14>|| মহাসাধক রাম ঠাকুর ||
গ্রামের আর পাঁচটা ছেলেদের মতোই সারাদিন খেলাধুলো করে বড়ো হচ্ছিল রাম ও তার যমজ ভাই লক্ষ্মণ। কিন্তু কমলাদেবীর মনে শান্তি নেই। কয়েক বছর আগেই স্বামী রাধামাধব চক্রবর্তী ইহলোক ত্যাগ করেছেন। এখন কমলা দেবীর একমাত্র চিন্তা রামকে নিয়ে। অন্য ছেলেদের মতো হেসে খেলে বড় হলেও সে যেন একটু হলেও অন্য রকম। সন্ধে হলেই রাম একতাল কাদা নিয়ে ঠাকুর তৈরি করতে শুরু করে। তার পর সেই ঠাকুরকে পুজো করে ডুবে যায় কীর্তন গানের সুরের মায়ায়। তখন সে যেন এক ভক্ত সন্ন্যাসী, এক পাগল বাউল।
রামের বাবা রাধামাধব চক্রবর্তী ছিলেন একজন প্রখ্যাত তন্ত্রসাধক। তাঁর কঠিন সাধনার গল্প সেই সময়ে গ্রামে গঞ্জে ছড়িয়ে পড়েছিল। এমন একজন সাধকের সংসারে আধ্যাত্মিক পরিবেশ স্বাভাবিক হলেও মায়ের মন মানতে চায় না। ছেলের মধ্যে সন্ন্যাসী হওয়ার সব লক্ষণ স্পষ্ট হয়ে উঠতেই কমলাদেবী বিচলিত হয়ে ওঠেন। তাঁর রামের বয়স তো মাত্র আট বছর... এইটুকু বয়সেই কি রাম সংসার ছেড়ে চলে যাবে!
অজানা আশঙ্কায় মায়ের বুক কেঁপে ওঠে। শক্তিসাধনায় দীক্ষিত গৃহী সন্ন্যাসী রাধামাধব চক্রবর্তীর সঙ্গে সংসার করে কমলাদেবী বুঝেছেন, যে মানুষের মনের মধ্যে একবার ঈশ্বরচেতনার বীজ পোঁতা হয়ে গেছে সেই মানুষের কাছে সমাজ, সংসার সব কিছুই তুচ্ছ হয়ে যায়। তাই ঈশ্বরসাধনায় ছেলেকে বাধা না দিলেও কমলাদেবী রামকে নজরে রাখার চেষ্টা করেন।
এর মধ্যেই একদিন তাদের বাড়িতে রাধামাধবের দূর সম্পর্কের এক বোন এলেন। কিছুদিন থাকার পর তিনি কমলাদেবীকে বললেন যে তিনি রামকে সঙ্গে নিয়ে তীর্থে যাবেন। রাম তো একপায়ে খাড়া। কমলাদেবীর অনিচ্ছা এখানে খাটলো না। রামের পিসি তাঁর মাকে বুঝিয়ে রামকে নিয়ে চন্দ্রনাথের পথে বেরিয়ে পড়লেন।
সে সময়ে মহাতীর্থ চন্দ্রনাথের পথ বেশ দুর্গম ছিল।
চার দিকে ঘন জঙ্গলে ঘেরা পাহাড়ি পিচ্ছিল পথ। বন্য জন্তুজানোয়ার ছাড়াও এই পথে চোর ডাকাতের ভয়ও আছে। রামের বয়স তখন মাত্র দশ বছর। এইটুকু ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে বয়স্ক পিসি অনেক কষ্টে একটা পাহাড়ের মাথায় পৌঁছে চন্দ্রনাথ মন্দিরের চূড়া দেখতে পেলেন। আনন্দে আত্মহারা হয়ে পিসি একটা পাথরের উপর বসে তার পূজা উপাচারের পুঁটলিটা খুলে সব কিছু মিলিয়ে নিতে গিয়েই চমকে উঠলেন, এ বাবা... বেলপাতা আনতেই তো ভুলে গিয়েছেন। এখন উপায়! চন্দ্রনাথ মহাদেবের পুজো বেলপাতা ছাড়া হবে কী করে? এত কষ্ট করে এত দূর এসে তিনি কি চন্দ্রনাথের পুজো না করেই ফিরে যাবেন? না, না, সে কী করে সম্ভব! দরকার হলে তিনি চন্দ্রনাথের পায়ে নিজের জীবন সঁপে দেবেন, তবুও তাঁকে পুজো না করে তিনি বাড়ি ফিরবেন না। কিন্তু বেলপাতা!
এই ঘন জঙ্গলে কে তাকে বেলপাতা জোগাড় করে দেবে?
বেশ হতাশ হয়ে পড়লেন পিসি। ছোট্ট বালক রাম তখন পাহাড়ের উপর দাঁড়িয়ে দূরে চন্দ্রনাথ মন্দিরটা দেখছিল। পিসিকে দেখে সে বুঝল, নিশ্চয়ই কোনও সমস্যা হয়েছে। পিসি তাঁকে কাছে ডেকে বললেন, ‘বাবা রাম, যে ভাবেই হোক, তুই আমাকে দুটো বেলপাতা জোগাড় করে দে, না হলে আমার এত কষ্ট সব বিফলে যাবে’।
রাম তো অবাক, সে বলল, ‘তুমি কি পাগল হয়ে গেলে পিসি? এই পাহাড়ি জঙ্গলে আমি কোথায় বেলপাতা পাব?’
পিসির চোখে জল, তিনি বললেন, ‘কোথায় পাবি জানি না... কিন্তু কমলা আমাকে বলেছে ঈশ্বর নাকি তোর ডাক শুনতে পায়।
তুই যদি আমাকে বেলপাতা জোগাড় করে না দিস তাহলে আজ এক্ষুনি আমি আত্মহত্যা করব’। পিসি হাউ হাউ করে কাঁদতে লাগলো।
পিসির চোখে জল দেখে ছোট্ট রামের মন ভিজে গেল। সে ঈশ্বরের নাম নিয়ে চোখ বুজে ধ্যানে বসল।
কিছুক্ষণ পর চোখ খুলে সে পিসিকে বলল, ‘পিসি, ওই যে ছোট্ট পাথরটা দেখছ, ওটা তুলে ফেললেই তুমি বেলপাতা পাবে’।
পিসি দৌড়ে গিয়ে পাথরটা তুলেই বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেলেন। তিনি দেখলেন সেই পাথরের নীচ থেকে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে উঠল একটা ছোট্ট বেলগাছ যার কচি ডালে রয়েছে বেশ কয়েকটা বেল পাতা। পিসি অবাক হয়ে তার সামনে বসে থাকা জীবন্ত চন্দ্রনাথকে দেখতে লাগলেন, যে জীবন্ত চন্দ্রনাথ ওরফে রামই পরবর্তীকালে হয়ে ওঠেন ভক্তদের প্রাণের দেবতা, মহাসাধক রাম ঠাকুর।
সংসারে একেবারেই মন বসে না ছেলেটার। সব সময়ই চারপাশের মোহ-বন্ধনকে ছিঁড়ে ফেলে অজানার সন্ধানে বেরিয়ে পড়তে ইচ্ছে করে, কিন্তু মায়ের অসহায় মুখ দেখে ছেলেটা আটকে পড়ে। জন্ম-জন্মান্তরের এক মায়াবন্ধন ঘর ছেড়ে বেরোতে দেয় না তাঁকে।
তন্ত্রসাধক রাধামাধব চক্রবর্তীর মৃত্যুর পর তাঁর দুই যমজ ছেলে রাম ও লক্ষ্মণের ওপরই সংসারের দায়ভার পড়ার কথা। লক্ষ্মণ এদিক-ওদিক কাজের চেষ্টা করলেও রামের কাজকর্মে একেবারেই মন নেই। সারাক্ষণই আপনমনে সে কী যেন ভেবে চলে। ভগবানের নাম সংকীর্তন আর মাটির ঠাকুর তৈরি করে পুজো করেই সারাটা দিন কাটে তার। পুজোর সময় ঠাকুরের সঙ্গে আপন মনে কথা বলে চলে রাম।
আড়াল থেকে মা ছেলেকে দেখে চোখের জল আটকাতে পারে না।
ছেলেদের ওপর দায় না চাপিয়ে মা কমলাদেবী নিজের মতো করে সংসারের তীব্র অর্থাভাব সামলানোর চেষ্টা করেন, কাউকে কিছু বুঝতে দেন না। রাম কিন্তু বুঝতে পারে যে, এ ভাবে হাত গুটিয়ে বসে থাকলে চলবে না, তাকে কিছু একটা করতেই হবে।
যেভাবেই হোক তাঁর মায়ের মুখে হাসি ফোটাতেই হবে কিন্তু কী কাজ করবে বা কী কাজ সে পারে, সেটাই তাঁর জানা ছিল না।
তবু, কালবিলম্ব না করে কাজের সন্ধানে বেরিয়ে পড়ল রাম। নানা জায়গায় কাজের খোঁজ করলেও কে তাঁকে কাজ দেবে? উদ্দেশ্যহীন ভাবে ঘুরতে ঘুরতে রাম নোয়াখালির ফেনি শহরে পৌঁছল। সেখানে পথের মধ্যে এক উকিলের সঙ্গে তার আলাপ হলো। রামের সব কথা শুনে এবং তার ব্যবহারে সন্তুষ্ট হয়ে সেই উকিল তাকে বললেন, ‘যতদিন না অন্য কোন কাজ পাচ্ছো ততদিন আমার বাড়িতে থেকে আমাদের রান্না করতে হবে... পারবে?’ রাম কিছু না ভেবেই রাজি হয়ে গেল।
শুরু হলো রামের অন্যরকম এক জীবন। সারাদিন ধরে রান্নাঘরে চাল, ডাল, আলু, পিঁয়াজ ইত্যাদির সঙ্গে থেকে থেকে বেশ মানিয়ে নিয়েছিল রাম। সারাক্ষণ বাড়ির লোকেদের খাবারের তৈরি করার কাজে ব্যস্ত থাকলেও তার ঈশ্বরভক্তিতে একটুও ছেদ পড়ত না। সব কাজ সেরে সন্ধ্যাবেলায় সে তার আরাধ্য দেবতাকে পুজো করতে বসতো। পুজোর মধ্যেই ঠাকুরের সঙ্গে কথা বলা নিয়ে এই নিয়ে বাড়ির অন্যান্য কর্মচারীরা তাকে বিদ্রূপ করত, তাকে নিয়ে চলত হাসিঠাট্টা, মশকরা। যদিও রাম সেসব গায়েই মাখত না।
এভাবেই বেশ চলছিল। একদিন বাড়ির কর্তা ঠিক করলেন কালীপুজো করবেন। কিছুদিন আগে তাঁর একমাত্র ছেলে মরণাপন্ন হওয়ায় তিনি মা কালীর কাছে ছেলের প্রাণভিক্ষা করেছিলেন। তাঁর ছেলে এখন সুস্থ, তাই তিনি মানতের পুজো করছেন।
পুজোর দিন সকাল থেকে বাড়িতে সাজো সাজো রব কিন্তু সমস্যা হলো পুরোহিতকে নিয়ে। একেবারে শেষ মুহূর্তে জানা গেল, হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়ার জন্য পুরোহিত আসতে পারবেন না। দোর্দন্ডপ্রতাপ উকিলবাবু মাথায় হাত দিয়ে বসলেন, এখন কী হবে? সব আয়োজন যে সম্পূর্ণ। বাড়ির কয়েকজন কর্মচারী তাকে এসে বললো যে, বাড়িতেই তো পুরোহিত রয়েছে। এই অবস্থায় রামকে দিয়েই তো কাজ চালানো যেতে পারে। উকিলবাবুর কথাটা পছন্দ হলো।
এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিরা সেদিন পুজোয় নিমন্ত্রিত। তাদের সামনেই বাড়ির রাঁধুনি রাম পরম নিষ্ঠাভরে মায়ের আরাধনা করল। আমন্ত্রিতদের কাছে রামের কালীপুজো প্রশংসা কুড়োলেও বাড়ির অন্যান্য কর্মচারীরা কিন্তু তাকে ছাড়ল না, পুজোর মধ্যেই মা কালীর সঙ্গে কথোপকথন নিয়ে তারা রামকে বিদ্রূপ করতে শুরু করলো। রাম নানা ভাবে তাদের এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলেও সারাক্ষণ তাকে নিয়ে হাসিঠাট্টা চলতে লাগল। ওরা বার বার রামকে জিজ্ঞাসা করতে লাগলো, ‘কি গো রাম, মা তোমাকে কি বললো? দু’জনে কী কথা হলো? ও ঠাকুর, বলো না... আমাদের খুব জানতে ইচ্ছা করছে।’
অনেক সহ্য করার পর রাম আর থাকতে পারল না। প্রচন্ড রেগে গিয়ে বললো, ‘মা কী বলেছে তোমরা সত্যিই শুনতে চাও? তাহলে শোনো... মা বলেছে, বাবুর যে ছেলের জন্য মানত পুজো হলো, মা খুব শিগগিরই তাকে খেয়ে নেবে।’
রামের কথা শুনে উপস্থিত সবাই চমকে উঠল। তাদের কেউ কেউ রামকে তেড়ে মারতেও এল। মানসিকভাবে আহত, অপমানিত রাম কাউকে কিছু না বলে নিজের ঘরে গিয়ে শুয়ে পড়ল।
পরের দিন দুপুরে হঠাৎ সকলে দেখল উকিলবাবুর ছেলেকে সবাই ধরাধরি করে নিয়ে আসছে। ছেলেটি অন্যদিনের মতো স্কুলে গিয়েছিল। ডাক্তার এসে জানাল ছেলেটি মারাত্মক এক ধরনের কলেরায় আক্রান্ত হয়েছে। সেদিন রাতেই ছেলেটি এই পৃথিবীর মায়া কাটিয়ে চলে গেল।
ছেলেটির মৃত্যুতে কোনরকম দায় না থাকলেও সেই রাতে উকিল বাবুর রাঁধুনিও কাউকে কিছু না জানিয়ে নিরুদ্দেশ হয়ে গেল।
যে রাঁধুনিই পরবর্তী কালে হয়ে উঠেছিলেন হাজার হাজার মানুষের ভরসা, শ্রদ্ধার ঠাকুর, প্রাণের ঠাকুর রাম ঠাকুর।
একবার রাম ঠাকুরের সঙ্গে সাক্ষাৎ করার জন্য কৈবল্যধামের মহন্ত মহারাজ শ্রী শ্যামাচরণ চট্টোপাধ্যায় কাশীধামে এসেছেন। কিন্তু ঠাকুর থাকেন কোথায়? কোথায় গেলে তাঁর চরণ স্পর্শ করে ধন্য হওয়া যাবে? ... ঠাকুরের সন্ধানে শ্যামাচরণ চট্টোপাধ্যায় কাশীর পথে পথে ঘুরছেন, কিন্তু সেখানকার সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে সাধক, সন্ন্যাসী, পূজারী— কেউই তাঁর প্রশ্নের কোনও সদুত্তর দিতে পারল না।
এমনটা যে হতে পারে, সেটা মহন্ত কল্পনাতেও ভাবেননি। দেশের আপামর সাধারণ মানুষ, তাবড় পণ্ডিত এবং নামজাদা সাধকরা যে মানুষটাকে নিয়ে উচ্ছ্বসিত, দেশের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষজন যাঁকে ঈশ্বরের অবতার ধরে নিয়েছে, সেই মানুষটা কোথায় থাকে, কেউ জানে না!
অনেক ঘোরাঘুরি করেও যখন ঠাকুরের ঠিকানা পাওয়া গেল না, তখন মহন্ত ঠিক করলেন তিনি বাড়ি ফিরে যাবেন। এ সময় হঠাৎই স্থানীয় এক পরিচিত ভদ্রলোক মহন্তকে বললেন যে, তিনি ঠাকুরের সন্ধান জানেন কিন্তু তিনি দেখা করবেন কি না, সেটা বলা শক্ত।
চূড়ান্ত হতাশ হয়ে যাওয়া মহন্তর কাছে এটাই অনেক বড়ো পাওয়া। কাল-বিলম্ব না করে ঠাকুর দর্শনের আশায় মহন্ত সেই ভদ্রলোকের সঙ্গে বেরিয়ে পড়লেন।
কাশীর জনবহুল এলাকা থেকে বেশ কিছুটা দূরে চারদিকে বাঁশের বেড়া দিয়ে ঘেরা একটা ছোট্ট ঘর। ভদ্রলোক মহন্তকে বললেন, ওই ঘরের মধ্যেই ঠাকুর আছেন। মহন্তর মনের মধ্যে তখন আনন্দের ঢেউ... মনে মনে ভাবছেন, যাক এতদূর থেকে এসে তাঁকে নিরাশ হয়ে ফিরে যেতে হবে না। বেড়ার দরজা ঠেলে পায়ে পায়ে সেই ছোট্ট ঘরের দরজার সামনে এসে দাঁড়ালেন শ্যামাচরণ। এর পর তিনি যা দেখলেন, তাতে মুহূর্তের মধ্যে তাঁর বাকশক্তি রহিত হয়ে গেল। দরজার সামনে নিশ্চল পাথরের মতো দাঁড়িয়ে রইলেন কৈবল্যধামের স্বনামধন্য মহন্ত শ্যামাচরণ চট্টোপাধ্যায়।
ঘরের মধ্যে ঠাকুর তখন ধ্যানমগ্ন। এক বিশালাকার সাপ সেই ধ্যানমগ্ন ঈশ্বরকে পেঁচিয়ে মাথার ওপর প্রকাণ্ড ফণা তুলে দাঁড়িয়ে রয়েছে।
মহন্ত কী বলবেন, বুঝে উঠতে না পেরে পায়ে পায়ে পিছিয়ে এলেন। সেই মুহূর্তেই ঠাকুরের চোখ খুলে গেল, তিনি যেন চোখ বন্ধ করেই মহন্তকে দেখছিলেন। ঠাকুর বললেন, ‘আপনার এখানে কী চাই? এক্ষুনি এখান থেকে চলে যান’। শ্যামাচরণ চমকে উঠে বললেন, ‘আপনাকে একবার দর্শন করার আশায় অনেক দূর থেকে আমি এখানে এসেছি ঠাকুর, কিন্তু আপনার দেহে ওই বিরাট সাপ দেখে আপনার কাছে যেতে পারিনি’।
মৃদু হেসে ঠাকুর বললেন, ‘ও আমার শুশ্রূষা করার জন্য এসেছে, আজ সকাল থেকে আমার শরীরটা ভালো নয়, জ্বর এসেছে। আমার জ্বর কমে গেলেই ও চলে যাবে’।
শ্যামাচরণ আর একটা শব্দ উচ্চারণ না করে, দরজা থেকেই ঠাকুরকে প্রণাম করে ফিরে গেলেন।
এ দেশের আধ্যাত্মিক জগতের বিস্ময়পুরুষ যোগীরাজ রামঠাকুর এ ভাবেই পৃথিবীর সব প্রাণীকে আপন করে নিতে পারতেন।
তাঁর কাছে সব জীবই হল ভগবানের সন্তান। তাই সকলের সঙ্গেই ছিল তাঁর আত্মিক যোগাযোগ।
মানুষের মধ্যেও তিনি কোনও ভেদ করতেন না, জাতপাতের সংকীর্ণ ভেদাভেদকে তিনি ঘৃণা করতেন, তাই আশ্রমের উৎসব অনুষ্ঠানে সব ধর্মের মানুষরাই স্বতস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করতে পারতেন।
সে বার তিনি ভক্ত-শিষ্যসহ তাঁর জন্মভূমি ডিঙামানিক গ্রামে এসেছেন। গ্রামের সাধারণ মানুষের ভিড়ে আশ্রম তখন জমজমাট। তাঁকে ঘিরে শুরু হয়েছে আনন্দ-সংকীর্তন। ঠাকুর দর্শনের আশায় দূর দূর থেকে মানুষ দলে দলে আসছেন। সেই দলে পাশের গাঁয়ের এক মুসলমান চেরাগ আলিও এসেছে, কিন্তু নাম সংকীর্তনের ভিড়ের মধ্যে না ঢুকে দূরে একটা পুকুর পাড়ে বসে মনে মনে ঠাকুরের নাম নিচ্ছে।
ঠাকুর তখন নাম সংকীর্তনের সুরের মধ্যে ডুবে আছেন, তাঁকে ঘিরে চারপাশে অজস্র ভক্তের ভিড়। হঠাৎ সবাইকে চমকে দিয়ে ঠাকুর চুপ করে গেলেন, তার পর চারপাশের ভক্তদের বললেন, ‘দূরে... ওই পুকুর পাড়ে চেরাগ আলি নামে আমার এক ভক্ত একা বসে আছে, ওকে এক্ষুনি এখানে নিয়ে এসো’।
ভক্তরা ছুটে গিয়ে চেরাগকে নিয়ে এল। সবাইকে অবাক করে ঠাকুর চেরাগকে বুকে জড়িয়ে ধরে বললেন, ‘আপনি আমার সঙ্গে দেখা করতে এসে আমার থেকে দূরে রয়েছেন কেন? আপনি তো আমার জন্মজন্মান্তরের আত্মীয়’।
চেরাগ আলির চোখ দিয়ে তখন ঝরঝর করে আনন্দাশ্রু ঝরে পড়ছে... আর প্রেমের ঠাকুর যোগীরাজ রামঠাকুরের গলায় তখন বিশ্বপ্রেমের সুর... যে সুরের খেয়ায় ভেসে গিয়েছে পৃথিবীর সকল জীব...... মানুষ, পশু, পাখি, কীট, পতঙ্গ... যারা সকলেই ভগবানের সন্তান।
(সংগ্রহীত )
ভারতের সাধক ও সাধিকা
============================
No comments:
Post a Comment