Saturday, May 30, 2026

44>|| 'আত্মতত্ত্ব' ||

       44>|| 'আত্মতত্ত্ব' ||

     ( সংগ্রহীত)

"তত্ত্ব মানে জ্ঞান, আর আত্ম মানে আত্মা, সুতরাং 'আত্মতত্ত্ব' মানে আত্মা সম্পর্কে জ্ঞান। 'আত্মদর্শন' বলেও একটা কথা প্রচলিত আছে কিন্তু কথাটা পুরোপুরি সঠিক নয়, কারণ দর্শন করা মানে সেখানে দৃশ্য বা দ্রষ্টব্য এবং দ্রষ্টা দুইই আছে, কিন্তু আত্মাকে দর্শন করা বা দেখা যায় না। আত্মদর্শন কথাটা আংশিক সত্য, কারণ যাঁর মধ্যে আত্মতত্ত্বের বিচার জাগছে তাঁর জীবনদর্শন সম্পূর্ণ পাল্টে যায়; তিনি তখন সকলের মধ্যে নিজেকে দেখতে শুরু করেন, তাই সকলের ব্যথাতে তিনি ব্যথিত হন ও সকলের আনন্দে আনন্দ পান। তাই এক অর্থে একে আত্মদর্শন বলা যেতে পারে কারণ এই অবস্থা হলে তাঁর জীবনদর্শন পরিবর্তন হয়। কিন্তু আত্মতত্ত্ব মানে আত্মার জ্ঞান। আত্মাকে শব্দ দিয়ে পুরোপুরি ব্যাখ্যা করা কখনই সম্ভব নয়, কারণ আত্মা অবাঙমানসগোচরম। প্রথমাবস্থায় অজ্ঞানতার কারণে আমরা আত্মাকে দুটো পৃথক শব্দ ব্যবহার করে বলি — 'জীবাত্মা' ও 'পরমাত্মা'। কিন্তু জ্ঞান হয়ে গেলে বোধ হয় যে আসলে জীবাত্মা ও পরমাত্মার মধ্যে কোন পার্থক্য নেই। জীব দেহ আধার করে যে আত্মতত্ত্ব বা আমি-বোধ তাকে বলা হয় জীবাত্মা আর জীব-দেহবুদ্ধি অতিক্রম করে যখন সব কিছুর সাথে একাত্ম হয়ে যায় সেই চেতনাকে বলা হয় পরমাত্মা, এবং এই অবস্থাকে বলা হয় জীবাত্মার সাথে পরমাত্মার মিলন। এই অবস্থায় উপলব্ধি হয় যে নতুন করে মিলন হচ্ছে এমন নয়, মিলন হয়েই ছিল। 


আত্মাকে সংজ্ঞায়িত করা যায় না। শাস্ত্রে বলেছে আত্মার জন্ম হয় না, মৃত্যু হয় না, বৃদ্ধি হয় না, ক্ষয় হয় না, আত্মাকে আগুনে দহন করা যায় না, জলে সিক্ত করা যায় না, আত্মা কোথাও গমন করেন না, প্রস্থানও করেন না, আত্মা সর্বভূতেষু। আত্মাই সত্য, আত্মাই আছেন, বাদবাকি সবকিছু অনিত্য, সব আত্মারই প্রকাশ। অর্থাৎ আপনার শরীর আত্মার এক প্রকাশ, আমার শরীরটাও এক প্রকাশ, এই প্রকাশিত ও অপ্রকাশিত জগতের সবকিছুই আত্মার প্রকাশ। কিন্তু তা বলে আত্মা বহু নয়, আত্মা এক। আত্মা আকাশের মতন, আকাশ যেমন সর্বত্রই রয়েছে, আত্মাও তেমনই আছে। যদিও আমরা ভাবি যে আকাশ শুধু মাথার উপরে রয়েছে, তা কিন্তু নয়, আপনার এবং আমার মাঝেও আকাশ আছে, আবার আমাদের মধ্যেও আকাশ আছে। শরীরের মধ্যেও আকাশ আছে, আবার মাটির নিচেও আকাশ আছে — এভাবে সর্বত্রই আকাশ-তত্ত্ব রয়েছে। ক্ষিতি, অপ, তেজ, মরুৎ, ব্যোম — এই ব্যোম মানে আকাশ বা Space — এই ব্যোম তত্ত্ব সর্বত্রই রয়েছে, আমরা শুধু বুঝতে পারিনা। আমরা যদিও কেবল উপরদিকে তাকিয়ে ভাবি যে ওখানে আকাশ তত্ত্ব বেশি সক্রিয় কিন্তু নক্ষত্রমণ্ডলীর কাছে গেলে আর তেমন মনে হবে না। ওখান থেকে বোঝা যাবে যে সর্বত্রই আকাশ রয়েছে। বরং সব জায়গায় বায়ু, জল ও মাটি নেই, কিন্তু আকাশ এবং অগ্নি সর্বত্রই রয়েছে। তাই শিশুর বয়স বাড়ার সাথে সাথে ওর মধ্যে এক একটা তত্ত্বের প্রকাশ দেখা যায়। 


লক্ষ্য করে দেখবে, একদম ছোট্ট বেলায় বাচ্ছারা হাঁটু গেড়ে খেলতে খেলতে মাটি খোঁড়াখুঁড়ি করে‌। আজকের ফ্ল্যাট কালচারে ওরা যদিও মাটির স্পর্শ পায় না কিন্তু যাদের বাড়ির সামনে উঠোন বা কাদামাটি জাতীয় কিছু আছে সেখানকার বাচ্ছারা দেখবে মাটি ঘাঁটে, মুখে দেয়। আমরা বড়রা ওই দেখে ভয় পাই কিন্তু ওভাবেই বাচ্ছারা ক্ষিতি তত্ত্বের সাথে প্রথম পরিচয় করে। আমরা যেমন দেখা হলে নমস্কার করি, তেমনই শিশুরা প্রথম অবস্থায় জিহ্বা দিয়ে এই পৃথিবীর সাথে পরিচয় স্থাপন করে, সবকিছু মুখে দিয়ে দেখতে চায়; ওটাই ওদের নমস্কার। ওই phase কেটে গেলে দেখবে অপ তত্ত্ব বা জলের প্রতি ওদের আগ্রহ বাড়ছে। সারাক্ষণ জল নিয়ে দাপাদাপি করতে চায়, পুকুর দেখলে গিয়ে নামতে চায়, গামলার জলে বসিয়ে রাখলে দিব্যি খেলা করবে, হেসে উঠবে, এবং ওখান থেকে তুলে আনতে গেলে কাঁদতে শুরু করে দেবে। এভাবে দ্বিতীয় ধাপে ওদের জল তত্ত্বের সাথে বন্ধুত্ব তৈরি হয়। তৃতীয় ধাপে অগ্নি তত্ত্বের সাথে শিশুর পরিচয় হয়। আগেকার দিনে আগুন জ্বালানো সহজ ছিল না, কাঠ পাতা কয়লা ঘুঁটে জোগাড় করে একবার আগুন জ্বালাতে পারলে সেই আগুন না নিভিয়ে রেখে দেওয়া হতো, তাই প্রায় সারাক্ষণই আগুন জ্বলত। কিন্তু এখন আগুন জ্বালানো এতই সহজ হয়ে গেছে যে একবার জ্বালিয়েই সঙ্গে সঙ্গে নিভিয়ে দেওয়া হয়। এই আগুনের সাথে মানুষের খুব গভীর সম্পর্ক। প্রাচীনকালে যখন থেকে আমরা আগুন জ্বালাতে শিখেছি তখন থেকে আমাদের জীবনে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন হয়েছে। আগুনের সাথে মানুষের বন্ধুত্ব এবং তার ভয়ঙ্করতা — এই দুই স্মৃতিই বাচ্ছার অবচেতনে থেকে যায়। তাই আগুন দেখলেই বাচ্ছারা হাত দিতে চায়। বাড়িতে মোমবাতি জ্বললে অনেক বাচ্ছাই ওই আলোর দিকে হাঁ করে তাকিয়ে থাকে। এভাবে ওরা অগ্নি-তত্ত্ব বা আগুনের সাথে পরিচিত হয়। বাচ্ছারা যখন আরেকটু বড় হয় তখন ওদের রং এবং গন্ধের প্রতি তীব্র আকর্ষণ থাকে। ফুল, গাছ, পাতা সবকিছু হাতে নিয়ে তখন সে গন্ধ শুকতে চায় এবং খুবই দৌড়াদৌড়ি করে। কারণ গতিই বায়ুর পরিচয়। বাচ্ছার বয়স আর একটু বাড়লেই তারমধ্যে জানার আগ্রহ তৈরি হয়, তখন সে জিজ্ঞাসা করে — এটা কি? ওটা কি? পাখিটা কি করে ডাকছে? ওই পাখিটা অন্যরকম করে ডাকছে কেন? সূর্যটা সকালে কি করে উঠছে? — এইরকম নানান প্রশ্ন করে। মাঝে মাঝে অনেক উদ্ভট প্রশ্নও করে বসে, কিন্তু প্রশ্ন করা কিছুতেই থামায় না। এটা বাচ্ছার মধ্যে আকাশ তত্ত্বের ক্রিয়াশীলতার লক্ষণ। আকাশ মানেই অজানাকে জানার ইচ্ছা। আর এই অজানার মধ্যে এক মজা আছে, তাই আকাশের দিকে তাকিয়ে আমরা বারবার বিস্মিত হই। 


এমনিতে কেউ যদি ভাবে যে তার সব জানা হয়ে গেছে তাহলে তার জীবন বড় একঘেয়ে প্রকৃতির। টিভি দেখলে কিন্তু মনে হবে না যে কত কিছু অজানা আছে, খেলা রাজনীতি খবর যাই হোক না কেন যখনই দেখবে মনে হবে সেই একই জিনিস repeat হচ্ছে। কিন্তু আকাশের দিকে তাকিয়ে চাঁদ, তারা, সপ্তর্ষি, কালপুরুষ বারবার দেখেও তোমার মন ভরবে না। বরং আরও দূরে কত কি আছে ভেবে বিষ্ময় বোধ হবে। অসীম ও অনন্তের দিকে তাকিয়েই মানুষের নিজের অজানা নিয়ে ভাবনা জাগে। এই পঞ্চম অবস্থায় বাচ্ছার মধ্যে ব্যোম তত্ত্বের ক্রিয়াশীলতা লক্ষ্য করা যায়। তাই সে অজানাকে জানতে চায়, ক্রমাগত বড়দের প্রশ্ন করে নাজেহাল করে তোলে। আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থা শিশুর এই অজানাকে জানার কৌতূহলকে সমূলে বিনাশ করে — 'তুমি কি প্রশ্ন করবে আর কি উত্তর দেবে সবটা আমি ঠিক করে দেব। তারপর তোমাকে পরীক্ষা করে দেখব এবং সেই অনুযায়ী তোমার কেরিয়ার তৈরি করব।' সুতরাং প্রশ্ন করা, সিস্টেমের বাইরে কিছু জানার চেষ্টা করা, আবিষ্কার করার ইচ্ছা সম্পূর্ণ ভুলে যাও। বাচ্ছাদের সাথে এই ভঙ্গীতে মিশে ওদের মধ্যেকার আকাশ তত্ত্বকে আমরা মেরে ফেলার আয়োজন করেছি। কিন্তু সাধু এবং ঋষিরা বলেন যে একজন মানুষের মধ্যে যত আকাশ তত্ত্ব জাগবে তার মধ্যে তত আধ্যাত্মিক শক্তির স্ফুরণ হবে। যে সকল মানুষেরা দীক্ষা নিয়ে সাধনা করছে তাদের মধ্যে আকাশ তত্ত্বের বিকাশ হচ্ছে। কারণ তারা আত্মচিন্তন করছে। 


আত্মার রূপ বর্ণনা করতে গিয়ে বলা হয়েছে গগণসদৃশম। আমাদের গুরুমহারাজ বলতেন, "মাঝে মাঝে ছাদে উঠে খোলা আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকবি।" এই তাকানোর সময় কিছু ভাবার দরকার নেই, ওখানে ওটা কি, ওই তারাটার কি নাম, আজকে কেন ওখানে দেখতে পাচ্ছি? — এভাবে কিছু না ভেবে বা চেনার চেষ্টা না করে আকাশের দিকে শুধু তাকিয়ে থাকো। তাহলে আত্মা সম্পর্কে ধারণা পাবে। আকাশের অসীমতা, গভীরতা ও অনন্ত ব্যাপ্তি দেখে শাস্ত্রে আত্মাকে আকাশের সাথে তুলনা করে বলা হয়েছে গগণসদৃশম। মানুষের মধ্যে চেতনা যত জাগে, চেতনা যত চৈতন্যমুখী হয় তত সে আত্মচিন্তন করে। 


আত্মার কথা ভাবলে মানুষের কি মনে হয়? মনে হয় তার কোন রূপ নেই, আকার নেই, তার ব্যাপ্তি অসীম। তাই মানুষ যত আত্মচিন্তন করে তত তার মধ্যে এক অবয়বহীন অসীমতা জাগতে শুরু করে। তার হৃদয় অসীমতার স্পর্শ পায়, তার মনের বিস্তার হয়, তার চিন্তা অচিন্তের দিকে এগিয়ে যায় এবং এক সময় চিন্তা করার আর কিছু থাকে না। তখন সেই বিরাটের সাথে তার চেতনা একীভূত হয়ে যায়। এটাই আত্মতত্ত্বের খোঁজ। শাস্ত্রে আত্মা কি নয় শুধু তাই বলেছে। কারণ একমাত্র সেটাই বলা যায়। কেউ যদি আত্মা কি বলতে শুরু করে তার মানে সে এবং আত্মা আলাদা। কিন্তু আত্মা আমাদের প্রত্যেকের স্বরূপ, আর মুখ দিয়ে স্বরূপকে প্রকাশ করা যায় না। তাই ঠাকুর রামকৃষ্ণ বলতেন — ব্রহ্ম কখনও উচ্ছিষ্ট হন না, অর্থাৎ মুখের কথায় তাঁকে কখনও এঁটো করা যায় না। এটাই আত্মতত্ত্ব।


{স্থান — নসিবপুর, কোলেপাড়া,

তারিখ — ১৪ই মার্চ, ২০১৮}

        (সংগ্রহীত)

========================

Tuesday, May 26, 2026

43>শ্রী শ্রী ঠাকুর রামকৃষ্ণ দেব জিলিপি খেতে ভালো বসতেন:--

 43>শ্রী শ্রী ঠাকুর রামকৃষ্ণ দেব জিলিপি খেতে ভালো বসতেন:--


শ্রী শ্রী ঠাকুর তাঁর গ্রামের বাড়ির মিষ্টির দোকানের বড় বড় জিলিপি কে বলতেন

 'গরুর গাড়ির চাকা'।

আর সেই জিলিপি ঠাকুর পছন্দ করতেন,

বাইরে মচমচে শক্ত ভিতরে সরে টইটুম্বুর

ঠিক যেন ভক্তি রসে ঠাসা।

আজও পাওয়া যায় সেই দোকানে 

  ভাজা আর মিস্টি রসে ঠাসা,

 'গরুর গাড়ির চাকা'।



 শ্রী শ্রী ঠাকুর রামকৃষ্ণদেবের জীবন ছিল

অতি সরল ও একেবারে সাদা মাটা,

মানুষটির মন  ছিল একদম শিশুর মতন।

এক অপূর্ব সরলতা, ভক্তি আর আনন্দের

সংমিশ্রণ।  তাঁর এই সহজ-সরল জীবনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে গ্রামবাংলার স্বাদ-বিশেষ করে তাঁর জন্মস্থান কামারপুকুরের মাটির গন্ধ আর সেখানকার ঐতিহ্যবাহী মিষ্টান্ন।


এই প্রেক্ষাপটে "জিলাপি” শুধু একটি মিষ্টি নয়, যেন এক টুকরো আবেগ, এক স্মৃতির বাহক। বলা হয়, কামারপুকুরের গরম গরম, রসালো জিলাপি ঠাকুরের খুব প্রিয় ছিল। সোনালি রঙের পাক খাওয়া সেই জিলাপি, চিনির রসে টইটুম্বুর , বাইরে হালকা মচমচে আর ভিতরে নরম-যেন ভক্তির মতোই সরল অথচ গভীর। জিলাপির প্রতি তাঁর এই ভালোবাসা আমাদের মনে করিয়ে দেয় -আধ্যাত্মিকতার পথ সবসময় কঠোর বা গম্ভীর নয়; তার মধ্যেও আছে আনন্দ, আছে ছোট ছোট সুখের মুহূর্ত। একদিকে তিনি ছিলেন ঈশ্বরচিন্তায় নিমগ্ন, অন্যদিকে এই সাধারণ গ্রাম্য মিষ্টির প্রতি তাঁর আকর্ষণ তাঁর মানবিক ও সহজ সত্তাকে আরও উজ্জ্বল করে তোলে।


কামারপুকুরের সেই জিলাপি আজও শুধু স্বাদের জন্য নয়, স্মৃতির জন্য, ভক্তির জন্য, আর ঠাকুরের স্নেহময় উপস্থিতির অনুভূতির জন্য বিশেষ হয়ে আছে। যেন প্রতিটি পাকের ভাঁজে ভাঁজে লুকিয়ে আছে তাঁর হাসি, তাঁর সরলতা, আর তাঁর অন্তহীন প্রেম।

         ( সঙ্কলিত)

   <---আদ্যনাথ রায় চৌধুরী--->

========================