Saturday, December 9, 2023

16>|| আত্মারামের কৌটা' স্থাপনা=09/12/1898

 16>||আত্মারামের কৌটা' স্থাপনা ||

 

09/ 12/ 1898::--আত্মারামের কৌটা' স্থাপনা


আজ সেই দিন, ৯ই ডিসেম্বর। বড় পবিত্রতম আমাদের কাছে।

একশ পঁচিশ বছর আগের কথা। স্বামীজী বেলুড়ে ফিরে এসেছেন কাশ্মীর থেকে। ততদিনে মঠের নতুন দ্বিতল বাড়ি নির্মাণের কাজ প্রায় শেষ। গুরুভাইদের ডেকে বললেন, এবারে নীলাম্বরবাবুর বাগানবাড়ি থেকে নূতন বাড়িতে মঠ স্থানান্তরিত করতে হবে। পূর্ণোদ্যমে শুরু হয়ে গেল ব্যবস্থাপনা।

১৮৯৮ সাল। এদিন ভোরে গঙ্গাস্নান সেরে স্বামীজী প্রবেশ করলেন ঠাকুরঘরে। অনন্তর পূজকের আসনে বসে পুষ্পপাত্রে যতগুলি ফুল-বেলপাতা ছিল, একত্রে দুহাতে তুলে প্রভুর শ্রীপাদপদ্মে অঞ্জলি প্রদান করলেন। তারপর একেবারে ধ‍্যানস্থ। এইভাবে বেশ কিছুক্ষণ অতিবাহিত হয়ে গেল। ঠাকুরঘরের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে গুরুভ্রাতা, সন্ন‍্যাসীবৃন্দ ও অন‍্যান‍্য ভক্ত-শিষ‍্যরা স্বাক্ষী থাকলেন এই অপূর্ব দর্শনের।

এবারে বাগানবাড়ি থেকে উত্তরাভিমুখে শুরু হল ছোট একটি শোভাযাত্রা। সামনে স্বামীজী স্বয়ং। ডান কাঁধে ধরে রেখেছেন ঠাকুরের পূতাস্থি পূর্ণ তাম্রপাত্রটি----'আত্মারামের কৌটা'। গঙ্গার তীরে ঘন ঘন শঙ্খধ্বনি ও ঠাকুরের নামে জয়ধ্বনিতে মনে হল পার্শবর্তী জাহ্নবীও যেন নৃত‍্যে মেতেছে।

যেতে যেতে স্বামীজী শিষ‍্যকে বললেন,"ঠাকুর আমায় বলেছিলেন, 'তুই কাঁধে করে আমায় যেখানে নিয়ে যাবি, আমি সেখানেই যাব ও থাকব, তা গাছতলাই কি, আর কুটিরই কি!' সেজন‍্যেই আমি স্বয়ং তাঁকে কাঁধে করে নতুন মঠভূমিতে নিয়ে যাচ্ছি। নিশ্চই জানবি, বহুকাল পর্যন্ত 'বহুজনহিতায়' ঠাকুর ঐ স্থানে স্থির হয়ে থাকবেন।"

নূতন দালানের ঠাকুরঘরে এসে স্বামীজী কাঁধ থেকে আত্মারামের কৌটাটিকে নামিয়ে নির্দিষ্ট আসনে স্থাপন করলেন। অতঃপর ভূমিষ্ঠ হয়ে প্রণামপূর্বক শুরু হল ঠাকুরের পূজা। পূজান্তে প্রজ্বলিত যজ্ঞাগ্নিতে হোম করলেন। পরে সন্ন‍্যাসীদের সহযোগিতায় পায়েসান্ন তৈরী করে ঠাকুরকে ভোগ নিবেদিত হল। সকলের উদ্দেশ‍্যে স্বামীজী বললেন,"আপনারা আজ কায়মনবাক‍্যে ঠাকুরের পাদপদ্মে প্রার্থনা করুন যেন মহাযুগাবতার ঠাকুর আজ থেকে বহুকাল 'বহুজনহিতায় বহুজনসুখায়' এই পুণ‍্যক্ষেত্রে অবস্থান করে একে সর্বধর্মের অপূর্ব সমন্বয়কেন্দ্র করে রাখেন।" সকলে করজোড়ে প্রার্থনা করতে লাগলেন।

স্বামীজী বিশ্বজয় করে ফেরার সময় শ্রীশ্রীঠাকুরের পোর্সিলিনের পট তৈরী করিয়ে এনেছিলেন। আর নিরঞ্জন মহারাজ তৈরী করিয়ে রেখেছিলেন একটি সিংহাসন। পোর্সিলিনের পটে সেই আসনে বসিয়ে ঠাকুরের পূজা হল। ১৯৩৮ সালে নূতন মন্দিরে ঠাকুরের মূর্তি প্রতিষ্ঠার পরে পট সহ আসনটি নিয়ে যাওয়া হয় গর্ভমন্দিরের দোতলায়, ঠাকুরের শয়নকক্ষে।

বেলুড় মঠে স্বামীজীর ঘরের উত্তর পশ্চিমে দ্বিতল ভবনের সেই আদি মন্দিরটি একশত পঁচিশ বছরের স্মৃতিতে আজও পূর্ণমহিমায় সুবাসিত। ঠাকুরের আসনে শোভা পায় একটি তৈলচিত্র। অনেকেই বলেন 'পুরানো মন্দির'। তাতে কি! শ্রীশ্রীঠাকুর যে বলেছেন, তিনি এখানেই থাকবেন! শতকোটি প্রণাম নিও ঠাকুর।
   

জয় ঠাকুর জয় মা জয় স্বামীজী
জয় জয় গুরুদেব।
রামকৃষ্ণ শরণং, রামকৃষ্ণ শরণং ||

(আদ্যনাথ)

Saturday, July 29, 2023

15>|| প্রার্থনা::+মহামৃত্যুঞ্জয় মন্ত্র,

 


15>||প্রার্থনা::--+प्रार्थना::--মহামৃত্যুঞ্জয় মন্ত্র,



কেন করবো প্রার্থনা?

                      <--আদ্যনাথ-->

  --আমরা যে কী চাই, তাহা যথার্থভাবে জানিতে পারাই প্রার্থনার আরম্ভ।

রবীন্দ্র রচনাবলী  থেকে তুলে ধরলাম একটু ক্ষুদ্র অংশ।

প্রার্থনা

 একটা গল্প আছে—দেবতা একজনকে তিনটে বর দিতে চাহিয়াছিলেন। এত বড়ো সুযোগটাকে হতভাগ্য কী যে চাহিবে, ভাবিয়া বিহ্বল হইল—শেষকালে উদ্‌ভ্রান্তচিত্তে যে-তিনটে প্রার্থনা জানাইল, তাহা এমনি অকিঞ্চিৎকর যে, তাহার পরে চিরজীবন অনুতাপ করিয়া তাহার দিন কাটিল।


এই গল্পের তাৎপর্য এই যে, 

আমরা মনে করি পৃথিবীতে আর কিছু জানি বা না-জানি, ইচ্ছাটাই বুঝি আমাদের কাছে সব-চেয়ে জাজ্বল্যমান

—আমি সব-চেয়ে কী চাই, তাহাই বুঝি সব-চেয়ে আমার কাছে সুস্পষ্ট—কিন্তু সেটা ভ্রম। আমার যথার্থ ইচ্ছা আমার অগোচর।


অগোচরে থাকিবার একটা কারণ আছে—সেই ইচ্ছাই আমাকে নানা অনুকূল ও প্রতিকূল অবস্থার ভিতর দিয়া গড়িয়া তুলিবার ভার লইয়াছে। যে বিরাট ইচ্ছা সমস্ত মানুষকে মানুষ করিয়া তুলিতে উদ্‌যোগী, সেই ইচ্ছাই আমার অন্তরে থাকিয়া কাজ করিতেছে। ততক্ষণ পর্যন্ত সেই ইচ্ছা লুকাইয়া কাজ করে,—যতক্ষণ পর্যন্ত আমি আপনাকে সর্বাংশে তাহার অনুকূল করিয়া তুলিতে না পারি। তাহার উপরে হস্তক্ষেপ করিবার অধিকার আমরা লাভ করি নাই বলিয়াই সে আমাদিগকে ধরা দেয় না।


আমার সব-চেয়ে সত্য ইচ্ছা নিত্য ইচ্ছা কোন্‌টা? যে-ইচ্ছা আমার সার্থকতাসাধনে নিরত। আমার সার্থকতা আমার কাছে যতদিন পর্যন্ত রহস্য, সেই ইচ্ছাও ততদিন আমার কাছে গুপ্ত। কিসে আমার পেট ভরিবে, আমার নাম হইবে, তাহা বলা শক্ত নয়—কিন্তু কিসে আমি সম্পূর্ণ হইব, তাহা পৃথিবীতে কয়জন লোক আবিষ্কার করিতে পারিয়াছে? আমি কী আমার মধ্যে যে-একটা প্রকাশচেষ্টা চলিতেছে তাহার পরিণাম কী, তাহার গতি কোন্‌ দিকে, তাহা স্পষ্ট করিয়া কে জানে?

অতএব দেবতা যদি বর দিতে আসেন, তবে হঠাৎ দেখি, প্রার্থনা জানাইবার জন্যও প্রস্তুত নই। তখন এই

কথা বলিতে হয়, আমার যথার্থ প্রার্থনা কী, তাহা জানিবার জন্য আমাকে সূদীর্ঘ সময় দাও। নহিলে উপস্থিতমতো হঠাৎ একটা-কিছু চাহিতে গিয়া হয়তো ভয়ানক ফাঁকিতে পড়িতে হইবে।

বস্তুত আমরা সেই সময় লইয়াছি—আমাদের জীবনটা এই কাজেই আছে। আমরা কী প্রার্থনা করিব, তাহাই অহরহ পরখ করিতেছি। আজ বলিতেছি খেলা, কাল বলিতেছি ধন, পরদিন বলিতেছি মান—এমনি করিয়া সংসারকে অবিশ্রাম মনথন করিতেছি,—আলোড়ন করিতেছি। কিসের জন্য? আমি যথার্থ কী চাই, তাহারই সন্ধান পাইবার জন্য। মনে করিতেছি—টাকা খুঁজিতেছি, বন্ধু খুঁজিতেছি, মান খুঁজিতেছি; কিন্তু আসলে আর-কিছু নয়, কাহাকে যে খুঁজিতেছি; তাহাই নানাস্থানে খুঁজিয়া বেড়াইতেছি—আমার প্রার্থনা কী, তাহাই জানি না।

যাঁহারা আপনাদের অন্তরের প্রার্থনা খুঁজিয়া পাইয়াছেন বলেন—শোনা গিয়াছে তাঁহারা কী বলেন। তাঁহারা বলেন, একটিমাত্র প্রার্থনা আছে, তাহা এই—


অসতো মা সদ্‌গময়

তমসো মা জ্যোতির্গময়

মৃত্যোর্মামৃতং গময়।

আবিরাবীর্ম এধি।

রুদ্র যত্তে দক্ষিণং মুখং

তেন মাং পাহি নিত্যম্‌,

অর্থাৎ,

অসত্য হইতে আমাকে সত্যে লইয়া যাও, অন্ধকার হইতে আমাকে জ্যোতিতে/আলোতে লইয়া যাও, মৃত্যু হইতে আমাকে অমৃতে লইয়া যাও। হে স্বপ্রকাশ, আমার নিকটে প্রকাশিত হও। রুদ্র, তোমার যে প্রসন্ন মুখ তাহার দ্বারা আমাকে সর্বদাই রক্ষা করো।

কিন্তু কানে শুনিয়া কোনো ফল নাই এবং মুখে উচ্চারণ করিয়া যাওয়া আরও বৃথা। আমরা যখন সত্যকে আলোককে অমৃতকে যথার্থ চাহিব, সমস্ত জীবনে তাহার পরিচয় দিব, তখনই এ-প্রার্থনা সার্থক হইবে। যে প্রার্থনা আমি নিজে মনের মধ্যে পাই নাই, তাহা পূর্ণ হইবার কোনো পথ আমার সম্মুখে নাই। অতএব, সবই শুনিলাম বটে, মন্ত্রও কর্ণগোচর হইল--কিন্তু তবু এখনও প্রার্থনা করিবার পূর্বে প্রার্থনাটিকে সমস্ত জীবন দিয়া খুঁজিয়া পাইতে হইবে।

বনস্পতি হইয়া উঠিবার একমাত্র প্রার্থনা বীজের শস্যাংশের মধ্যে সংহতভাবে নিগূঢ়ভাবে নিহিত হইয়া আছে--কিন্তু যতক্ষণ তাহা অঙ্কুরিত হইয়া আকাশে আলোকে মাথা না তুলিয়াছে, ততক্ষণ তাহা না থাকারই তুল্য হইয়া আছে। সত্যের আকাঙক্ষা, অমৃতের আকাঙক্ষা আমাদের সকল আকাঙক্ষার অন্তর্নিহিত, কিন্তু ততক্ষণ আমরা তাহাকে জানিই না, যতক্ষণ না সে আমাদের সমস্ত ধূলিস্তর বিদীর্ণ করিয়া মুক্ত আকাশে পাতা মেলিতে পারে।

আমাদের এই যথার্থ প্রার্থনাটি কী, তাহা অনেক সময় অন্যের ভিতর দিয়া আমাদিগকে জানিতে হয়। জগতের মহাপুরুষেরা আমাদিগকে নিজের অন্তর্গূঢ় ইচ্ছাটিকে জানিবার সহায়তা করেন। আমরা চিরকাল মনে করিয়া আসিতেছি, আমরা বুঝি পেট ভরাইতেই চাই, আরাম করিতেই চাই--কিন্তু যখন দেখি, কেহ ধন-মান-আরামকে উপেক্ষা করিয়া সত্য, আলোক ও অমৃতের জন্য জীবন উৎসর্গ করিতেছেন, তখন হঠাৎ একরকম করিয়া বুঝিতে পারি যে, আমার অন্তরাত্মার মধ্যে যে ইচ্ছা আমার অগোচরে কাজ করিতেছে, তাহাকেই তিনি তাঁহার জীবনের মধ্যে উপলব্ধি করিয়াছেন। আমার ইচ্ছাকে যখন তাঁহার মধ্যে প্রত্যক্ষ দেখিতে পাই, তখন অন্তত ক্ষণকালের জন্যও জানিতে পারি--কিসের প্রতি আমার যথার্থ ভক্তি, কী আমার অন্তরের আকাঙক্ষা।

তখন আরও একটা কথা বোঝা যায়। ইহা বুঝিতে পারি যে, যে-সমস্ত ইচ্ছা প্রতিক্ষণে আমার সুগোচর, যাহারা কেবলই আমাকে তাড়না করে, তাহারাই আমার অন্তরতম ইচ্ছাকে, আমার সার্থকতালাভের

তখন আরও একটা কথা বোঝা যায়। ইহা বুঝিতে পারি যে, যে-সমস্ত ইচ্ছা প্রতিক্ষণে আমার সুগোচর, যাহারা কেবলই আমাকে তাড়না করে, তাহারাই আমার অন্তরতম ইচ্ছাকে, আমার সার্থকতালাভের প্রার্থনাকে বাধা দিতেছে, স্ফূর্তি দিতেছে না, তাহাকে কেবলই আমার চেতনার অন্তরালবর্তী, আমার চেষ্টার বহির্গত করিয়া রাখিয়াছে।

আর, যাঁহার কথা বলিতেছি, তাঁহার পক্ষে ঠিক ইহার বিপরীত। যে মঙ্গল-ইচ্ছা, যে সার্থকতার ইচ্ছা বিশ্বমানবের মজ্জাস্বরূপ, যাহা মানবসমাজের মধ্যে চিরদিনই অকথিত বাণীতে এই মন্ত্র গান করিতেছে--অসতো মা সদ্‌গময়, তমসো মা জ্যোতির্গময়, মৃত্যোর্মামৃতং গময়--এই ইচ্ছাই তাঁহার কাছে সর্বাপেক্ষা প্রত্যক্ষ, আর-সমস্ত ইচ্ছা ছায়ার মতো তাহার পশ্চাদ্বর্তী, তাহার পদতলগত। তিনি জানেন--সত্য, আলোক, অমৃতই চাই, মানুষের ইহা না হইলেই নয় অন্নবস্ত্র-ধনমানকে তিনি ক্ষণিক ও আংশিক আবশ্যক বলিয়াই জানেন। বিশ্বমানবের অন্তর্নিহিত এই ইচ্ছাশক্তি তাঁহার ভিতর দিয়া জগতে প্রত্যক্ষ হয় বলিয়া, প্রমাণিত হয় বলিয়াই তিনি চিরকালের জন্য মানবের সামগ্রী হইয়া উঠেন। 

আর আমরা খাই পরি, টাকা করি, নাম করি, মরি ও পুড়িয়া ছাই হইয়া যাই--মানবের চিরন্তন সত্য ইচ্ছাকে আমাদের যে-জীবনের মধ্যে প্রতিফলিত করিতে পারি না, মানবসমাজে সে-জীবনের ক্ষণিক মূল্য ক্ষণকালের মধ্যেই নিঃশেষ হইয়া যায়।

কিন্তু মহাপুরুষদের দৃষ্টান্ত আনিলে একটা ভুল বুঝিবার সম্ভাবনা থাকে। মনে হইতে পারে যে, ক্ষমতাসাধ্য প্রতিভাসাধ্য কর্মের দ্বারাতেই বুঝি মানুষ সত্য, আলোক ও অমৃতানুসন্ধানের পরিচয় দেয়। এতাহা কোনোমতেই নহে। তাহা যদি হইত, তবে পৃথিবীর অধিকাংশ লোক অমৃতের আশামাত্র করিতে পারিত না। যাহা সাধারণ বুদ্ধিবল-বাহুবলের পক্ষে দুঃসাধ্য, তাহাতেই প্রতিভা বা অসামান্য শারীরিক শক্তির প্রয়োজন, কিন্তু সত্যকে অবলম্বন করা, আলোককে গ্রহণ করা, অমৃতকে বরণ করিয়া লওয়া, ইহা কেবল একান্তভাবে, যথার্থভাবে ইচ্ছার কর্ম। ইহা আর কিছু নয়--যাহা কাছেই আছে, তাহাকেই পাওয়া।

ইহা মনে রাখিতে হইবে, আমাদিগকে যাহা-কিছু দিবার তাহা আমাদের প্রার্থনার বহুপূর্বেই দেওয়া হইয়া গেছে। আমাদের যথার্থ ঈপ্সিতধনের দ্বারা আমরা পরিবেষ্টিত। বাকি আছে কেবল লইবার চেষ্টা--তাহাই যথার্থ প্রার্থনা।

ঈশ্বর এইখানেই আমাদের গৌরব রক্ষা করিয়াছেন। তিনিই সব দিয়াছেন, অথচ এটুকু আমাদের বলিবার মুখ রাখিয়াছেন যে, আমরাই লইয়াছি। এই লওয়াটাই সফলতা, ইহাই লাভ,--পাওয়াটা সকল সময়ে লাভ নহে--তাহা অধিকাংশস্থলেই পাইয়াও না-পাওয়া, এবং অবশিষ্টস্থলে বিষম একটা বোঝা। আর্থিক-পারমার্থিক সকল বিষয়েই এ-কথা খাটে।


ঋষি বলিয়াছেন--


আবিরাবীর্ম এধি। হে স্বপ্রকাশ, আমার নিকট প্রকাশিত হও।


তুমি তো স্বপ্রকাশ, আপনা-আপনি প্রকাশিত আছই, এখন, আমার কাছে প্রকাশিত হও, এই আমার প্রার্থনা। তোমার পক্ষে প্রকাশের অভাব নাই, আমার পক্ষে সেই প্রকাশ উপলব্ধির সুযোগ বাকি আছে। যতক্ষণ আমি তোমাকে না দেখিব, ততক্ষণ তুমি পরিপূর্ণ প্রকাশ হইলেও আমার কাছে দেখা দিবে না। সূর্য তো আপন আলোকে আপনি প্রকাশিত হইয়াই আছেন, এখন আমারই কেবল চোখ খুলিবার, জাগ্রত হইবার অপেক্ষা। যখন আমাদের চোখ খুলিবার ইচ্ছা হয়, আমরা চোখ খুলি, তখন সূর্য আমাদিগকে নূতন করিয়া কিছু দেন না, তিনি যে আপনাকে আপনি দান করিয়া রাখিয়াছেন, ইহাই আমরা মূহূর্তের মধ্যে বুঝিতে পারি।

অতএব দেখা যাইতেছে--আমরা যে কী চাই, তাহা যথার্থভাবে জানিতে পারাই প্রার্থনার আরম্ভ। যখন তাহা জানিতে পারিলাম, তখন সিদ্ধির আর বড়ো বিলম্ব থাকে না, তখন দূরে যাইবার প্রয়োজন হয় না। তখন বুঝিতে পারা যায়, সমস্ত মানবের নিত্য আকাঙক্ষা আমার মধ্যে জাগ্রত হইয়াছে--এই সুমহৎ-আকাঙক্ষাই আপনার মধ্যে আপনার সফলতা অতি সুন্দরভাবে, অতি সহজভাবে বহন করিয়া আনে।


আমাদের ছোটো বড়ো সকল ইচ্ছাকেই মানবের এই বড়ো ইচ্ছা, এই মর্মগত প্রার্থনা দিয়া যাচাই করিয়া লইতে হইবে। নিশ্চয় বুঝিতে হইবে, আমাদের যে-কোনো ইচ্ছা এই সত্য-আলোক-অমৃতের ইচ্ছাকে অতিক্রম করে, তাহাই আমাদিগকে খর্ব করে, তাহাই কেবল আমাকে নহে, সমস্ত মানবকে পশ্চাতের দিকে টানিতে থাকে।


এ-যে কেবল আমাদের খাওয়া-পরা, আমাদের ধনমান-অর্জন সম্বন্ধেই খাটে তাহা নহে-- আমাদের বড়ো বড়ো চেষ্টাসম্বন্ধে আরও বেশি করিয়াই খাটে।

          (সংগৃহিত)

   <--আদ্যনাথ রায় চৌধুরী-->


=========================


प्रार्थना::--


प्रार्थना की शुरुआत यह जानना है कि हम वास्तव में क्या चाहते हैं।


हमें लगता है कि

मैं दुनिया में और कुछ जानता हूं या नहीं, मैं समझता हूं कि मेरा इच्छा हमारे लिए सबसे उज्ज्वल,स्वच्छ,स्पस्ट है।

मैं समझता हूं कि मुझे सबसे ज्यादा क्या चाहिए, यह मेरे लिए स्पष्ट है लेकिन यह एक भ्रम है। मेरी सच्ची इच्छा मेरे लिए अदृश्य है।

===========================


       মহামৃত্যুঞ্জয় মন্ত্র,

   সর্বরোগ হরণকারী মন্ত্র। 

এই মন্ত্রটি ভগবান মহাদেবকে স্মরণ করে রচিত। 

 মন্ত্রটি ঋগ্বেদেও দৃষ্ট হয় - আবার এই মন্ত্রটি মার্কণ্ডেয় পুরাণেও দৃষ্ট হয়। এই মন্ত্রটি জপ করলে মানুষ সব অশান্তি , রোগপীড়া , ব‍্যাধি থেকে মুক্তিপ্রাপ্ত হয়। নিরাকার মহাদেবই মৃত‍্যুমুখী প্রাণকে বলপূর্বক জীবদেহে পুণঃ প্রতিষ্ঠিত করেন এবং অপার শান্তিদান করেন। এই মন্ত্রটির সাথে একটি কাহিণী প্রচলিত আছে। সেটি হল - মহর্ষি মৃকন্ডু এবং তাঁর পত্নী মরুদবতী পুত্রহীণ ছিলেন। তারা তপস‍্যা করেন মহাদেবকে সন্তুষ্ট করেন এবং এক পুত্র লাভ করেন , যার নাম হল মার্কন্ডেয়। কিন্তু মার্কন্ডেয়র বাল‍্যকালেই মৃত‍্যুযোগ ছিল। অভিজ্ঞ ঋষিদের কথায় বালক মার্কন্ডেয় শিব লিঙ্গের সামনে মহামৃত‍্যুঞ্জয় মন্ত্র জপ করতে লাগলেন। যথা সময়ে যম রাজ এলেন। কিন্তু মহাদেবের শরণে আসা প্রাণকে কেইবা হরণ করতে পারে ! যমরাজ পরাজিত হয়ে ফিরে গেলেন এবং মার্কন্ডেয় মহাদেবের বরে দীর্ঘায়ু লাভ করলেন। পরে তিনি মার্কন্ডেয় পুরাণ রচনা করলেন।


মার্কন্ডেয় ঋষি মহাদেবের স্তুতি করলেন মহামৃত‍্যুঞ্জয় স্তোত্রের মাধ‍্যমে যেটি মার্কন্ডেয় পুরাণে পাওয়া যায়।



ওঁ ত্র্যম্বকম যজামহে সুগন্ধিম পুষ্টিবর্ধনম্।

উর্বারুকমিব বন্ধনান্ মৃত্যৌর্মুক্ষীয় মামৃতাত্।।

================================


      || প্রার্থনা ||

  "অসৎ হইতে মোরে 

                        সৎ পথে নাও,

   জ্ঞানের আলোক জ্বেলে 

                        আঁধার ঘুচাও।

   মরণের ভয় যাক

                          অমর করো,

   দেখা দিয়ে ভগবান

                         শঙ্কা হর।

   করুণা আশিস ঢালো

                         রুদ্র, শিরে,

    চিরদিন থাকো মোর

                           জীবন ঘিরে।

    ঝরিয়া পড়ুক শান্তি

                            চরাচর ময়,

     চিরশান্তি-পরিমলে

                             ভরুক হৃদয়।


        বেদ (অনুবাদ)

স্বামী বিশ্বাশ্রয়ানন্দের লিখিত ,

উদ্বোধন কার্যালয়, রামকৃষ্ণ মঠ, কর্তৃক প্রকাশিত।

   "শিশুদের বিবেকানন্দ"  

     হইতে  সংগৃহীত ।।

=========================

     || যুগবানী ||

  গরিব মূর্খ জনে

           দেবতা বলিয়া মেনো,

  তাদের সেবাই

            পরম ধর্ম জেনো।

  বলো দিনরাত, "মা,

            আমায় মানুষ করো।

  দুর্বলতা 

  কাপুরুষতা 

             নিঃশেষে দূর করো"

  কিছুতে পেয়ো না ভয়

  তোমার ভিতরে

               অসীম শকতি,

  তুমি আনন্দময়।

       ----স্বামী বিবেকানন্দ

                 (ছন্দোবদ্ধ )


স্বামী বিশ্বাশ্রয়ানন্দের লিখিত ,

উদ্বোধন কার্যালয়, রামকৃষ্ণ মঠ, কর্তৃক প্রকাশিত।

   "শিশুদের বিবেকানন্দ"  

     হইতে সংগ্রহীত ।

==========================

     





Tuesday, March 21, 2023

14>|| মহাসাধক রাম ঠাকুর ||

       

     14>|| মহাসাধক রাম ঠাকুর ||


গ্রামের আর পাঁচটা ছেলেদের মতোই সারাদিন খেলাধুলো করে বড়ো হচ্ছিল রাম ও তার যমজ ভাই লক্ষ্মণ। কিন্তু কমলাদেবীর মনে শান্তি নেই। কয়েক বছর আগেই স্বামী রাধামাধব চক্রবর্তী ইহলোক ত্যাগ করেছেন। এখন কমলা দেবীর একমাত্র চিন্তা রামকে নিয়ে। অন্য ছেলেদের মতো হেসে খেলে বড় হলেও সে যেন একটু হলেও অন্য রকম। সন্ধে হলেই রাম একতাল কাদা নিয়ে ঠাকুর তৈরি করতে শুরু করে। তার পর সেই ঠাকুরকে পুজো করে ডুবে যায় কীর্তন গানের সুরের মায়ায়। তখন সে যেন এক ভক্ত সন্ন্যাসী, এক পাগল বাউল।

রামের বাবা রাধামাধব চক্রবর্তী ছিলেন একজন প্রখ্যাত তন্ত্রসাধক। তাঁর কঠিন সাধনার গল্প সেই সময়ে গ্রামে গঞ্জে ছড়িয়ে পড়েছিল। এমন একজন সাধকের সংসারে আধ্যাত্মিক পরিবেশ স্বাভাবিক হলেও মায়ের মন মানতে চায় না। ছেলের মধ্যে সন্ন্যাসী হওয়ার সব লক্ষণ স্পষ্ট হয়ে উঠতেই কমলাদেবী বিচলিত হয়ে ওঠেন। তাঁর রামের বয়স তো মাত্র আট বছর... এইটুকু বয়সেই কি রাম সংসার ছেড়ে চলে যাবে! 

অজানা আশঙ্কায় মায়ের বুক কেঁপে ওঠে। শক্তিসাধনায় দীক্ষিত গৃহী সন্ন্যাসী রাধামাধব চক্রবর্তীর সঙ্গে সংসার করে কমলাদেবী বুঝেছেন, যে মানুষের মনের মধ্যে একবার ঈশ্বরচেতনার বীজ পোঁতা হয়ে গেছে সেই মানুষের কাছে সমাজ, সংসার সব কিছুই তুচ্ছ হয়ে যায়। তাই ঈশ্বরসাধনায় ছেলেকে বাধা না দিলেও কমলাদেবী রামকে নজরে রাখার চেষ্টা করেন।


এর মধ্যেই একদিন তাদের বাড়িতে রাধামাধবের দূর সম্পর্কের এক বোন এলেন। কিছুদিন থাকার পর তিনি কমলাদেবীকে বললেন যে তিনি রামকে সঙ্গে নিয়ে তীর্থে যাবেন। রাম তো একপায়ে খাড়া। কমলাদেবীর অনিচ্ছা এখানে খাটলো না। রামের পিসি তাঁর মাকে বুঝিয়ে রামকে নিয়ে চন্দ্রনাথের পথে বেরিয়ে পড়লেন।


সে সময়ে মহাতীর্থ চন্দ্রনাথের পথ বেশ দুর্গম ছিল। 

চার দিকে ঘন জঙ্গলে ঘেরা পাহাড়ি পিচ্ছিল পথ। বন্য জন্তুজানোয়ার ছাড়াও এই পথে চোর ডাকাতের ভয়ও আছে। রামের বয়স তখন মাত্র দশ বছর। এইটুকু ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে বয়স্ক পিসি অনেক কষ্টে একটা পাহাড়ের মাথায় পৌঁছে চন্দ্রনাথ মন্দিরের চূড়া দেখতে পেলেন। আনন্দে আত্মহারা হয়ে পিসি একটা পাথরের উপর বসে তার পূজা উপাচারের পুঁটলিটা খুলে সব কিছু মিলিয়ে নিতে গিয়েই চমকে উঠলেন, এ বাবা... বেলপাতা আনতেই তো ভুলে গিয়েছেন। এখন উপায়! চন্দ্রনাথ মহাদেবের পুজো বেলপাতা ছাড়া হবে কী করে? এত কষ্ট করে এত দূর এসে তিনি কি চন্দ্রনাথের পুজো না করেই ফিরে যাবেন? না, না, সে কী করে সম্ভব! দরকার হলে তিনি চন্দ্রনাথের পায়ে নিজের জীবন সঁপে দেবেন, তবুও তাঁকে পুজো না করে তিনি বাড়ি ফিরবেন না। কিন্তু বেলপাতা! 

এই ঘন জঙ্গলে কে তাকে বেলপাতা জোগাড় করে দেবে?


বেশ হতাশ হয়ে পড়লেন পিসি। ছোট্ট বালক রাম তখন পাহাড়ের উপর দাঁড়িয়ে দূরে চন্দ্রনাথ মন্দিরটা দেখছিল। পিসিকে দেখে সে বুঝল, নিশ্চয়ই কোনও সমস্যা হয়েছে। পিসি তাঁকে কাছে ডেকে বললেন, ‘বাবা রাম, যে ভাবেই হোক, তুই আমাকে দুটো বেলপাতা জোগাড় করে দে, না হলে আমার এত কষ্ট সব বিফলে যাবে’।

রাম তো অবাক, সে বলল, ‘তুমি কি পাগল হয়ে গেলে পিসি? এই পাহাড়ি জঙ্গলে আমি কোথায় বেলপাতা পাব?’

পিসির চোখে জল, তিনি বললেন, ‘কোথায় পাবি জানি না... কিন্তু কমলা আমাকে বলেছে ঈশ্বর নাকি তোর ডাক শুনতে পায়। 

তুই যদি আমাকে বেলপাতা জোগাড় করে না দিস তাহলে আজ এক্ষুনি আমি আত্মহত্যা করব’। পিসি হাউ হাউ করে কাঁদতে লাগলো।

পিসির চোখে জল দেখে ছোট্ট রামের মন ভিজে গেল। সে ঈশ্বরের নাম নিয়ে চোখ বুজে ধ্যানে বসল। 

কিছুক্ষণ পর চোখ খুলে সে পিসিকে বলল, ‘পিসি, ওই যে ছোট্ট পাথরটা দেখছ, ওটা তুলে ফেললেই তুমি বেলপাতা পাবে’। 


পিসি দৌড়ে গিয়ে পাথরটা তুলেই বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেলেন। তিনি দেখলেন সেই পাথরের নীচ থেকে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে উঠল একটা ছোট্ট বেলগাছ যার কচি ডালে রয়েছে বেশ কয়েকটা বেল পাতা। পিসি অবাক হয়ে তার সামনে বসে থাকা জীবন্ত চন্দ্রনাথকে দেখতে লাগলেন, যে জীবন্ত চন্দ্রনাথ ওরফে রামই পরবর্তীকালে হয়ে ওঠেন ভক্তদের প্রাণের দেবতা, মহাসাধক রাম ঠাকুর।


সংসারে একেবারেই মন বসে না ছেলেটার। সব সময়ই চারপাশের মোহ-বন্ধনকে ছিঁড়ে ফেলে অজানার সন্ধানে বেরিয়ে পড়তে ইচ্ছে করে, কিন্তু মায়ের অসহায় মুখ দেখে ছেলেটা আটকে পড়ে। জন্ম-জন্মান্তরের এক মায়াবন্ধন ঘর ছেড়ে বেরোতে দেয় না তাঁকে।

তন্ত্রসাধক রাধামাধব চক্রবর্তীর মৃত্যুর পর তাঁর দুই যমজ ছেলে রাম ও লক্ষ্মণের ওপরই সংসারের দায়ভার পড়ার কথা। লক্ষ্মণ এদিক-ওদিক কাজের চেষ্টা করলেও রামের কাজকর্মে একেবারেই মন নেই। সারাক্ষণই আপনমনে সে কী যেন ভেবে চলে। ভগবানের নাম সংকীর্তন আর মাটির ঠাকুর তৈরি করে পুজো করেই সারাটা দিন কাটে তার। পুজোর সময় ঠাকুরের সঙ্গে আপন মনে কথা বলে চলে রাম। 

আড়াল থেকে মা ছেলেকে দেখে চোখের জল আটকাতে পারে না।

ছেলেদের ওপর দায় না চাপিয়ে মা কমলাদেবী নিজের মতো করে সংসারের তীব্র অর্থাভাব সামলানোর চেষ্টা করেন, কাউকে কিছু বুঝতে দেন না। রাম কিন্তু বুঝতে পারে যে, এ ভাবে হাত গুটিয়ে বসে থাকলে চলবে না, তাকে কিছু একটা করতেই হবে। 

যেভাবেই হোক তাঁর মায়ের মুখে হাসি ফোটাতেই হবে কিন্তু কী কাজ করবে বা কী কাজ সে পারে, সেটাই তাঁর জানা ছিল না।


তবু, কালবিলম্ব না করে কাজের সন্ধানে বেরিয়ে পড়ল রাম। নানা জায়গায় কাজের খোঁজ করলেও কে তাঁকে কাজ দেবে? উদ্দেশ্যহীন ভাবে ঘুরতে ঘুরতে রাম নোয়াখালির ফেনি শহরে পৌঁছল। সেখানে পথের মধ্যে এক উকিলের সঙ্গে তার আলাপ হলো। রামের সব কথা শুনে এবং তার ব্যবহারে সন্তুষ্ট হয়ে সেই উকিল তাকে বললেন, ‘যতদিন না অন্য কোন কাজ পাচ্ছো ততদিন আমার বাড়িতে থেকে আমাদের রান্না করতে হবে... পারবে?’ রাম কিছু না ভেবেই রাজি হয়ে গেল।


শুরু হলো রামের অন্যরকম এক জীবন। সারাদিন ধরে রান্নাঘরে চাল, ডাল, আলু, পিঁয়াজ ইত্যাদির সঙ্গে থেকে থেকে বেশ মানিয়ে নিয়েছিল রাম। সারাক্ষণ বাড়ির লোকেদের খাবারের তৈরি করার কাজে ব্যস্ত থাকলেও তার ঈশ্বরভক্তিতে একটুও ছেদ পড়ত না। সব কাজ সেরে সন্ধ্যাবেলায় সে তার আরাধ্য দেবতাকে পুজো করতে বসতো। পুজোর মধ্যেই ঠাকুরের সঙ্গে কথা বলা নিয়ে এই নিয়ে বাড়ির অন্যান্য কর্মচারীরা তাকে বিদ্রূপ করত, তাকে নিয়ে চলত হাসিঠাট্টা, মশকরা। যদিও রাম সেসব গায়েই মাখত না।


এভাবেই বেশ চলছিল। একদিন বাড়ির কর্তা ঠিক করলেন কালীপুজো করবেন। কিছুদিন আগে তাঁর একমাত্র ছেলে মরণাপন্ন হওয়ায় তিনি মা কালীর কাছে ছেলের প্রাণভিক্ষা করেছিলেন। তাঁর ছেলে এখন সুস্থ, তাই তিনি মানতের পুজো করছেন।

পুজোর দিন সকাল থেকে বাড়িতে সাজো সাজো রব কিন্তু সমস্যা হলো পুরোহিতকে নিয়ে। একেবারে শেষ মুহূর্তে জানা গেল, হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়ার জন্য পুরোহিত আসতে পারবেন না। দোর্দন্ডপ্রতাপ উকিলবাবু মাথায় হাত দিয়ে বসলেন, এখন কী হবে? সব আয়োজন যে সম্পূর্ণ। বাড়ির কয়েকজন কর্মচারী তাকে এসে বললো যে, বাড়িতেই তো পুরোহিত রয়েছে। এই অবস্থায় রামকে দিয়েই তো কাজ চালানো যেতে পারে। উকিলবাবুর কথাটা পছন্দ হলো।


এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিরা সেদিন পুজোয় নিমন্ত্রিত। তাদের সামনেই বাড়ির রাঁধুনি রাম পরম নিষ্ঠাভরে মায়ের আরাধনা করল। আমন্ত্রিতদের কাছে রামের কালীপুজো প্রশংসা কুড়োলেও বাড়ির অন্যান্য কর্মচারীরা কিন্তু তাকে ছাড়ল না, পুজোর মধ্যেই মা কালীর সঙ্গে কথোপকথন নিয়ে তারা রামকে বিদ্রূপ করতে শুরু করলো। রাম নানা ভাবে তাদের এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলেও সারাক্ষণ তাকে নিয়ে হাসিঠাট্টা চলতে লাগল। ওরা বার বার রামকে জিজ্ঞাসা করতে লাগলো, ‘কি গো রাম, মা তোমাকে কি বললো? দু’জনে কী কথা হলো? ও ঠাকুর, বলো না... আমাদের খুব জানতে ইচ্ছা করছে।’ 

অনেক সহ্য করার পর রাম আর থাকতে পারল না। প্রচন্ড রেগে গিয়ে বললো, ‘মা কী বলেছে তোমরা সত্যিই শুনতে চাও? তাহলে শোনো... মা বলেছে, বাবুর যে ছেলের জন্য মানত পুজো হলো, মা খুব শিগগিরই তাকে খেয়ে নেবে।’ 

রামের কথা শুনে উপস্থিত সবাই চমকে উঠল। তাদের কেউ কেউ রামকে তেড়ে মারতেও এল। মানসিকভাবে আহত, অপমানিত রাম কাউকে কিছু না বলে নিজের ঘরে গিয়ে শুয়ে পড়ল।

পরের দিন দুপুরে হঠাৎ সকলে দেখল উকিলবাবুর ছেলেকে সবাই ধরাধরি করে নিয়ে আসছে। ছেলেটি অন্যদিনের মতো স্কুলে গিয়েছিল। ডাক্তার এসে জানাল ছেলেটি মারাত্মক এক ধরনের কলেরায় আক্রান্ত হয়েছে। সেদিন রাতেই ছেলেটি এই পৃথিবীর মায়া কাটিয়ে চলে গেল।

ছেলেটির মৃত্যুতে কোনরকম দায় না থাকলেও সেই রাতে উকিল বাবুর রাঁধুনিও কাউকে কিছু না জানিয়ে নিরুদ্দেশ হয়ে গেল। 

যে রাঁধুনিই পরবর্তী কালে হয়ে উঠেছিলেন হাজার হাজার মানুষের ভরসা, শ্রদ্ধার ঠাকুর, প্রাণের ঠাকুর রাম ঠাকুর।


একবার রাম ঠাকুরের সঙ্গে সাক্ষাৎ করার জন্য কৈবল্যধামের মহন্ত মহারাজ শ্রী শ্যামাচরণ চট্টোপাধ্যায় কাশীধামে এসেছেন। কিন্তু ঠাকুর থাকেন কোথায়? কোথায় গেলে তাঁর চরণ স্পর্শ করে ধন্য হওয়া যাবে? ... ঠাকুরের সন্ধানে শ্যামাচরণ চট্টোপাধ্যায় কাশীর পথে পথে ঘুরছেন, কিন্তু সেখানকার সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে সাধক, সন্ন্যাসী, পূজারী— কেউই তাঁর প্রশ্নের কোনও সদুত্তর দিতে পারল না।

এমনটা যে হতে পারে, সেটা মহন্ত কল্পনাতেও ভাবেননি। দেশের আপামর সাধারণ মানুষ, তাবড় পণ্ডিত এবং নামজাদা সাধকরা যে মানুষটাকে নিয়ে উচ্ছ্বসিত, দেশের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষজন যাঁকে ঈশ্বরের অবতার ধরে নিয়েছে, সেই মানুষটা কোথায় থাকে, কেউ জানে না!


অনেক ঘোরাঘুরি করেও যখন ঠাকুরের ঠিকানা পাওয়া গেল না, তখন মহন্ত ঠিক করলেন তিনি বাড়ি ফিরে যাবেন। এ সময় হঠাৎই স্থানীয় এক পরিচিত ভদ্রলোক মহন্তকে বললেন যে, তিনি ঠাকুরের সন্ধান জানেন কিন্তু তিনি দেখা করবেন কি না, সেটা বলা শক্ত। 

চূড়ান্ত হতাশ হয়ে যাওয়া মহন্তর কাছে এটাই অনেক বড়ো পাওয়া। কাল-বিলম্ব না করে ঠাকুর দর্শনের আশায় মহন্ত সেই ভদ্রলোকের সঙ্গে বেরিয়ে পড়লেন।


কাশীর জনবহুল এলাকা থেকে বেশ কিছুটা দূরে চারদিকে বাঁশের বেড়া দিয়ে ঘেরা একটা ছোট্ট ঘর। ভদ্রলোক মহন্তকে বললেন, ওই ঘরের মধ্যেই ঠাকুর আছেন। মহন্তর মনের মধ্যে তখন আনন্দের ঢেউ... মনে মনে ভাবছেন, যাক এতদূর থেকে এসে তাঁকে নিরাশ হয়ে ফিরে যেতে হবে না। বেড়ার দরজা ঠেলে পায়ে পায়ে সেই ছোট্ট ঘরের দরজার সামনে এসে দাঁড়ালেন শ্যামাচরণ। এর পর তিনি যা দেখলেন, তাতে মুহূর্তের মধ্যে তাঁর বাকশক্তি রহিত হয়ে গেল। দরজার সামনে নিশ্চল পাথরের মতো দাঁড়িয়ে রইলেন কৈবল্যধামের স্বনামধন্য মহন্ত শ্যামাচরণ চট্টোপাধ্যায়।


ঘরের মধ্যে ঠাকুর তখন ধ্যানমগ্ন। এক বিশালাকার সাপ সেই ধ্যানমগ্ন ঈশ্বরকে পেঁচিয়ে মাথার ওপর প্রকাণ্ড ফণা তুলে দাঁড়িয়ে রয়েছে। 

মহন্ত কী বলবেন, বুঝে উঠতে না পেরে পায়ে পায়ে পিছিয়ে এলেন। সেই মুহূর্তেই ঠাকুরের চোখ খুলে গেল, তিনি যেন চোখ বন্ধ করেই মহন্তকে দেখছিলেন। ঠাকুর বললেন, ‘আপনার এখানে কী চাই? এক্ষুনি এখান থেকে চলে যান’। শ্যামাচরণ চমকে উঠে বললেন, ‘আপনাকে একবার দর্শন করার আশায় অনেক দূর থেকে আমি এখানে এসেছি ঠাকুর, কিন্তু আপনার দেহে ওই বিরাট সাপ দেখে আপনার কাছে যেতে পারিনি’।


মৃদু হেসে ঠাকুর বললেন, ‘ও আমার শুশ্রূষা করার জন্য এসেছে, আজ সকাল থেকে আমার শরীরটা ভালো নয়, জ্বর এসেছে। আমার জ্বর কমে গেলেই ও চলে যাবে’। 

শ্যামাচরণ আর একটা শব্দ উচ্চারণ না করে, দরজা থেকেই ঠাকুরকে প্রণাম করে ফিরে গেলেন।


এ দেশের আধ্যাত্মিক জগতের বিস্ময়পুরুষ যোগীরাজ রামঠাকুর এ ভাবেই পৃথিবীর সব প্রাণীকে আপন করে নিতে পারতেন। 

তাঁর কাছে সব জীবই হল ভগবানের সন্তান। তাই সকলের সঙ্গেই ছিল তাঁর আত্মিক যোগাযোগ। 

মানুষের মধ্যেও তিনি কোনও ভেদ করতেন না, জাতপাতের সংকীর্ণ ভেদাভেদকে তিনি ঘৃণা করতেন, তাই আশ্রমের উৎসব অনুষ্ঠানে সব ধর্মের মানুষরাই স্বতস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করতে পারতেন।


সে বার তিনি ভক্ত-শিষ্যসহ তাঁর জন্মভূমি ডিঙামানিক গ্রামে এসেছেন। গ্রামের সাধারণ মানুষের ভিড়ে আশ্রম তখন জমজমাট। তাঁকে ঘিরে শুরু হয়েছে আনন্দ-সংকীর্তন। ঠাকুর দর্শনের আশায় দূর দূর থেকে মানুষ দলে দলে আসছেন। সেই দলে পাশের গাঁয়ের এক মুসলমান চেরাগ আলিও এসেছে, কিন্তু নাম সংকীর্তনের ভিড়ের মধ্যে না ঢুকে দূরে একটা পুকুর পাড়ে বসে মনে মনে ঠাকুরের নাম নিচ্ছে। 

ঠাকুর তখন নাম সংকীর্তনের সুরের মধ্যে ডুবে আছেন, তাঁকে ঘিরে চারপাশে অজস্র ভক্তের ভিড়। হঠাৎ সবাইকে চমকে দিয়ে ঠাকুর চুপ করে গেলেন, তার পর চারপাশের ভক্তদের বললেন, ‘দূরে... ওই পুকুর পাড়ে চেরাগ আলি নামে আমার এক ভক্ত একা বসে আছে, ওকে এক্ষুনি এখানে নিয়ে এসো’। 

ভক্তরা ছুটে গিয়ে চেরাগকে নিয়ে এল। সবাইকে অবাক করে ঠাকুর চেরাগকে বুকে জড়িয়ে ধরে বললেন, ‘আপনি আমার সঙ্গে দেখা করতে এসে আমার থেকে দূরে রয়েছেন কেন? আপনি তো আমার জন্মজন্মান্তরের আত্মীয়’।

চেরাগ আলির চোখ দিয়ে তখন ঝরঝর করে আনন্দাশ্রু ঝরে পড়ছে... আর প্রেমের ঠাকুর যোগীরাজ রামঠাকুরের গলায় তখন বিশ্বপ্রেমের সুর... যে সুরের খেয়ায় ভেসে গিয়েছে পৃথিবীর সকল জীব...... মানুষ, পশু, পাখি, কীট, পতঙ্গ... যারা সকলেই ভগবানের সন্তান।

        (সংগ্রহীত )

    ভারতের সাধক ও সাধিকা

============================