27>শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণকথামৃত"::---
"শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণকথামৃত" হল একটি বিখ্যাত বাংলা গ্রন্থ, যা উনিশ শতকের হিন্দু ধর্মগুরু শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংস দেবের উপদেশ ও কথোপকথনের সংকলন।
মহেন্দ্রনাথ গুপ্ত, যিনি "শ্রীম" নামে পরিচিত, এই গ্রন্থটি রচনা করেন।
এটি পাঁচটি খণ্ডে প্রকাশিত হয়েছে এবং বাংলা সাহিত্যের একটি বিশেষ ধর্ম গ্রন্থ
হিসেবে পরিচিত।
"কথামৃত" শব্দটি এসেছে "কথা" =বচন বা উক্তি থেকে এবং "অমৃত"= অর্থ মকরন্দ বা অমৃত থেকে, যা শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণে দেবের মুখ মুখনিঃসৃত বাণী যা অমৃতের মতো,পবিত্র সত্য। শ্রীম নিজে এই গ্রন্থটিকে "নবযুগের ভাগবত" হিসেবেও উল্লেখ করেছেন।
গ্রন্থটির মূল বিষয় হল শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসের ধর্মীয় চিন্তা, আধ্যাত্মিক উপলব্ধি এবং ভক্তদের সঙ্গে তার কথোপকথন। এতে শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণের বিভিন্ন লীলা, যেমন - দক্ষিণেশ্বরে অবস্থান, ভক্ত সকলেরসঙ্গে কথোপকথন, এবং বিভিন্ন ধর্মমতের প্রতি তার দৃষ্টিভঙ্গি বর্ণিত হয়েছে। এটি কেবল একটি ধর্মগ্রন্থ নয়, বরং একটি সামাজিক দলিলও, যা উনিশ শতকের বাংলার সমাজ ও সংস্কৃতির চিত্রও তুলে ধরে।
কথামৃতের পাঁচটি খণ্ড: প্রথম খণ্ড (১৯০২), দ্বিতীয় খণ্ড (১৯০৪), তৃতীয় খণ্ড (১৯০৮), চতুর্থ খণ্ড (১৯১০), পঞ্চম খণ্ড (১৯৩২). সালে প্রকাশিত হয়।
এই গ্রন্থটি বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির এক অমূল্য সম্পদ, যা শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ দেবের দর্শন ও শিক্ষাকে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বাঁচিয়ে রেখেছে।
====================
'কথামৃতে"র পরিচয় দিতে গিয়ে 'কথামৃতকার' শ্রীম, মহেন্দ্রনাথ গুপ্ত, তথা মাস্টারমশাই, ভাগবতের একটি শ্লোকের উদ্ধৃতি দিয়েছেন। শ্লোকটি হ'লঃ--
"তব কথামৃতং তপ্তজীবনং কবিভিরীড়িতং কল্মষাপহম্।"
"শ্রবণমঙ্গলং শ্রীমদাততং ভুবি গৃণন্তি যে ভূরিদা জনাঃ।।" ১০।৩১।৯
অর্থাৎ --তোমার এই যে কথারূপ অমৃত, কি রকম ? না, 'তপ্তজীবনম্' ---- সংসারতাপে তপ্ত যে মানুষ, মৃতপ্রায় দগ্ধ যে মানুষ, পুড়ে মরছে যে মানুষ, তার কাছে জলস্বরূপ। তার সমস্ত যন্ত্রণার অবসান করে---তাকে জন্ম-মৃত্যুর হাত থেকে, সংসারচক্র থেকে বাঁচায় এই কথারূপ অমৃত।
তারপর বলছেন 'কবিভিরীড়িতম্'। কবি অর্থাৎ জ্ঞানী যাঁরা, শাস্ত্রমর্ম যাঁরা জানেন, তাঁরা এই 'কথামৃতে'র প্রশংসা করেন। তাঁরা সর্বদা এই 'কথামৃতে'র স্তুতি করেন এই ব'লে যে, এই 'কথামৃত' মানুষকে মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচায়----মানুষ যে মরণশীল নয়, এই জ্ঞান দেয়।
আরও এই 'কথামৃত' কিরূপ ? না, 'কল্মষাপহম্'। ---আমাদের সমস্ত কল্মষ, পাপ, কলুষ, কালিমা এই 'কথামৃত' দূর ক'রে দেয়। সংসারে আমরা অনেক কালি মেখেছি, কারও গায়ে যে কালি লাগেনি, এমন কথা কেউ জোর ক'রে বলতে পারে না। এই কালিমা থেকে মুক্ত হবার উপায় কি ? হয়তো অনেকের মনে অনুতাপ আসে যে, এই কালিমা থেকে মুক্তির আর কোন পথ নেই। তাই বলছেন, না, উপায় আছে----এই 'কথামৃত' 'কল্মষাপহম্'।
শুধু তাই নয়, পুরাণে বলে, অমৃত পান করেই অমরত্ব লাভ হয়। এ-অমৃত কিন্তু পানও করতে হয় না, কেবল মাত্র শুনেই জীবের কল্যাণ হয়----'শ্রবণমঙ্গলম্'। তারপর যদি মনে হয়----আচ্ছা, শ্রবণেতে কল্যাণ হোক, কিন্তু আমার রুচি হবে কি না ?
তার উত্তরে বলছেন 'শ্রীমদ্' ----সৌন্দর্যবিশিষ্ট, এ-কথার ভিতরে এমন সুষমা আছে যে, মানুষকে অনায়াসে আকর্ষণ করে, স্বাভাবিকভাবে। আর, এই 'কথামৃত' এতটুকু নয় যে ফুরিয়ে যাবে।
তাই বলছেন, 'আততম্'----বিস্তৃত। বিস্তৃত বলতে অপার এবং সহজলভ্য। যেমন আকাশ চারাদিকে বিস্তৃত থাকে, তাকে খুঁজে বার করতে হয় না, যেমন বায়ু চারাদিকে পরিব্যাপ্ত থাকে, তাকে অন্বেষণ ক'রে আবিষ্কার করতে হয় না, সেই রকম এই কথারূপ অমৃত অপার এবং অনায়াসলভ্য।
এই 'কথামৃত' তা হ'লে আমরা সকলে পান করি না কেন ? তার উত্তরে বলছেন, 'ভুবি গৃণন্তি যে ভূরিদা জনাঃ'----যারা বহু দান করেছে অর্থাৎ বহু সুকৃতি সঞ্চয় করেছে, তাদের এই কথারূপ অমৃতে স্বাভাবিক রুচি হয়----তারাই এর স্তুতি করে, কীর্তন করে, আলোচনা করে। রুচি কারো হয়, কারো হয় না। তার কারণ----পূর্বজন্মকৃত কর্ম। পূর্ব পূর্ব জন্মের সঞ্চিত অনেক সুকৃতি যদি থাকে, তা হ'লে মানুষ আবাল্য এই রুচি নিয়ে জন্মায়। সহজাত হয় তার এই রুচি। সুকৃতি যদি কম থাকে, তা হ'লে হয়তো আঘাত পেয়ে তারপরে এই কথায় রুচি হয়।
এই রকম বিভিন্ন স্তরের মানুষ আছে। কিন্তু সকলেরই জন্য এই 'কথামৃত' কল্যাণকর এবং এই কথামৃতের অনুশীলন করতে যে একটা খুব কষ্ট হবে তা নয়। রুচি থাকলেই এতে আনন্দ পাবে সকলে।
- স্বামী ভূতেশানন্দ
======================
যিনি শ্রীরামচন্দ্ররূপে জগতের কল্যাণের জন্য সকলকে উপদেশ দিয়েছেন , তিনিই আবার শ্রীকৃষ্ণরূপে নানাভাবে উপদেশ দিয়েছেন, তিনিই আবার শ্রীরামকৃষ্ণরূপে সকলের সহজবোধ্য হয় এমন করে এই কথামৃত বলেছেন
=========================
No comments:
Post a Comment