা নির্বাহের ধরন-ধারণে তিনি প্রচ্ছন্ন সন্ন্যাসী ভিন্ন কিছুই নহেন।’


১৮ ফেব্রুয়ারি ১৮৮২ থেকে ১৮৮৬-র অগস্ট পর্যন্ত মহেন্দ্রনাথ গুপ্ত সুযোগ ও সময় পেলে ঠাকুরের সঙ্গ করতে লাগলেন। এই সময়ে শ্যামবাজার স্কুলের এন্ট্রান্স পরীক্ষার ফল আশানুরূপ না হওয়ায় মালিক বিদ্যাসাগরের সঙ্গে তাঁর অস্বস্তিকর বাক্য বিনিময় হয়।


বিদ্যাসাগর, মহেন্দ্রনাথ ও নরেন্দ্রনাথের চাকুরি জীবনের বিপর্যয় নিয়ে আজও যথেষ্ট গবেষণা হয়নি। আমরা জানি, বিদ্যাসাগর নিজেই এক সময়ে চাকরি থেকে ইস্তফা দিয়েছিলেন। এক সময়ে তিনি বলেছিলেন, ‘তেমন প্রয়োজন হলে স্বপাক ভিক্ষা-অন্ন ফুটিয়ে নিয়ে ক্ষুধানিবৃত্তি করব।’


পরবর্তী পর্যায়ে মহেন্দ্রনাথ গুপ্ত হলেন বিদ্যাসাগরের বিশ্বস্ত হেডমাস্টার। পিতৃহীন নরেন্দ্রনাথ দত্ত যখন চাকরির সন্ধানে বারবার বিড়ম্বিত হচ্ছেন, তখন মহেন্দ্রনাথই তাঁকে বিদ্যাসাগরের মেট্রোপলিটন শাখার চাকরি জোগাড় করে দেন। কিন্তু বিদ্যাসাগরের জামাতা (ওই স্কুলের সেক্রেটারি) বাদ সাধলেন। তিনি ছেলেদের দিয়ে পিটিশন করালেন, নতুন হেডমাস্টার পড়াতে পারেন না। সেই সব কাগজপত্র বিদ্যাসাগরের কাছে যাওয়া মাত্র বিদ্যাসাগর ডেকে পাঠালেন মহেন্দ্রনাথকে। বললেন, ‘তুমি নরেন্দ্রকে বলো, আর না আসে।’ বুকে সাহস বেঁধে নরেন্দ্রনাথকে

তা বলতে হল। নরেন্দ্রর দিক

থেকে কিন্তু কোনও প্রতিবাদ নেই। সে শুধু বলল, ‘কেন ছেলেরা একথা বললে? আমি তো খুব খেটেখুটে পড়াতুম।’


পরবর্তী সময়ে মহেন্দ্রনাথও কোপানলে পড়লেন বিদ্যাসাগরের। স্কুলের আশানুরূপ ফল না হওয়ার পিছনে রয়েছে হেডমাস্টারের সর্বদা কাশীপুর যাতায়াত। ঠাকুরের উপরে অকারণে আক্ষেপ আসায়, পদত্যাগ করলেন বিরক্ত মহেন্দ্রনাথ। ছুটলেন ঠাকুরের কাছে। তিনি সব শুনে বললেন, ‘বেশ করেছো, বেশ করেছো, বেশ করেছো।’


কিন্তু সংসার চলবে কী করে? কয়েক দিনের মধ্যে তাঁর অর্থাভাব চরমে উঠল। কী খেতে দেবেন ছেলেপুলেদের? সৌভাগ্যক্রমে একটা সুযোগ জুটে গেল সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের সদ্য স্থাপিত রিপন কলেজে। এই প্রসঙ্গেই আমরা জানতে পারি, ঠাকুরের অনুপ্রেরণায় শ্রীম মনে করতেন, ‘চাকরি অপেক্ষা ব্যবসা ভালো’। ঠাকুর নাকি তাঁর প্রিয় ব্রহ্মানন্দকে (রাখাল মহারাজ) বলেছিলেন, ‘বরং শুনবো তুই গঙ্গায় ঝাঁপ দিয়েছিস, তবু পরের চাকরি করছিস যেন না শুনি।’


ঠাকুরের পছন্দ-অপছন্দ সম্বন্ধে বেশ কিছু মূল্যবান খবর দিয়েছেন মহেন্দ্রনাথ—


ক) ঠকবি না


খ) ঠাকুরের প্রথম বিশেষ লক্ষ্য, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা


গ) অপব্যয় নয়, লক্ষ্মীছাড়ার চেয়ে কৃপণ হওয়া ভালো


ঘ) ঠাকুরের বিশেষ অপছন্দ, ছেঁড়া কাপড় কিংবা ময়লা কাপড় পরা


ঙ) এলোমেলো ভাব নয়, যেখানকার জিনিস সেখানে রাখা


চ) নিজের রান্না নিজে

করা, ‘নিজের দুটি চাল নিজে

ফুটিয়ে নেবে।’


ডায়েরির সংক্ষিপ্ত স্কেচ থেকে বহু সময়ের ব্যবধানে মাস্টার মহেন্দ্রনাথ কী ভাবে কথামৃত রচনা করতেন, তার বিবরণও রয়েছে। ‘শ্রীম-র মানসপটে চিত্রিত রয়েছে ঠাকুর রামকৃষ্ণের চিত্রাবলী। আত্ম-ডায়েরিতে রয়েছে সেই চিত্রাবলীর স্কেচ। সেই দিনলিপি খুলে শ্রীম সম্মুখে রাখেন এবং ধ্যানমগ্ন থাকেন ঘণ্টার পর ঘণ্টা।’


সামান্য কয়েকটি স্কেচ থেকে তিনি কী করে বিস্ময়কর কথামৃত রচনা করলেন, তার উত্তরে স্বামী বীরেশ্বরানন্দকে শ্রীম বলেছিলেন, ‘লোকে দেখে ত্রিশ বছরের ঘটনা, কিন্তু আমি দেখছি আমার চোখের সামনে ঘটছে এইক্ষণে।’


গবেষক স্বামী প্রভানন্দ (বরুণ মহারাজ) জানিয়েছেন, কথামৃতের শতকরা আশি ভাগ রচনা শ্রীম শেষ করেছিলেন ১৮৯৭ থেকে ১৯১০-এর মধ্যে। তখন তাঁর বয়স ৪৪ থেকে ৫৬।


১৮৯৮ থেকেই বাংলায় তাঁর লেখা বেরোচ্ছে, কিন্তু ‘কথামৃত’ শব্দটি প্রথমে ছিল না। তত্ত্বমঞ্জরী পত্রিকায় নাম ছিল ‘শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণলীলামৃত’। পরে নাম হল ‘শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণপরমহংসের কথা’। ১৮৯৯ থেকে ‘শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণকথামৃতম্’।


কলেজ স্ট্রিট বইপাড়ায় শোনা যায়, খ্যাতনামা প্রকাশক গুরুদাস চট্টোপাধ্যায় এই বই রিজেক্ট করেন। শোনা যায়, ‘বসুমতী’ আদিতে বুঝতে পারেনি, তাই তেমন আগ্রহ দেখায়নি। ব্যাপারটা শাপে বর হল। মহেন্দ্রনাথ নিজেই প্রকাশকের ভূমিকায় নামলেন। ‘বসুমতী’র উপেনবাবু পরামর্শ দিলেন— কাগজ ভাল হবে, ছাপা সুন্দর হবে, গেটআপ আকর্ষণীয় হবে আর দাম বেশি হবে। দাম বেশি রাখার উপদেশটি মহেন্দ্রনাথ গ্রহণ করেননি এবং তাঁর পরিবার দীর্ঘ এক শতাব্দী ধরে বইটির বিস্ময়কর বিপণন করেছিল।


বলে রাখা ভাল, বাংলায় ‘শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণকথামৃত’ প্রথম ভাগ প্রকাশিত হয় ১৯০২ সালে, দ্বিতীয় ভাগ ১৯০৫, তৃতীয় ভাগ ১৯০৮, চতুর্থ খণ্ড ১৯১০ এবং শেষ খণ্ড মাস্টারমশায়ের মৃত্যুর পরে (১৯৩২)।


ঠাকুরের মহাসমাধির দু’বছর পরে রথযাত্রার পরের দিন (১১ জুলাই ১৮৮৮) নীলাম্বরবাবুর ভাড়াবাড়িতে মহেন্দ্রনাথ তাঁর পাণ্ডুলিপির একাংশ শুনিয়েছিলেন জননী সারদামণিকে।


আরও কিছু মজার খবর আছে। একটি ছোট পুস্তিকা প্রথম প্রকাশিত হয়— ‘সাধু মহেন্দ্রনাথ গুপ্তের নিকট হইতে উপাদান সংগ্রহ করে সচ্চিদানন্দ গীতরত্ন দ্বারা প্রকাশিত’। এই দু’জনই যে ছদ্মনামে স্বয়ং মহেন্দ্রনাথ, তা এখন সন্দেহাতীত। এই পুস্তিকা পড়েই স্বামী বিবেকানন্দ ফেব্রুয়ারি ১৮৯৯ লিখে পাঠান, ‘মাস্টারমশায়, আপনাকে লক্ষ লক্ষ ধন্যবাদ।’


অদ্ভুত ত্যাগের জীবন আমাদের মাস্টারমশায়ের। তিনটি স্কুলের তিনটি উপার্জন যেত তিন জায়গায়— একটি বরাহনগর মঠে সংসারত্যাগী গুরুভাইদের সেবায়, আর একটি সারদাদেবী ও সন্ন্যাসীদের সেবায় এবং তৃতীয় মাইনে থেকে চলত নিজের সংসার।


বইয়ের অসম্পূর্ণতা ধরলে আছে কিছু। ঠাকুরের শেষ কয়েক মাসের কোনও বর্ণনা লিপিবদ্ধ হয়নি প্রকাশিত পাঁচ খণ্ডে। ভক্তদের ধারণা, আরও কয়েক খণ্ড কথামৃত লেখার উপাদান শ্রীম-র কাছে ছিল— কেউ বলেন আরও দু’খণ্ড, কেউ বলেন আরও পাঁচ খণ্ড। চতুর্থ খণ্ডের ভূমিকায় শ্রীম লিখেছিলেন, শ্রীশ্রীকথামৃত ছয়-সাত খণ্ডে সমাপ্ত হইলে শ্রীমুখ-কথিত চরিত্রামৃত অবলম্বন করিয়া একটি জীবনী লিখিবার উপকরণ পাওয়া যাইবে।


আরও হিসেব হয়েছে। ঠাকুরের সঙ্গে মহেন্দ্রনাথের ৭১টি সাক্ষাৎকার দক্ষিণেশ্বরে, ২৫৫ জন ভক্ত ও আগন্তুকের নাম উল্লেখ আছে মহেন্দ্রনাথের সুবিশাল রচনায়।


পরবর্তী কালে ডা. জলধিকুমার সরকার যে ‘মহানির্দেশিকা’ সংকলন করেন, তার প্রাথমিক তথ্য লিপিবদ্ধ করতেই ২৮,০০০ কার্ড প্রয়োজন হয়েছিল।


ঠাকুরের বাণী বিশ্বপ্রচারের জন্য লিখতে বসেননি মহেন্দ্রনাথ, তিনি নিজেই একবার কৌতূহলী গিরিশচন্দ্র ঘোষকে বলেছিলেন, ‘আমি নিজের জন্য লিখছি,

অন্যের জন্য নয়, আমার দেহ

যাবার সময় পাবে।’


আরও হাজার কাহিনি এই শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণকথামৃতকে কেন্দ্র করে। একটি হল, কলকাতার ট্রামে পাণ্ডুলিপি হারিয়ে যাওয়া। যেমন বহু বছর আগে হারিয়েছিল চৈতন্যচরিতামৃত এবং বিলেতে গীতাঞ্জলির ইংরেজি অনুবাদের মূল্যবান পাণ্ডুলিপি। আমাদের সৌভাগ্য, তিনটি পাণ্ডুলিপিই

খুঁজে পাওয়া গিয়েছিল

যথাসময়ে।


অপরের মঙ্গল নিয়ে সদাবিব্রত মহেন্দ্রনাথ যে নিজের পারিবারিক অশান্তি থেকে মুক্তি পাননি, তার দীর্ঘ হৃদয়স্পর্শী বিবরণ রয়েছে তাঁর শিষ্য নিত্যানন্দের ১৬ খণ্ডের ‘শ্রীমদর্শন’-এ। প্রথম ছেলে নির্মলের অকালমৃত্যুর সময়ে শ্রীরামকৃষ্ণের আশ্রয় মহেন্দ্রনাথের কাজে লেগেছিল। ‘তৃতীয় পুত্র চারু বয়ে গিয়েছিল।’ আদরের কন্যা হাঁদুর বিবাহিত জীবন সুখের হয়নি, তাঁর অকালমৃত্যু ২২-২৩ বছরে। চিরকুমার কনিষ্ঠ পুত্রের সঙ্গে পিতার সম্পর্ক এক আশ্চর্য বেদনাদায়ক কাহিনি। সে রেসকোর্সে ঘোড়দৌড় ও জুয়াখেলায় আকৃষ্ট। এই পুত্রকে গৃহ থেকে বিতাড়িত করলেন দ্বিধাহীন মহেন্দ্রনাথ। ১৯২৪ সালে সেই পুত্র ‘আশ্রয়হীন ও অন্নবস্ত্রহীন হইয়া খুবই দুর্দশায় পতিত হইলেন।’ এই বিতাড়িত পুত্র পরে বাবাকে একটি চিঠি লেখেন— ‘বাবা, আমি অনাহারে মৃতপ্রায়। আমায় কিছু অর্থ দিন।’


টাকা কিছু দেবেন, কিন্তু পুত্রকে ঘোড়দৌড়ে যাওয়া বন্ধ করতে হবে। পুত্র সেই চিঠি পড়লেন, কিন্তু প্রতিশ্রুতি দিয়ে অর্থ গ্রহণ করলেন না। অনাহারে মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়েও নিজের বাবাকে প্রবঞ্চিত তিনি করতে চাইলেন না। এই পিতা-পুত্র কাহিনি চণ্ডীগড় থেকে প্রকাশিত ১৬-খণ্ড শ্রীমদর্শন-এর অনন্য কাহিনি, মানুষ মহেন্দ্রনাথ এখানে নতুন ভাবে উদ্ভাসিত। স্নেহে অন্ধ হয়েও আমাদের শ্রীম নিজের নিয়মকানুন বিন্দুমাত্র শিথিল করেননি। এই বিপথগামী পুত্রকে আমরা আবার দেখি ১৯৩২ সালে কলকাতায়। পিতার দাহকার্যের সময়ে।


কথামৃতের খবরাখবর দিয়েই এই সামান্য রচনা শেষ করা প্রয়োজন। উদ্বোধন প্রেসে ছাপা হলেও বিজ্ঞাপনে লেখা হত, ‘গুরুপ্রসাদ চৌধুরীর গলিতে শ্রীপ্রভাসচন্দ্র গুপ্তের নিকট প্রাপ্তব্য’। সমকালের নানা নিন্দা সমালোচনা মাস্টারমশায় মহেন্দ্রনাথকে সহ্য করতে হয়েছে। সেও মস্ত এক কাহিনি।


ভক্ত মহেন্দ্রনাথ গুপ্তের বিচিত্র জীবনকথা আজ দেশে দেশে প্রচারিত। কিন্তু তাঁর সর্বশ্রেষ্ঠ সৃষ্টি যে ‘শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণকথামৃত’, সে সম্বন্ধে কোথাও দ্বিমত নেই। এ দেশের প্রকাশনার ইতিহাসে এমন বই আর দ্বিতীয় নেই, তা সবাই এখন নতমস্তকে মেনে নেন। শেষে মহেন্দ্রনাথের নিজস্ব মন্তব্যটিই শেষ কথা। তিনি ১৯১৯-এর ফেব্রুয়ারিতে একজন পাঠককে বলেছিলেন, ‘ঠাকুরের কাজ ঠাকুরই করেছেন। তিনি মেধারূপে, ইচ্ছাশক্তিরূপে আমার ভিতরে আবির্ভূত হয়ে লিখিয়েছেন। তিনিই কর্তা ও কারয়িতা। আমরা বুঝি আর না বুঝি।’


[FROM AN ARTICLE PUBLISHED IN ANANDA BAZAR PATRIKA]

             ( সংগৃহীত )

============================

Tuesday, July 15, 2025

27>শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণকথামৃত"::---

 27>শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণকথামৃত"::---

"শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণকথামৃত" হল একটি বিখ্যাত বাংলা গ্রন্থ, যা উনিশ শতকের হিন্দু ধর্মগুরু শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংস দেবের উপদেশ ও কথোপকথনের সংকলন। 

মহেন্দ্রনাথ গুপ্ত, যিনি "শ্রীম" নামে পরিচিত, এই গ্রন্থটি রচনা করেন। 

এটি পাঁচটি খণ্ডে প্রকাশিত হয়েছে এবং বাংলা সাহিত্যের একটি বিশেষ ধর্ম গ্রন্থ

হিসেবে পরিচিত।

"কথামৃত" শব্দটি এসেছে "কথা" =বচন বা উক্তি থেকে এবং "অমৃত"= অর্থ মকরন্দ বা অমৃত থেকে, যা শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণে দেবের মুখ  মুখনিঃসৃত বাণী যা অমৃতের মতো,পবিত্র  সত্য। শ্রীম নিজে এই গ্রন্থটিকে "নবযুগের ভাগবত" হিসেবেও উল্লেখ করেছেন। 

গ্রন্থটির মূল বিষয় হল শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসের  ধর্মীয় চিন্তা, আধ্যাত্মিক উপলব্ধি এবং ভক্তদের সঙ্গে তার কথোপকথন। এতে শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণের বিভিন্ন লীলা, যেমন - দক্ষিণেশ্বরে অবস্থান, ভক্ত সকলেরসঙ্গে কথোপকথন, এবং বিভিন্ন ধর্মমতের প্রতি তার দৃষ্টিভঙ্গি বর্ণিত হয়েছে। এটি কেবল একটি ধর্মগ্রন্থ নয়, বরং একটি সামাজিক দলিলও, যা উনিশ শতকের বাংলার সমাজ ও সংস্কৃতির চিত্রও তুলে ধরে। 

কথামৃতের পাঁচটি খণ্ড: প্রথম খণ্ড (১৯০২), দ্বিতীয় খণ্ড (১৯০৪), তৃতীয় খণ্ড (১৯০৮), চতুর্থ খণ্ড (১৯১০), পঞ্চম খণ্ড (১৯৩২). সালে প্রকাশিত হয়। 

এই গ্রন্থটি বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির এক অমূল্য সম্পদ, যা শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ দেবের দর্শন ও শিক্ষাকে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বাঁচিয়ে রেখেছে। 

====================



'কথামৃতে"র পরিচয় দিতে গিয়ে 'কথামৃতকার' শ্রীম, মহেন্দ্রনাথ গুপ্ত, তথা মাস্টারমশাই, ভাগবতের একটি শ্লোকের উদ্ধৃতি দিয়েছেন। শ্লোকটি হ'লঃ--


"তব কথামৃতং তপ্তজীবনং কবিভিরীড়িতং কল্মষাপহম্।" 

"শ্রবণমঙ্গলং শ্রীমদাততং ভুবি গৃণন্তি যে ভূরিদা জনাঃ।।" ১০।৩১।৯


 অর্থাৎ --তোমার এই যে কথারূপ অমৃত, কি রকম ?   না, 'তপ্তজীবনম্' ---- সংসারতাপে তপ্ত যে মানুষ, মৃতপ্রায় দগ্ধ যে মানুষ, পুড়ে মরছে যে মানুষ, তার কাছে জলস্বরূপ।  তার সমস্ত যন্ত্রণার অবসান করে---তাকে জন্ম-মৃত্যুর হাত থেকে, সংসারচক্র থেকে বাঁচায় এই কথারূপ অমৃত। 

    তারপর বলছেন 'কবিভিরীড়িতম্'।  কবি অর্থাৎ জ্ঞানী যাঁরা, শাস্ত্রমর্ম যাঁরা জানেন, তাঁরা এই 'কথামৃতে'র প্রশংসা করেন। তাঁরা সর্বদা এই 'কথামৃতে'র স্তুতি করেন এই ব'লে যে, এই 'কথামৃত' মানুষকে মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচায়----মানুষ যে মরণশীল নয়, এই জ্ঞান দেয়।

      আরও এই 'কথামৃত' কিরূপ ?   না, 'কল্মষাপহম্'।  ---আমাদের সমস্ত কল্মষ, পাপ, কলুষ, কালিমা এই 'কথামৃত' দূর ক'রে দেয়। সংসারে আমরা অনেক কালি মেখেছি, কারও গায়ে যে কালি লাগেনি, এমন কথা কেউ  জোর ক'রে বলতে পারে না। এই কালিমা থেকে মুক্ত হবার উপায় কি ?  হয়তো অনেকের মনে অনুতাপ আসে যে, এই কালিমা থেকে মুক্তির আর কোন পথ নেই। তাই বলছেন, না, উপায় আছে----এই 'কথামৃত' 'কল্মষাপহম্'।

     শুধু তাই নয়, পুরাণে বলে, অমৃত পান করেই অমরত্ব লাভ হয়।  এ-অমৃত কিন্তু পানও করতে হয় না, কেবল মাত্র শুনেই জীবের কল্যাণ হয়----'শ্রবণমঙ্গলম্'।  তারপর যদি মনে হয়----আচ্ছা, শ্রবণেতে কল্যাণ হোক, কিন্তু আমার রুচি হবে কি না ?  

      তার উত্তরে বলছেন 'শ্রীমদ্' ----সৌন্দর্যবিশিষ্ট, এ-কথার ভিতরে এমন সুষমা আছে যে, মানুষকে অনায়াসে আকর্ষণ করে, স্বাভাবিকভাবে। আর, এই 'কথামৃত' এতটুকু নয় যে ফুরিয়ে যাবে।

      তাই বলছেন, 'আততম্'----বিস্তৃত। বিস্তৃত বলতে অপার এবং সহজলভ্য। যেমন আকাশ চারাদিকে বিস্তৃত থাকে, তাকে খুঁজে বার করতে হয় না, যেমন বায়ু চারাদিকে পরিব্যাপ্ত থাকে, তাকে অন্বেষণ ক'রে আবিষ্কার করতে হয় না, সেই রকম এই কথারূপ অমৃত অপার এবং অনায়াসলভ্য।

     এই 'কথামৃত' তা হ'লে আমরা সকলে পান করি না কেন ?   তার উত্তরে বলছেন,  'ভুবি গৃণন্তি যে ভূরিদা জনাঃ'----যারা বহু দান করেছে অর্থাৎ বহু সুকৃতি সঞ্চয় করেছে, তাদের এই কথারূপ অমৃতে স্বাভাবিক রুচি হয়----তারাই এর স্তুতি করে, কীর্তন করে, আলোচনা করে। রুচি কারো হয়, কারো হয় না। তার কারণ----পূর্বজন্মকৃত কর্ম।  পূর্ব পূর্ব জন্মের সঞ্চিত অনেক সুকৃতি যদি থাকে, তা হ'লে মানুষ আবাল্য এই রুচি নিয়ে  জন্মায়।  সহজাত হয় তার এই রুচি। সুকৃতি যদি কম থাকে, তা হ'লে হয়তো আঘাত পেয়ে তারপরে এই কথায় রুচি হয়।   

     এই রকম বিভিন্ন স্তরের মানুষ আছে। কিন্তু সকলেরই জন্য এই 'কথামৃত' কল্যাণকর এবং এই কথামৃতের অনুশীলন করতে যে একটা খুব কষ্ট হবে তা নয়।  রুচি থাকলেই এতে আনন্দ পাবে সকলে।

     

                - স্বামী ভূতেশানন্দ

======================

যিনি শ্রীরামচন্দ্ররূপে জগতের কল‍্যাণের জন্য সকলকে উপদেশ দিয়েছেন , তিনিই আবার শ্রীকৃষ্ণরূপে নানাভাবে  উপদেশ দিয়েছেন, তিনিই আবার শ্রীরামকৃষ্ণরূপে সকলের সহজবোধ‍্য হয় এমন করে এই কথামৃত বলেছেন

=========================




Friday, July 4, 2025

26>গুরুভক্তি কেমন হওয়া উচিত ।।

 ।।গুরুভক্তি কেমন হওয়া উচিত ।।


 এই সম্বন্ধে ভূতেশানন্দজী মহারাজ বলেছিলেন তার ভক্তদের ......মহারাজ বলেছিলেন, " গুরুতে কখন সাধারণ মনুষ্য বুদ্ধি করতে নেই ।গুরুই ইষ্ঠ আবার ইষ্ট ই গুরু। এ সম্বন্ধে তিনি একটি সুন্দর গল্প বলেছিলেন ( ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণদেব বলেছিলেন এই ধরনের ঘটনা ) 

       একবার এক গুরু পুত্রের অন্নপ্রাশনে ,গুরুজী তার সকল শিষ্যদের বলেছিলেন তোমরা যে যেমন পারবে আমাকে সাহায্য করবে এই শুভ কাজে। শিষ্য রা যে যেমন পারলো, কেউ সব্জি, কেউ চাল কেউ মিষ্টি নিয়ে এলো,তার মধ্যে একজন খুবই গরীব বিধবা এক ঘটি দুধ যোগাড় করে এনেছিল ।গুরু ঐ অল্প দুধ দেখে  রেগে দুধ ফেলে দিয়ে বল্লেন, " নদীতে ডুবে মরতে পারলি নে"? সে সরল গুরু বিশ্বাসী, " গুরুতে আজ্ঞা বলে কথা" , সে নদীতে ডুবতে গিয়ে দেখে স্বয়ং নারায়ণ এক ছোট্ট হাঁড়িতে  দুধ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন আর বল্লেন গুরুকে নিয়ে দিগে, এতেই তিনি সন্তুষ্ট হবেন।


       গুরুদেব ঐ দুধ যতোই তিনি জালা তে ঢালছেন ততই ঐ ছোট্ট হাঁড়িরর দুধ ভরে যাচ্ছে ।গুরুদেব এই আশ্চর্য জনক ঘটনা দেখে বল্লেন কে দিয়েছে এই দুধ। তিনি ঐ বিধবা মহিলা কে বল্লেন হয় আমাকে নারায়ণ দর্শন করা নয়তো আমি ডুবে মরবো ।বিধবা তখন গুরুদেব কে নদীর ধারে নিয়ে  গিয়ে নারায়ণ কে প্রার্থনা করলেন ।নারায়ণ আবির্ভূত হলেন, কিন্তু গুরুদেব নারায়ণ কে দেখতে পাচ্ছেন না তার অহংকারে জন্য । তখন বিধবা মহিলা বল্লেন, "প্রভু  আপনি যদি গুরুদেব কে না দেখা দেন তবে আমি প্রান বিসর্জন দেবো,সরল বিশ্বাসী বিধবা মহিলার কথা শুনে নারায়ণ দুজনকেই দেখা দিলেন।

=======================

Thursday, May 1, 2025

25>★★ রামকৃষ্ণ মঠ/ ঠাকুরের কথা ||(1 to 5)

    

25>★★ রামকৃষ্ণ মঠ/ ঠাকুরের কথা ||(1 to 5)

1> মঠ, মন্দিরে গিয়ে মনকে ঈশ্বর মুখীই রাখতে হয়।

2>শ্রীরামকৃষ্ণ সাধনার সার কথা।   

3>||  ধর্মের অর্থ এবং প্রথার মানে ||

4> "শ্রীশ্রীমায়ের আদেশ পাওয়ার প্রক্রিয়া" 

5> লক্ষ্মীর বাহন পেঁচা কেন..?? 



==============================

1> মঠ, মন্দিরে গিয়ে মনকে ঈশ্বর মুখীই রাখতে হয়।

"একজন ভক্ত বেলুড় মঠে এসে, এক প্রবীণ মহারাজ কে বললেন "আজকাল আমার আর মঠে আসতে ভালো লাগে না  I"

মহারাজ শান্ত ভাবে জিজ্ঞেস করলেন, " কারণটা কি জানতে পারি ?"

ভক্তটি বললেন, "মন্দিরের চার পাশের পরিবেশ আমার এখন আর ভালো লাগে না I এখানে এসে দেখি, মোবাইল টিপে টিপে দেখা, গল্প, অন্তরঙ্গ আড্ডা দেখি, এসব  আমার মোটেই ভালো লাগে না I"

মহারাজ কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, "আপনি চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবার আগে আমার একটা কথা রাখবেন ?"

ভক্তটি বললেন, "কি বলুন" I

মহারাজ বললেন, "একটি জলভর্তি গ্লাস হাতে নিয়ে আপনাকে মূল মন্দির থেকে গঙ্গার স্নানের ঘাট হয়ে, মায়ের মন্দির আর মূল মন্দির দুবার প্রদক্ষিণ করতে হবে !

শর্ত একটিই, গ্লাস থেকে এক ফোঁটা জলও যেন বাইরে না পড়ে I"

ভক্তটি বললেন, "নিশ্চয় পারবো "I

ভক্ত টি জলপূর্ণ গ্লাস হাতে নিয়ে পুরো প্রদক্ষিণ দু বার সম্পন্ন করলেন, এবং সব সময়েই নজর রাখলেন যাতে এক ফোঁটা জলও গ্লাস থেকে নিচে পড়ে না যায় I

প্রদক্ষিন শেষ করে মহারাজের কাছে গেলে, উনি ভক্ত টিকে  প্রশ্ন করলেন--

আপনি প্রদক্ষিণের সময়,  কাউকে মোবাইল টিপতে বা   গল্প করতে বা কাউকে কোনো আপনার অপছন্দের কাজ করতে দেখেছেন ?

ভক্তটি বললেন, "আমি এসব কিছুই লক্ষ্য করতে পারিনি, কারণ আমার মনোযোগ জলের গ্লাসের ওপরেই ছিল, যাতে এক ফোঁটা জলও গ্লাস থেকে না পড়ে I"

মহারাজ হেসে বললেন, "আপনি যখনই মঠ প্রাঙ্গণে এসেছেন, যে মূল উদ্দেশ্য নিয়ে এসেছেন এখানে, তাতে পূর্ণ মনোযোগ থাকলে, দেখবেন অন্য অপ্রিয় জিনিস, আপনার নজরে আসবেই না ।

           #সংগৃহিত#

==============================


2>শ্রীরামকৃষ্ণ সাধনার সার কথা।

পূজনীয় স্বামী ভূতেশানন্দ জী :: আমরা ভগবানের নাম করব। কত হাজার জপ করব, কতক্ষণ ধ্যান করব – এটি বড় কথা নয়।

 কেউ হয়তো নিরামিষ খায়, 

কেউ হয়তো এক বস্ত্রে থেকে ভগবানের জন্য তপস্যা করে। 

সেসব কিন্তু কিছুই কিছু নয়, যদি না সেগুলিতে আন্তরিকতা থাকে।

 আসল কথা হচ্ছে, আমাদের সমস্ত অন্তর দিয়ে ভগবানকে ভালবাসতে পারছি কি না তা দেখতে হবে......

যে ভালবাসায় সংসারের অন্য সমস্ত আকর্ষণ তুচ্ছ হয়ে যাবে। এই কথাটি মনে রাখতে হবে।


 ভাগবতে বলেছে, 

তাঁর প্রতি যে অনুরাগ তা জগতের অন্য সব অনুরাগকে ভুলিয়ে দেয়। সুতরাং তাঁর প্রতি আমাদের ভালবাসা কতখানি হলো – এই বিচার করে আমাদের সাধনপথে হাটতে হবে। 

আমরা তাঁর নামে মুহুর্মূহু মূর্ছা গেলেও কিছু  হবে না বা আমাদের সমস্ত জীবনটা বসে বসে ধ্যান করলেও হবে না, বছরের পর বছর লক্ষ লক্ষ জপ করলেও হবে না। তীর্থে তীর্থে ঘুরে বেড়ালেও হবে না। 

হবে তখন, যখন দেখব তিনি আমাদের অন্তরকে সর্বদা পরিপূর্ণ করে রয়েছেন। তিনি ভিন্ন আর কোনো চিন্তা বা বস্তু বা ব্যক্তির সেখানে স্থান নেই।আমাদের অন্তরের পূর্ণ অনুরাগ তাঁকে দিতে হবে। তাঁর চরণে নিজেদের পরিপূর্ণভাবে সমর্পণ করতে হবে। 


এটিই শ্রীরামকৃষ্ণের সাধনার সারকথা।

                               ..............স্বামী      

                                    ভূতেশানন্দ

============================

   3>||  ধর্মের অর্থ এবং প্রথার মানে ||

প্রশ্নঃ ধর্মের অনেক নিয়ম আজকাল কেউ-কেউ মানতে চাননা। এতে কি ধর্মের ক্ষতি হবে না? 


#স্বামী_সোমেশ্বরানন্দ


●●● বিজ্ঞানের সূত্র কেউ যদি না মানে তবে বিজ্ঞানের কোনো ক্ষতি হয় কি? না। হিন্দুদের মধ্যে অনেক প্রথা সময়ের সাথে বদলেছে।স্বামীর মৃত্যুর পর মহিলারা আজ সাদা শাড়ি পরেন না, পাশ্চাত্যে বাঙালিরা দুর্গাপুজো সুবিধামতো কোনো রবিবারে করেন, একাদশীতে অনেক মানুষই উপোস করেনা,  শবদেহ কাঠের আগুনে না জ্বালিয়ে ইলেকট্রিক চুল্লিতে পোড়ানো হয়। এজন্য ধর্মের কোনো ক্ষতি হয়েছে কি? না। প্রথা বদলালেই ধর্ম নষ্ট হয়না।কেন?

     আগে বুঝুন ধর্মের অর্থ এবং প্রথার মানে  কি।


ধর্ম কি? স্বামীজির ভাষায়ঃ অন্তর্নিহিত দেবত্বের প্রকাশই ধর্ম (Religion is the manifestation of divinity already in man)। পশুত্ব থেকে মনুষ্যত্ব এবং সেখান থেকে দেবত্বে ওঠাই ধর্ম। আরো ব্যাখ্যা করে বলেছেন তিনি -- "প্রতিটি জীবই স্বরূপত দিব্য স্বভাব সম্পন্ন। জীবনের লক্ষ্য বাইরের ও ভেতরের প্রকৃতিকে জয় করে অন্তর্নিহিত দেবত্বকে প্রকাশ করা। কর্ম, উপাসনা, মন:সংযম অথবা জ্ঞান-- এর মধ্যে একটি, একাধিক বা সবকটির সাহায্যে অন্তরের সেই দেবত্বকে বিকশিত করো এবং মুক্ত হও। এটাই ধর্মের সার। মতবাদ, আচার-অনুষ্ঠান, শাস্ত্র, মন্দির বা অন্যান্য বাহ্য  ক্রিয়াকলাপ হলো ধর্মের গৌণ অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ মাত্র।" 


তাহলে ধর্মের মূল উদ্দেশ্য কি? দিব্য স্বভাবের প্রকাশ। আর প্রথাগুলি, পারিবারিক-সামাজিক ঐক্য ধরে রাখার নিয়ম। এই নিয়মগুলি যুগেযুগে পাল্টায় যার প্রমাণ স্মৃতিশাস্ত্র সমূহ।

     অতএব প্রথা বা আচার-অনুষ্ঠান বদলে গেলে দু:খ করে লাভ কি? শুধু দেখতে হবে এই পরিবর্তন সমাজের ক্ষতি না করে। অনেক সময়ই পরিবর্তন বিকাশের লক্ষণ, যেমন দুর্গাপ্রতিমায় নতুন-নতুন ভঙ্গি। সৃজনীশক্তির পরিচয় এটা। বর্তমান যুগে মানুষের চাহিদা-প্রয়োজন-পরিস্থিতি বদলাচ্ছে।এর সাথে প্রথার পরিবর্তনও দরকার। মন্দির-মসজিদে মেয়েদের বাঁধা দেওয়া বৈষম্যের লক্ষণ, অতএব এর বদল ঘটা প্রয়োজন। প্রথা নিয়ে বেশি তর্ক চালালে ধর্মের মূল উদ্দেশ্য ভুলে গৌণ  বিষয়ে জড়িয়ে পড়ার বিপদ আছে। 


ধর্ম নিয়ে নিজের মধ্যে প্রশ্ন উঠলে চিন্তা করো মূল উদ্দেশ্য নিয়ে। দেবত্বের দিকে যাচ্ছো কিনা সেদিকে দৃষ্টি দাও। পথে চলতে গেলে কখনো নদী আসবে, কখনো বা পাহাড়, কিংবা মরুভূমি-জঙ্গল-শহর। কিন্তু ধ্রুবতারাকে লক্ষ্য করে চললে যেমন পথ ভুল হয়না, তেমনি "অন্তরের দেবত্ব"-কে মূল লক্ষ্য করে চললে প্রথাগুলি নিয়ে বিভ্রান্তি আসবেনা। 

     আমি কতটা ধার্মিক হয়েছি? অমুক ব্যক্তি কি ধার্মিক? দেখো চেতনার উত্তরণ হয়েছে কিনা,দেবত্ব প্রকাশিত হচ্ছে কিনা। এটাই bottom line, এটাই প্রমাণ ধর্মের।

~~~~~~~~~~~~~~~~~~

  4> "শ্রীশ্রীমায়ের আদেশ পাওয়ার প্রক্রিয়া" 


" জীবনে যদি কোনো সঙ্কট আসে আমাকে স্মরণ কোরো। নিজেকে কয়েক দিনের জন্য অপর লোকেদের থেকে আলাদা রেখে খুব করে জপধ্যান ও প্রার্থনা কোরো এবং আমার কাছে জিজ্ঞাসা করবে, 'মা, কি করব ?' ঐ সময় অল্প খাবে ; নিজের দেহ-মন পবিত্র রাখবে ; যতটুকু না হলে নয়, ততটুকুই অপরের সঙ্গে কথা বলবে। অপরকে জানতে দেবে না তুমি কি করছ। একমনে এভাবে প্রার্থনা ও সাধনা করে যাবে। কখনো ধৈর্য হারাবে না। যদি দেখ কোনো উত্তর আসছে না, তবে জানবে তোমার মন এখনো সেই স্তরে আসেনি যাতে তুমি আমার আদেশ পাও। ভক্তি ও বিশ্বাসের সঙ্গে ব্যাকুল হয়ে ডেকে গেলে আমার কাছ থেকে উত্তর পাবে। "

........... স্বামী শান্তানন্দ

( স্বামী শান্তানন্দজী পেয়েছিলেন মায়ের দর্শন ও আদেশ । তিনি ছিলেন একজন অতি উচ্চস্তরের সাধু ও শ্রীশ্রীমাতাঠাকুরানীর একজন প্রিয় শিষ্য। )

========================


5> লক্ষ্মীর বাহন পেঁচা কেন..?? 

"প্রদীপ জ্বালাই শঙ্খ বাজাই ভক্তিভরা মনে ,
এসো গো মা লক্ষ্মী বোস গো আসনে...."

আজ কোজাগরী লক্ষ্মী পূজা !!
"কোজাগরী" অর্থাৎ "কো জাগরী"
মানে 'কে জেগে রয়'...

মা লক্ষ্মী খোঁজ নেন কে জেগে আছে ,
সেই সৌভাগ্যবানের গৃহেই তিনি বিরাজ করেন !!

"এসো এসো আমার ঘরে এসো, আমার ঘরে..."

এ শুধু আক্ষরিক অর্থে নিশিযাপন নয়  !!

এ হল ধর্মলাভের পথে সদা জাগ্রত অবস্থা বা সতর্কতা বা সেচতনতা !!

তবেই 'লক্ষ্মী লাভ' হবে অর্থাৎ আধ‍্যাত্মিক সম্পদ জ্ঞান, ভক্তি, শ্রী, মাধুর্য লাভ হবে !!

সর্ব অবিদ‍্যা ভ্রান্তি বিনষ্ট হয় বিদ‍্যা  বুদ্ধির জাগরণ ঘটবে !!

।। যা দেবী সর্বভূতেষু লক্ষ্মীরূপেণ সংস্থিতা ।।

"এসো মা লক্ষ্মী বোস ঘরে ,
আমার এ ঘরে থাকো আলো করে..."

এ আলো জ্ঞানের...
এ আলো প্রজ্ঞার...
'হৃদয়' রূপ ঘরে জ্ঞানের জ‍্যোতি সদা জ্বালিয়ে রাখো !!

এই বার্তার্টাই যেন বহন করছে পেচক !!

মধুশ্রী দেবীর বাহন অমন কদাকার কেন...??

বাহ‍্যিক রূপ তার না থাকলেও গভীর আধ‍্যাত্মিক ব‍্যঞ্জনা বহন করছে পেঁচা !!

পেঁচা দিনে ঘুমায় রাতে জেগে রয়,
অর্থাৎ সাধককেও দিনে আহার নিদ্রা আদি কর্ম সমাপন করে রাতের গভীরে ডুব দিতে সাধনের অন্তঃপুরে...

"আমার সকল দুখের প্রদীপ জ্বেলে দিবস গেলে করব নিবেদন ,
আমার ব‍্যাথার পূজা হয়নি সমাপন...."

পেচক নির্জনবাসী ,
অর্থাৎ সাধককেও জাগতিক মায়া মোহ উপেক্ষা করে নির্জনে লোক চক্ষুর অন্তরালে ঈশ্বর চিন্তায় মগ্ন হতে হবে !!

ঋগ্বেদে বলা হয়েছে - পেচক যমের দূত !!
মৃত্যুচিন্তা বা মৃত্যু ভয়কে দূর করে সাধক বা ভক্তকে ইষ্ট চিন্তায় নিবিষ্ট থাকতে হবে !!

"যম" অর্থাৎ "সংযম", যা সাধন জীবনের প্রধান সম্পদ তো বটেই, জাগতিক উন্নতির ক্ষেত্রেও অবশ‍্য পালনীয় !!

ধানের শত্রু ইঁদুর ,
পেচক ইঁদুর নিধন করে...

এখানে রয়েছে লোক কল‍্যাণের বার্তা, যা রামকৃষ্ণ ভাবাদর্শে "শিবজ্ঞানে জীবসেবা" রূপ মূল স্তম্ভ  !!

মূল ভাবটিকে হৃদয়ঙ্গম করে আমরা যে যার নিজের মতো করে আনন্দের সঙ্গে কমলা আরাধনায় যুক্ত থেকে জীবন সার্থক করি !!

"এসো দেবী এসো এ আলোকে ,
একবার তোরে হেরি চোখে..."

      ।। জয় মা সারদালক্ষ্মী ।।

- সকল ভক্তানুরাগী বৃন্দকে কোজাগরী লক্ষ্মী পূজার আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও প্রণাম জানিয়ে সুমন চক্রবর্তী ।।