Thursday, February 17, 2022

13>|| রাখাল মহারাজের জীবনের একটি ঘটনা

 13>||রাখাল মহারাজের জীবনের একটি ঘটনা 


'মেছো সাধু'


তখনকার প্রধান ফটক (ঠাকুরের মন্দিরের দক্ষিনদিকের যে গেট, এখনকার পল্লীমঙ্গল শোরুমের সামনে) পেরিয়ে মঠে ঢোকার সময়ে বাঁদিকে একটা ডোবার মতো ছিল। শীতকাল বলে ছাতার ব্যবস্থা করতে হয়নি। রাজা মহারাজ যেন রোদ পোয়াচ্ছেন আর মাছ ধরছেন। কচ্চিত দু-একবার ফাতনা নড়ছে। মহারাজের একদৃষ্টে ফাতনার দিকে চেয়ে বসে আছেন। ঐ সময়ে এক ভদ্রলোকও ঐ গেট দিয়ে ঢুকে মঠের দিকে যাওয়ার সময় দেখলেন, এক সাধু গামছা মাথায় দিয়ে রোদ-পিঠো হয়ে বসে ছিপহাতে মাছ ধরছেন। সেই ভদ্রলোকও মঠের প্রাঙ্গনে এসে বাবুরাম মহারাজকে জিজ্ঞাসা করলেন - " এখানকার অধ্যক্ষ কে আছেন?"


বাবুরাম মহারাজ বললেন "কেন?" 

তিনি বললেন, " আমি মেদিনীপুরের ডি.এম. দু-চার দিনের জন্য কলকাতায় এসেছি কাজে। আমার খুব ইচ্ছা, এখানকার অধ্যক্ষের কাছে দীক্ষা নিই।" বাবুরাম মহারাজ সব শুনে বললেন - বেশ তো বসুন, প্রসাদ নিন, একটু পরেই তাঁর সঙ্গে দেখা হবে।" ভদ্রলোক প্রসাদ নিয়ে জিজ্ঞাসা করলেনঃ " আচ্ছা ঐ পুকুরে এক সাধু গামছা মাথায় দিয়ে বসে মাছ ধরছেন, উনি কে?"


বাবুরাম মহারাজ সসঙ্কোচে জানালেন, উনি-ই মঠের অধ্যক্ষ স্বামী ব্রহ্মানন্দ মহারাজ। এই কথা শুনেই ভদ্রলোকও তড়াক করে উঠে দাঁড়িয়ে বলে উঠলেনঃ "মশাই, মেছো সাধুর কাছে দীক্ষা নিতে পারব না।" বলেই হনহন করে চলে গেলেন। যাওয়ার সময়, আমরা লক্ষ করলাম, মহারাজ যেখানে বসেছিলেন সেদিকে তাকালেন না পর্যন্ত। বাবুরাম মহারাজকে খুবই বিমর্ষ দেখাচ্ছিল। মহারাজ যখন ফিরলেন, বাবুরাম মহারাজ তাঁর কাছে অনুযোগও করলেন একটু। মহারাজ হাসতে হাসতে ওপরে ওঠার সময় বললেনঃ "বাবুরাম দা তাঁর কৃপায় কত ডী.এম. আসবে যাবে। এখন আর কি হয়েছে!"


দু’দিন পরেই ঐ ভদ্রলোক আবার এলেন। এবার তাঁর কথাবার্তা ও চালচলন যেন বদলে গেছে। সবিনয়ে বাবুরাম মহারাজকে অনুরোধ করলেন তাঁকে একটিবার '  ব্রহ্মানন্দ স্বামীর ' দর্শন করিয়ে দিতে। বাবুরাম মহারাজ বিষ্মিত হয়ে বললেনঃ "সে কি মশাই? সেদিন উনি ছিপ ফেলছেন দেখে 'মেছো সাধু' বলে চলে গেলেন, আজ আবার দর্শন করতে চাইছেন?" ভদ্রলোকও প্রায় কাঁদকাঁদ গলায় যা বললেন তার অর্থ হলো ঃ দু'দিন ঘুমোতে পারছেন না। তন্দ্রা এলেই ঠাকুরের মুখচ্ছবি ভেসে উঠছে। ঠাকুর বলেছেন, "ওরে ওর আরো একটা রুপ আছে দেখে আয়।" !!!


এই কথা শুনে বাবুরাম মহারাজ তাঁকে নিয়ে ওপরে গেলেন। মহারাজ তখন মঠবাড়ির ওপরের বারান্দায় ইজিচেয়ারে বসে গঙ্গার দিকে তাকিয়ে, স্থির নেত্র। ভদ্রলোক অনেকক্ষন নিশ্চল হয়ে ঐ চিত্র দেখলেন। তারপর হাউহাউ করে কেঁদে মহারাজের পায়ের কাছে পরে ক্ষমাভিক্ষা করতে লাগলেন। পরে তিনি মহারাজের কাছে কৃপালাভ করেছিলেন। দীক্ষার দিন দক্ষিনা হিসাবে অন্যান্য জিনিসের সঙ্গে ছিপ, হুইল, ডোর, বঁড়শি, সব দিয়েছিলেন। সেগুলি এখনো মহারাজের মন্দিরের ওপরে আলমারিতে রাখা আছে।


ওঁদের সবটাতেই ছিল বালকস্বভাব। যেন সবটাই খেলা। ছিপ ফেলা ও সমাধি - দুটোর মধ্যে কোন পার্থক্য ছিল না ওঁদের জীবনে। 

" স্থিতপ্রজ্ঞস্য কা ভাসা"!


জয় ঠাকুর, জয় মা, জয় স্বামীজী, জয় রাজা মহারাজ !!!

         (  সংকলিত  )

<---আদ্যনাথ রায় চৌধুরী-->

==========================