Saturday, April 18, 2026

42>|| নরেন্দ্রনাথ ও ষড়যন্ত্র ||

     42>|| নরেন্দ্রনাথ ও ষড়যন্ত্র ||

প্রথম জীবনেই ষড়যন্ত্রের শিকার

হয়েছিলেন নরেন্দ্রনাথ/বিবেকানন্দ! 


বিদ্যাসাগর কেন কেড়ে নিয়েছিলেন নরেন্দ্রনাথের মুখের গ্রাস?

ইতিহাসের সাক্ষী দুই বিশিষ্ট মহা মানব

ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর এবং স্বামী বিবেকানন্দ।

এহেন দুই মহামানবের সাক্ষাৎ ও এক অঘটন। 

একজন বাংলার নবজাগরণের কান্ডারি— ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর। 

অন্যজন ভবিষ্যতের বিশ্বগুরু— স্বামী বিবেকানন্দ। 


কিন্তু আমরা হয়তো অনেকেই জানিনা, এই বিদ্যাসাগর মশাইয়ের একটি ভুলেই একদিন চরম অপমানের শিকার হয়ে চাকরি হারাতে হয়েছিল স্বয়ং নরেন্দ্রনাথ কে। আর এভাবেই নরেন্দ্রনাথ এক জঘন্য ষড়যন্ত্রের শিকার হয়েছিলেন।


কী ঘটেছিল সেই দিন ? 

আজ আমরা সেদিনের সত্যতা জানবো

রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশন থেকে প্রকাশিত বই থেকে।

সালটা ১৮৮৪, ২৫শে ফেব্রুয়ারি। হঠাৎ হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গেলেন নরেন্দ্রনাথের বাবা, বিখ্যাত অ্যাটর্নি বিশ্বনাথ দত্ত। কলকাতার অভিজাত দত্ত পরিবারে যেন বিনা মেঘে বজ্রপাত হলো। যে ছেলেটি কাল পর্যন্ত রাজপুত্রের মতো থেকেছে, যার বাড়িতে রোজ উৎসব লেগেই থাকত, সে আজ রাতারাতি ভিখারি, দিশেহারা,আত্মীয়রা সম্পত্তি দখল করার জন্য মামলা ঠুকে দিল। বাড়িতে মা আর ছোট ছোট ভাই-বোনদের মুখে একবেলা অন্ন তুলে দেওয়ার সামর্থ্য নেই যুবক নরেনের।

চাকরির আশায় কলকাতার রাস্তায় রাস্তায় হন্যে হয়ে ঘুরছেন তিনি। জুতো ছিঁড়ে গেছে, পরনের জামা মলিন। দিনের পর দিন নিজে না খেয়ে মাকে গিয়ে হাসিমুখে বলতেন, "মা, আজ আমার এক বন্ধুর বাড়িতে নেমন্তন্ন আছে, তোমরা খেয়ে নাও।" এই নিদারুণ মিথ্যেটা তিনি বলতেন যাতে পরিবারের মানুষগুলোর পাতে অন্তত খাবারটা কম না পড়ে।

এমন সময় একদিন মাস্টার মহাশয়ের চেষ্টায়  এবং নরেন্দ্রনাথের মেধা, ইংরেজি জ্ঞান এবং পাণ্ডিত্যের খবর পৌঁছাল স্বয়ং ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের কানে। বিদ্যাসাগর মহাশয় তখন তাঁর প্রতিষ্ঠিত 'মেট্রোপলিটান ইনস্টিটিউশন'-এর (বর্তমান বিদ্যাসাগর কলেজ সংলগ্ন স্কুল) বউবাজার ব্রাঞ্চে শিক্ষকতার দায়িত্ব দিলেন যুবক নরেন্দ্রনাথকে (আনুমানিক ১৮৮৬ সাল)। মাস গেলে জুটবে ৫০-৬০ টাকা। নরেনের কাছে তখন এটাই বাঁচার একমাত্র সম্বল।

 নরেন তো আর পাঁচজন সাধারণ মাস্টারের মতো ছিলেন না। তিনি ক্লাসে গিয়ে কেবল গৎবাঁধা বই রিডিং পড়াতেন না। তিনি ছাত্রদের বন্ধু হয়ে উঠলেন। গান গেয়ে, গল্প বলে, পৃথিবীর ইতিহাস আর বিজ্ঞানের নানা অজানা তথ্য দিয়ে তিনি ছাত্রদের মন জয় করে নিলেন। ক্লাসে পিন পড়লে শব্দ শোনা যায়, ছাত্ররা মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনত তাঁর কথা। গোটা স্কুলে নরেন হয়ে উঠলেন ছাত্রদের চোখের মণি।

আর এই আকাশছোঁয়া জনপ্রিয়তাই তাঁর কাল হলো। 

বিদ্যাসাগর মহাশয়ের নিজের জামাই এবং ওই স্কুলের সর্বেসর্বা সেক্রেটারি। সূর্যকুমার ছিলেন অত্যন্ত কড়া, অহংকারী এবং ক্ষমতালোভী প্রশাসক। একজন ২৫-২৬ বছরের তরুণ মাস্টারের এত দাপট, এত জনপ্রিয়তা তাঁর ইগোতে মারাত্মক আঘাত করল। সূর্যকুমার মেনে নিতে পারলেন না যে স্কুলের ছাত্ররা সেক্রেটারির চেয়ে একজন সাধারণ শিক্ষককে বেশি সম্মান করছে। শুরু হলো এক জঘন্য, নীরব ষড়যন্ত্র।

সূর্যকুমার তক্কে তক্কে ছিলেন এবং তিনি গোপনে নরেনের বিরুদ্ধে মিথ্যে রিপোর্ট তৈরি করতে লাগলেন। নরেন যেহেতু শ্রীরামকৃষ্ণের কাছে যেতেন, তাই মাঝে মাঝেই তিনি ছুটিতে থাকতেন। এই সুযোগটাই নিলেন সূর্যকুমার। "নরেন স্কুলে ঠিকমতো আসে না, ক্লাসে পড়াশোনা না করিয়ে আড্ডা মারে, হিন্দুধর্মের আজেবাজে কথা বলে ছাত্রদের উশৃঙ্খল করছে"— এমন ডজন খানেক মিথ্যে অভিযোগ নিয়ে তিনি হাজির হলেন বিদ্যাসাগর মহাশয়ের কাছে।


বিদ্যাসাগর তখন বার্ধক্যে উপনীত, শরীরে বাসা বেঁধেছে নানা রোগ, মনও তিক্ত। তিনি আগের মতো স্কুলে গিয়ে নিজের চোখে সব তদারকি করতে পারতেন না। জামাই এবং সেক্রেটারি সূর্যকুমারের দেওয়া অফিশিয়াল রিপোর্টের ওপর তাঁর অন্ধ বিশ্বাস ছিল।


যে বিদ্যাসাগর যুক্তিবাদী ছিলেন, যিনি প্রমাণ ছাড়া কিছু বিশ্বাস করতেন না, সেদিন তিনিও এক চরম ভুল করে বসলেন। সূর্যকুমারের আনা মিথ্যে রিপোর্টের সত্যতা তিনি একবারও যাচাই করলেন না। নরেন্দ্রনাথকে ডেকে একবারও জিজ্ঞেস করলেন না, "নরেন, এসব কী শুনছি?"


কোনো শোকজ নোটিশ নয়, আত্মপক্ষ সমর্থনের কোনো সুযোগ নয়— সোজা বরখাস্ত! অসুস্থ বিদ্যাসাগর চরম বিরক্তি নিয়ে নির্দেশ দিলেন: "নরেনকে বলে দিও, কাল থেকে যেন আর স্কুলে না আসে!"


চরম অপমান! ঘাড় ধাক্কা খাওয়ার চেয়েও বড় অপমান। যে ছেলেটা পরিবারের মুখে এক মুঠো ভাত তুলে দেওয়ার জন্য আপ্রাণ লড়ছিল, তার মুখের গ্রাসটুকু কেড়ে নেওয়া হলো একজন ইগো-সর্বস্ব মানুষের মিথ্যে ষড়যন্ত্রের কারণে। নরেন সেদিন বিধ্বস্ত হয়ে পড়েছিলেন।

কিন্তু, ইতিহাস তো অন্য ছক কষে রেখেছিল! আজ ভাবলে গায়ে কাঁটা দেয়, সেদিন যদি সূর্যকুমারের ওই জঘন্য ষড়যন্ত্র না থাকত, বিদ্যাসাগর যদি সেদিন নরেনকে চাকরি থেকে না তাড়াতেন, তবে কী হতো? হয়তো সংসারের মায়াজালে, অভাবের তাড়নায় আটকে পড়তেন এক সাধারণ স্কুল মাস্টার।


চাকরি যাওয়ার সেই চরম আঘাতটাই নরেন্দ্রনাথকে বাধ্য করেছিল শ্রীরামকৃষ্ণের চরণে পুরোপুরি আত্মসমর্পণ করতে। এই ঘটনার কিছু সময় পরেই শ্রীরামকৃষ্ণের মহাসমাধি ঘটে এবং নরেন্দ্রনাথ সংসার ত্যাগ করে বরাহনগর মঠে সন্ন্যাসীর জীবন বেছে নেন। মেট্রোপলিটান স্কুলের সেই বিতাড়িত মাস্টারই একদিন শিকাগোর মঞ্চ কাঁপিয়ে হয়ে উঠেছিলেন গোটা বিশ্বের প্রণম্য— যুগনায়ক স্বামী বিবেকানন্দ।


সত্যি ভাবলে অবাক হতে হয় যে নিয়তির কি অদ্ভুত খেলা।

বিদ্যাসাগরের মতো একজন প্রজ্ঞাবান মানুষের কি উচিত ছিল না একবার নরেন্দ্রনাথকে ডেকে সত্যটা যাচাই করা?

           (সংকলিত) 

   <--আদ্যনাথ রায় চৌধুরী--->

========================

 

Tuesday, April 14, 2026

41>প্রতিশোধের চেয়ে ক্ষমা করা অনেক বেশি কঠিন এবং শক্তিশালী অস্ত্র।

 41>প্রতিশোধের চেয়ে ক্ষমা করা অনেক বেশি কঠিন এবং শক্তিশালী অস্ত্র।



শ্রী শ্রী মা সারদা দেবী তখন কোলকাতার উদ্বোধন বাড়িতে  থাকতেন। প্রতিদিন শত শত ভক্ত আসতেন মায়ের আশীর্বাদ নিতে। তাঁদের মধ্যে যেমন বিনয়ী মানুষ ছিলেন, তেমনি ছিলেন খ্যাপাটে বা জেদি স্বভাবের মানুষও।

​ 

​একদিন এক যুবক ভক্ত মায়ের কাছে এলেন। সেই যুবকটি ছিল প্রচণ্ড রাগী আর জেদি। কোনো একটি কারণে সে মায়ের ওপর খুব বিরক্ত হয়ে এসেছিল। সবার সামনেই সে মা সারদাকে অত্যন্ত কটু কথা বলতে শুরু করল এবং তর্কাযর্কি করতে লাগল। এমনকি রাগের মাথায় সে মায়ের সামনেই মেঝেতে সজোরে পদাঘাত করল।


​সেখানে উপস্থিত শ্রীরামকৃষ্ণের শিষ্যরা এবং অন্য ভক্তরা এই দৃশ্য দেখে স্তম্ভিত হয়ে গেলেন। তাঁরা সেই যুবককে থামানোর চেষ্টা করলেন এবং অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হলেন। কিন্তু মা সারদা? তিনি পাথরের মূর্তির মতো শান্ত হয়ে বসে রইলেন। তাঁর মুখে কোনো বিরক্তি বা রাগের চিহ্ন ছিল না।

​ 

​যুবকটি যখন হাঁপিয়ে গিয়ে চলে গেল, তখন অন্য ভক্তরা মাকে জিজ্ঞেস করলেন, "মা, আপনি কেন ওকে শাসন করলেন না? ও আপনার সামনে এত বড় অপরাধ করল, আর আপনি চুপ করে সহ্য করলেন?"

​মা তখন এক স্নিগ্ধ হাসি হেসে বললেন:

​"ওরে, ও তো আমারই সন্তান। ছেলে যদি না বুঝে মায়ের ওপর রাগ করে বা পায়ে আঘাত করে, মা কি তার ওপর পাল্টা রাগ করতে পারে? অবুঝ সন্তানকে তো মা-ই সহ্য করবে।"

​ 

​মায়ের এই অসীম ধৈর্য আর ক্ষমার কথা যখন সেই যুবকটির কানে পৌঁছাল, তখন তার ভুল ভাঙল। সে বুঝতে পারল, সে কাকে অপমান করেছে। কয়েকদিন পর সে দৌড়ে এসে মায়ের পায়ে লুটিয়ে পড়ল এবং অঝোরে কাঁদতে লাগল। মা পরম মমতায় তার মাথায় হাত রেখে বললেন, "কাঁদিস না বাবা, মানুষ তো ভুল করেই। শান্ত হ।"

​সেই এক মুহূর্তের ক্ষমায় যুবকটির জীবন চিরতরে বদলে গেল। সে হয়ে উঠল মায়ের একনিষ্ঠ সেবক।

​ 

​মা সারদা আমাদের শিখিয়ে গেছেন যে, প্রতিশোধ নেওয়ার চেয়ে ক্ষমা করা অনেক বেশি কঠিন এবং শক্তিশালী। আজকের দিনে যখন আমরা তুচ্ছ কারণে একে অপরের ওপর রেগে যাই, তখন মায়ের এই ধৈর্য আমাদের পথ দেখাতে পারে। তিনি শুধু পুজো করার দেবী ছিলেন না, তিনি ছিলেন আমাদের জীবনের প্রকৃত শ্রেষ্ঠ শিক্ষক।

        (সংগ্রহীত)

=======================


Wednesday, April 8, 2026

40>"ভাঙতে নয়, গড়তে আসা"-(সংগ্রহীত).

 


40>"ভাঙতে নয়, গড়তে আসা"-(সংগ্রহীত).

আজ 19/02/2026 বৃহস্পতিবার
শ্রী শ্রী রামকৃষ্ণ প্ৰরমহংস দেবের 191 তম জন্ম তিথি। (সংগ্রহীত)

"ভাঙতে নয়, গড়তে আসা"
আনন্দ বাজার পত্রিকা----

একুশ শতকের সমাজ, দেশ ও বিশ্বে এক অসংহতির বাতাবরণ। ধর্মান্ধতা নিয়ে এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে, যা অতিমারির চেয়েও ভয়ঙ্কর। এমন বিপর্যস্ত অবস্থায় শ্রীরামকৃষ্ণের সমন্বয়ী ভাবনা আরও বেশি শিক্ষণীয় ও গ্রহণীয়; তাঁর মত ও পথ যাবতীয় জটিলতা প্রতিবন্ধকতা সরিয়ে আলো দেখাতে পারে। কারণ তিনি শুধু সব ধর্মেরই নয়, সমস্ত রকম ভাবেরও সমন্বয়ের পক্ষে। বিভেদ নয়, ঐক্যই যে বেঁচে থাকার মূল সোপান- বুঝিয়েছেন।

জীবন ও সাধনার প্রতি স্তরে তাঁর কাছে গুরুত্বপূর্ণ ছিল মানুষ। ভক্ত দর্শনার্থীদের তাঁর সহজ-সরল ভাষায় বলতেন, "মানুষ কি কম গা? সে যে ঈশ্বরচিন্তা করতে পারে।" মানুষই পারে অসীম অনন্ত সত্তাকে অনুভব করতে; ঈশ্বর মানে সেই অশেষ সম্ভাবনা, যা সর্বার্থে মানুষের শুভ মঙ্গলানুভূতিকেই মনে করায়। প্রতিটি মানুষের মধ্যেই সেই অনন্ত সত্তা ও সম্ভাবনা রয়েছে। জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে এই মানবতার উত্তরণই আধ্যাত্মিকতা, আসল ধর্ম।

প্রিয় শিষ্য নরেন্দ্রনাথ নির্বিকল্প সমাধিতে মগ্ন হতে চান, আর পাঁচ জন শুরু হলে খুশি হতেন। শ্রীরামকৃষ্ণ কিন্তু দুঃখিত: ভেবেছিলাম তুই একটা বটবৃক্ষ হবি। আত্মকেন্দ্রিক মনোভাব ছাড়িয়ে ভবিষ্যতের বিবেকানন্দকে এগিয়ে দিলেন কর্মের পথে। আমরাও পেলাম লোকহিতার্থে আত্মনিবেদনের শিক্ষা, 'বহুজনহিতায়, বহুজনসুখায়'। অনেকের মতো সন্ন্যাসের বাসনায় যখন গিরিশ ঘোষও শ্রীরামকৃষ্ণের কাছে আবেদন করছেন, তিনি তাঁকেও বলেছেন নিজের পথে থাকতে নাটকে যে লোকশিক্ষা হয়া এখানেও দেখি তাঁর মানবপ্রেম, বৃহৎ কল্যাণের জন্য ক্ষুদ্র স্বার্থ পরিহার করে কর্ম-পরিকল্পনা শুভের উদ্বোধনে প্রকৃত যা-যা করা দরকার, করতে হবে।

তাঁর মনুষ্যত্ব-ধর্মের মূল কথাই হচ্ছে লোকহিতার্থে কর্মের সাধনা। এতে হৃদয় প্রসারিত হয়, সেবার বোধ জাগ্রত হয় সর্বোচ্চ ও গভীরতম স্তর পর্যন্ত। অদ্বৈত দর্শনের এক আধুনিক ব্যাখ্যা পাই তাঁর জীবন ও বাণীতে; মানুষের মধ্যে পদে পদে যে অনৈক্য ও বিভাজন, তার নিরসনে এই ভাবনা আমাদের দিশারি হতে পারে। 'অদ্বৈতজ্ঞান আঁচলে বেঁধে যা ইচ্ছা তা-ই করো', শ্রীরামকৃষ্ণের এই কথাটি একুশ শতকে সমাজকল্যাণের বিকাশেও আমাদের অবলম্বন। কেউই পর নয়, অপরও নয়, সবাই আপন, সবাই আমি- এই বোধের জাগরণ হলে আর কোনও বিভেদ থাকে না। কর্ম তখন সেবায়, পূজায় রূপান্তরিত হয়। শ্রীরামকৃষ্ণ মানুষের মধ্যে এই চৈতন্যের জাগরণ ঘটাতে চেয়েছিলেন।

আশ্চর্য লাগে যখন দেখি, এই সবই তিনি বলে গেছেন আজ থেকে প্রায় দেড়শো বছরেরও বেশি আগে। উনিশ শতকের মধ্যভাগে তাঁর অনতিদীর্ঘ জীবন (১৮৩৬-১৮৮৬), বাঙালি তথা ভারতীয় সমাজ তখন ভিতরে-বাইরে নানা সমস্যায় জর্জরিত। এক দিকে জাতি-বর্ণ নিয়ে ভেদাভেদে সামাজিক জীবন বিষময়, অন্য দিকে বিদেশি শাসনে পর্যুদস্ত। পশ্চিমি শিক্ষার আলো এসেছে, তবে অন্ধকারও রয়ে গেছে অনেকটাই। রাজা রামমোহন রায়, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর প্রমুখ মনীষী আপ্রাণ চেষ্টা করেছেন অশিক্ষা, কুসংস্কার, জাতিদস্ত দূর করে মানুষকে ক্ষুদ্র থেকে বৃহতের পথে এগিয়ে দিতে। এই রকম সময়েই শ্রীরামকৃষ্ণও এসে বললেন, সব ধর্মের সারকথাটি এক: সেই এক-ই বহু হয়েছেন। এই ভাবটি সমন্বয়ের: ভাঙার নয়, গড়ার। তাঁর আহ্বান সব অবস্থানের মানুষকে কাছে টানল- কেশবচন্দ্র সেনও তাঁর কাছে আসেন, বিনোদিনী দাসীও তাঁর আশীর্বাদধন্য।

মানুষকে আপন করার এই শক্তি, অপাঙ্ক্তেয়কেও সমান মান দেওয়া-শ্রীরামকৃষ্ণের এই 'সমাজসংস্কার'-এর ভূমিকাটি নিয়ে আমরা বড় একটা কথা বলি না। উনিশ শতকের সমাজ-ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে তাঁর এই জনহিতের দর্শনকে বিশ্লেষণ করা দরকার। রাজনীতি, সমাজ ও দর্শনের নানান তত্ত্বে 'মানুষ' আর 'ধর্ম'কে শুধু পৃথক করেই নয়, দুই বিপরীত মেরুতে রেখে বিবেচনা করা হয়। শ্রীরামকৃষ্ণের দর্শন বলে, এই দুই পরস্পরের সম্পূরক, আর দুইয়ে মিলে আবার নতুন এক পথের সন্ধান মেলে: অনন্ত পথ, অনন্ত মত।

শ্রীরামকৃষ্ণের এই শাশ্বত প্রেমের আদর্শ রবীন্দ্রনাথকেও আকর্ষণ করেছিল। তিনি বলেছিলেন, 'পরমহংসদেব'কে তিনি ভক্তি করেন, কারণ ধর্মনৈতিক ধ্বংসবাদের যুগে তিনি আমাদের আধ্যাত্মিক সম্পদ ও তার সত্যতা উপলব্ধি করেছিলেন। শ্রীরামকৃষ্ণের সরল অনাড়ম্বর জীবনযাত্রাও সকলের বিস্ময়ের উদ্রেক করত। মালঞ্চ উপন্যাসে অসুস্থ নীরজার শয়নকক্ষে তার মাথার উপরের দেওয়ালে শ্রীরামকৃষ্ণের ছবিকে স্থান দিয়েছেন লেখক রবীন্দ্রনাথ, অসুস্থ নায়িকার মন প্রাণ সর্বস্ব যেন সেই ছবিতে সমর্পিত। রবীন্দ্রনাথেরই রাজা নাটকে দেখি, নানা দেশ থেকে আসা রাজারা এসে লক্ষ করছেন, এখানে পৌঁছনোর নির্দিষ্ট কোনও একটি পথ নেই। তাঁরা নিজেদের মধ্যে আলোচনা করছেন, যে পথ দিয়েই আসা হোক না কেন, শেষ পর্যন্ত এক গন্তব্যেই পৌঁছনো যাবে। এও যেন শ্রীরামকৃষ্ণের বাণীরই বহিঃপ্রকাশ।

=====================

দার্শনিক সন্ধিক্ষণ

অসিতবরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রবন্ধ 'ভাঙতে নয়, গড়তে আসা' (১৯-২) শ্রীরামকৃষ্ণকে নতুন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখার সুযোগ করে দেয়, এক জন ধর্মসাধক হিসেবে নয় শুধু, বরং সমাজমননের নির্মাতা রূপে। উনবিংশ শতাব্দীর বঙ্গসমাজ' ছিল আত্মপরিচয়ের সন্ধিক্ষণে। এক দিকে ঔপনিবেশিক আধুনিকতা, অন্য দিকে কুসংস্কার ও ধর্মীয় সঙ্কীর্ণতা-সমাজ বিভক্ত, আত্মবিশ্বাস ক্ষীণ। এই প্রেক্ষাপটে শ্রীরামকৃষ্ণের আবির্ভাব কেবল ধর্মীয় ঘটনা নয়, ছিল এক গভীর দার্শনিক সন্ধিক্ষণ।

তিনি মতের বিরোধে নয়, সত্যের ঐক্যে বিশ্বাসী। তাঁর উপলব্ধি 'যত মত, তত পথ' আসলে বহুত্ববাদী মানবতাবাদের এক মৌলিক ঘোষণা।

★শ্রীরামকৃষ্ণের দর্শনের কেন্দ্রে ছিল 'অভিজ্ঞতা'; তিনি তত্ত্বকে জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন করেননি। হিন্দু, ইসলাম, খ্রিস্ট ধর্ম, বিভিন্ন সাধনপথ অনুশীলন করে তিনি দেখিয়েছিলেন, ধর্ম বিভাজনের কারণ নয়, আত্মোপলব্ধির বিভিন্ন ভাষা।

★এই দৃষ্টিভঙ্গি পরবর্তী কালে স্বামী বিবেকানন্দের মাধ্যমে বিশ্বমঞ্চে উচ্চারিত হয়; শিকাগোর ধর্মমহাসভায় তাঁর বক্তব্য বহুত্বের দর্শনকে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি দেয় এবং ভারতীয় আত্মবিশ্বাসকে পুনরুজ্জীবিত করে।
★সমাজগঠনের ক্ষেত্রে শ্রীরামকৃষ্ণের প্রভাব আপাতদৃষ্টিতে পরোক্ষ হলেও গভীর ছিল।
তিনি সরাসরি প্রতিষ্ঠান-নির্মাতা না হলেও, তাঁর জীবনাদর্শ থেকেই গড়ে ওঠে রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশনের মতো সংগঠন, যা শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও মানবসেবায় আধুনিক ভারতে এক নীরব বিপ্লব ঘটায়। 'জীবে দয়া' তাঁর কাছে তাত্ত্বিক উচ্চারণ নয়, আধ্যাত্মিক অনুশাসন- এখানেই মানবধর্ম শিক্ষার নৈতিক ভিত শক্ত হয়।

শ্রীরামকৃষ্ণের দর্শনকে যদি আমরা রামমোহন রায়ের যুক্তিবাদ, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের মানবিক সংস্কার ও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিশ্বমানবতার সঙ্গে তুলনা করি, তবে দেখা যায়- সবার লক্ষ্য ছিল মানুষকে বৃহত্তর চেতনার দিকে উত্তরণ; পার্থক্য ছিল পদ্ধতিতে।

★★শ্রীরামকৃষ্ণ সেই উত্তরণের আধ্যাত্মিক ভিত্তি নির্মাণ করেছিলেন। এই বিভক্ত ও উত্তেজিত সময়ে তাঁর দর্শন আরও প্রাসঙ্গিক, কারণ তিনি শিখিয়েছিলেন মতভেদকে শত্রুতা নয়, অভিজ্ঞতার বৈচিত্র হিসেবে দেখতে। শিক্ষা যদি কেবল তথ্য সঞ্চয় না-হয়ে চরিত্রগঠন ও সহমর্মিতার চর্চা হয়, তবে সমাজগঠনের প্রকৃত শক্তি সেখানেই নিহিত। তিনি আমাদের মনে করিয়ে দেন, সভ্যতার অগ্রগতি বাহ্যিক উন্নতিতে নয়, অন্তরের প্রসারে। শ্রীরামকৃষ্ণ ছিলেন সমাজমননের এক নির্মাতা, এসেছিলেন মানুষের তা অন্তরের মানুষকে জাগাতে।

অলোক কুমার মুখোপাধ্যায় সোদপুর, উত্তর ২৪ পরগনা

================

তাঁরই প্রভাবে

অসিতবরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের 'ভাঙতে নয়, গড়তে আসা' প্রবন্ধ প্রসঙ্গে কিছু কথা। জটিল দার্শনিক তত্ত্বের অনুধাবন না করেও, সরল বিশ্বাস, ভক্তি ও নিখাদ প্রেমের মাধ্যমে পরমেশ্বর বা পরম সত্যকে পাওয়া সম্ভব- এই ছিল শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের মূল বাণী। তাঁর সর্বজনবিদিত উক্তি, 'টাকা মাটি, মাটি টাকা' অর্থাৎ পার্থিব ধনসম্পদ ও মাটির মধ্যে কোনও মৌলিক তফাত নেই। অর্থ যেন লালসা বা অনর্থের উৎস না-হয়ে ওঠে, এই ছিল জনসাধারণের প্রতি তাঁর সতর্কবার্তা।

রামকৃষ্ণদেবের প্রভাব রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ছাড়াও সমসাময়িক ও পরবর্তী কালের বহু লেখকের রচনায় ধরা পড়েছে। দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের লেখায় প্রায় সর্বত্রই 'যত মত, তত পথ' দর্শনের মানবিক দিকটি লক্ষ করা যায়। তাঁর সাহিত্য ও নাটকে বাংলার ধর্মীয় পুনর্জাগরণ এবং ধর্মের উদার দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন স্পষ্ট।

মোহিতলাল মজুমদার তাঁর বিবিধকথা গ্রন্থে রামকৃষ্ণের আধ্যাত্মিকতা ও জাতীয় চেতনার দিকটি উন্মোচিত করেছেন। পরবর্তী কালে কাজী নজরুল ইসলাম রামকৃষ্ণের ভাবধারায় উদ্বুদ্ধ হয়ে হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের সেতুবন্ধনে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখেন।

তা ছাড়া শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের অন্নদাদিদি-সহ একাধিক নারীচরিত্রে নিঃস্বার্থ জীবনচর্চার যে পরিচয় মেলে, তা 'শিবজ্ঞানে জীবসেবা'-র আদর্শেরই এক সাহিত্যিক প্রতিফলন। তাঁর রচনায় রামকৃষ্ণ-বর্ণিত মাতৃভাব ও ত্যাগের মহিমা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ভাবে প্রকাশ পেয়েছে। ঠাকুরের মতে, 'আমি' বলে কোনও সত্তা নেই। যেমন পেঁয়াজের খোসা ছাড়াতে ছাড়াতে শেষে আর কিছু অবশিষ্ট থাকে না, তেমনই আত্ম-অনুসন্ধানে 'আমি' ক্রমশ বিলীন হয়ে যায়; শেষ পর্যন্ত যা থাকে, তা আত্মা বা চৈতন্য। অথচ মানুষ সেই 'আমি'-র আমিত্ব খুঁজতে গিয়ে ভ্রমের শিকার হয়। এই অবিদ্যা থেকেই জন্ম নেয় নীচতা, কুসংস্কার, হিংসা, বিবাদ ও লোভ। মানুষ তখন গড়ার কথা ভুলে গিয়ে কেবল ভাঙতেই থাকে।

গীতিকা কোলে

Thursday, March 19, 2026

39>|| হরি সংকীর্তন ||

    39>|| হরি সংকীর্তন ||

          <---আদ্য নাথ--->

বলো হরি, কহো হরি,

চিন্তন করো হরি হরি।

দুইবাহু তুলিয়া উর্ধে বল হরি, হরি বোল,

নাচিয়া  আনন্দে বল, বল হরি, হরি বোল।


সকাল, সন্ধ্যা,হাততালি দিয়ে করিলে হরিনাম,

পূর্ণ-হবে-সকল মনস্কাম।

হাততালি দিয়ে করলে হরিনাম,

পালাবে সব পাপ তাপ, মন-হবে 

আনন্দ ধাম।


যেমন গাছের নীচে দাঁড়িয়ে হাততালি দিলে গাছের সকল পাখি উড়ে যায়,

তেমনি হাততালি দিয়ে হরিনাম করলে

গাছ রুপি দেহ  থেকে সকল অবিদ্যারূপ পাখি উড়ে পালায়।

                 শ্রীশ্রী ঠাকুর রামকৃষ্ণ দেব।


ঈশ্বর কে--?--তিনি সর্বসয়, তিনি নিজে

     সকল কিছু সহ্য করেণ।

  যত দুঃখ, কষ্ট,রোগ,ভোগ,তিনি সকলি

সহেন।

ঈশ্বর সকলের সকল সয়,

তিনি সর্ব শক্তি মান--সর্বসয়,

তিনিই রোগ, তিনিই ভোগ, তিনিই

সর্ব ভোগ-সর্ব সহায়।

 

"তিনি সর্ব শক্তি মান--সর্বসয়" অর্থাৎ তিনি সর্বশক্তিমান ও সর্বজ্ঞ। 



 ঈশ্বর আছেন সর্বত্র তিনি সর্বশক্তিমান

তিনি যা কিছু সৃষ্টি করতে পারেন, যেভাবে সৃষ্টি করতে পারেন, এবং যা কিছু ঘটে তা সবই তার জ্ঞান ও ক্ষমতার অধীনে। 

 তিনি সমস্ত শক্তির উৎস এবং কোনো কিছুই তাকে অক্ষম করতে পারে না। 

তিনি যা ইচ্ছে তাই করতে পারেন, কোনো শক্তিই তাকে বাধা দিতে পারে না।


 তিনি প্রতিটি বিষয় সম্পর্কে অবগত, অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ সবই তার কাছে জানা। 

তিনি সকলের সমস্ত গোপন বিষয় এবং প্রতিটি ঘটনা সম্পর্কে সম্পূর্ণ ওয়াকিবহাল।


তিনি অসীম ক্ষমতা ও জ্ঞানের অধিকারী, এবং তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে কিছুই সম্ভব নয়। 

ঈশ্বর সর্বশক্তিমান সকল কিছুর উপর 

পূর্ণক্ষমতাবান তিনি সম্পুর্ন জগৎ কে চালিত করেন।

   <-----আদ্য নাথ রায় চৌধুরী----->

========================

Saturday, January 24, 2026

38>||পরমপুরুষ _শ্রীরামকৃষ্ণ ||

     38>|| পরমপুরুষ_শ্রীরামকৃষ্ণ ||

       

মা'র মন্দিরে বসে তোরা চোখ বুজে কেন ধ্যান করিস বলতো? সাক্ষাৎ মা চিন্ময়ী বিরাজ করছেন, আশ মিটিয়ে দেখে নে। দ্যাখ তাঁর আয়তো শান্ত চোখ দুটি। দ্যাখ, তাঁর পাদপদ্ম দু-খানি। যখন আপন মা'র কাছে যাস মাকে দেখতে,  তখন কি চোখ বন্ধ করে মা'র কাছে বসিস, না মালা ফেরাস বসে-বসে? 

চেয়ে দ্যাখ দেখি --- এ তোর আপন মা নয়?

শিখেরা বলেছিল ঈশ্বর দয়ালু। আমি বললাম, " তিনি আমাদের মা-বাপ, তিনি আবার দয়ালু কি! ছেলের জন্ম দিয়ে বাপ-মা লালন-পালন করবে না, করবে কি বামুন-পাড়ার লোকেরা?" 


কালীমন্দিরের চাতালে বসে স্তব করছে রামকৃষ্ণ ::" ও মা, মা ওঁকার রূপিনী মা! এরা কত কি বলে মা, কিছু বুঝতে পারিনি। কিছু জানি না মা। শুধু শরণাগত। শরণাগত।  কেবল এই কোরো মা, তোমার শ্রীপাদপদ্মে যেন শুদ্ধা ভক্তি হয়। আর যেন তোমার ভুবনমহিনী মায়ায় মুগ্ধ কোরো না। শরণাগত! শরণাগত! "

          (সংগৃহীত)

======================