40>"ভাঙতে নয়, গড়তে আসা"-(সংগ্রহীত).
আজ 19/02/2026 বৃহস্পতিবার
শ্রী শ্রী রামকৃষ্ণ প্ৰরমহংস দেবের 191 তম জন্ম তিথি। (সংগ্রহীত)
"ভাঙতে নয়, গড়তে আসা"
আনন্দ বাজার পত্রিকা----
একুশ শতকের সমাজ, দেশ ও বিশ্বে এক অসংহতির বাতাবরণ। ধর্মান্ধতা নিয়ে এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে, যা অতিমারির চেয়েও ভয়ঙ্কর। এমন বিপর্যস্ত অবস্থায় শ্রীরামকৃষ্ণের সমন্বয়ী ভাবনা আরও বেশি শিক্ষণীয় ও গ্রহণীয়; তাঁর মত ও পথ যাবতীয় জটিলতা প্রতিবন্ধকতা সরিয়ে আলো দেখাতে পারে। কারণ তিনি শুধু সব ধর্মেরই নয়, সমস্ত রকম ভাবেরও সমন্বয়ের পক্ষে। বিভেদ নয়, ঐক্যই যে বেঁচে থাকার মূল সোপান- বুঝিয়েছেন।
জীবন ও সাধনার প্রতি স্তরে তাঁর কাছে গুরুত্বপূর্ণ ছিল মানুষ। ভক্ত দর্শনার্থীদের তাঁর সহজ-সরল ভাষায় বলতেন, "মানুষ কি কম গা? সে যে ঈশ্বরচিন্তা করতে পারে।" মানুষই পারে অসীম অনন্ত সত্তাকে অনুভব করতে; ঈশ্বর মানে সেই অশেষ সম্ভাবনা, যা সর্বার্থে মানুষের শুভ মঙ্গলানুভূতিকেই মনে করায়। প্রতিটি মানুষের মধ্যেই সেই অনন্ত সত্তা ও সম্ভাবনা রয়েছে। জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে এই মানবতার উত্তরণই আধ্যাত্মিকতা, আসল ধর্ম।
প্রিয় শিষ্য নরেন্দ্রনাথ নির্বিকল্প সমাধিতে মগ্ন হতে চান, আর পাঁচ জন শুরু হলে খুশি হতেন। শ্রীরামকৃষ্ণ কিন্তু দুঃখিত: ভেবেছিলাম তুই একটা বটবৃক্ষ হবি। আত্মকেন্দ্রিক মনোভাব ছাড়িয়ে ভবিষ্যতের বিবেকানন্দকে এগিয়ে দিলেন কর্মের পথে। আমরাও পেলাম লোকহিতার্থে আত্মনিবেদনের শিক্ষা, 'বহুজনহিতায়, বহুজনসুখায়'। অনেকের মতো সন্ন্যাসের বাসনায় যখন গিরিশ ঘোষও শ্রীরামকৃষ্ণের কাছে আবেদন করছেন, তিনি তাঁকেও বলেছেন নিজের পথে থাকতে নাটকে যে লোকশিক্ষা হয়া এখানেও দেখি তাঁর মানবপ্রেম, বৃহৎ কল্যাণের জন্য ক্ষুদ্র স্বার্থ পরিহার করে কর্ম-পরিকল্পনা শুভের উদ্বোধনে প্রকৃত যা-যা করা দরকার, করতে হবে।
তাঁর মনুষ্যত্ব-ধর্মের মূল কথাই হচ্ছে লোকহিতার্থে কর্মের সাধনা। এতে হৃদয় প্রসারিত হয়, সেবার বোধ জাগ্রত হয় সর্বোচ্চ ও গভীরতম স্তর পর্যন্ত। অদ্বৈত দর্শনের এক আধুনিক ব্যাখ্যা পাই তাঁর জীবন ও বাণীতে; মানুষের মধ্যে পদে পদে যে অনৈক্য ও বিভাজন, তার নিরসনে এই ভাবনা আমাদের দিশারি হতে পারে। 'অদ্বৈতজ্ঞান আঁচলে বেঁধে যা ইচ্ছা তা-ই করো', শ্রীরামকৃষ্ণের এই কথাটি একুশ শতকে সমাজকল্যাণের বিকাশেও আমাদের অবলম্বন। কেউই পর নয়, অপরও নয়, সবাই আপন, সবাই আমি- এই বোধের জাগরণ হলে আর কোনও বিভেদ থাকে না। কর্ম তখন সেবায়, পূজায় রূপান্তরিত হয়। শ্রীরামকৃষ্ণ মানুষের মধ্যে এই চৈতন্যের জাগরণ ঘটাতে চেয়েছিলেন।
আশ্চর্য লাগে যখন দেখি, এই সবই তিনি বলে গেছেন আজ থেকে প্রায় দেড়শো বছরেরও বেশি আগে। উনিশ শতকের মধ্যভাগে তাঁর অনতিদীর্ঘ জীবন (১৮৩৬-১৮৮৬), বাঙালি তথা ভারতীয় সমাজ তখন ভিতরে-বাইরে নানা সমস্যায় জর্জরিত। এক দিকে জাতি-বর্ণ নিয়ে ভেদাভেদে সামাজিক জীবন বিষময়, অন্য দিকে বিদেশি শাসনে পর্যুদস্ত। পশ্চিমি শিক্ষার আলো এসেছে, তবে অন্ধকারও রয়ে গেছে অনেকটাই। রাজা রামমোহন রায়, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর প্রমুখ মনীষী আপ্রাণ চেষ্টা করেছেন অশিক্ষা, কুসংস্কার, জাতিদস্ত দূর করে মানুষকে ক্ষুদ্র থেকে বৃহতের পথে এগিয়ে দিতে। এই রকম সময়েই শ্রীরামকৃষ্ণও এসে বললেন, সব ধর্মের সারকথাটি এক: সেই এক-ই বহু হয়েছেন। এই ভাবটি সমন্বয়ের: ভাঙার নয়, গড়ার। তাঁর আহ্বান সব অবস্থানের মানুষকে কাছে টানল- কেশবচন্দ্র সেনও তাঁর কাছে আসেন, বিনোদিনী দাসীও তাঁর আশীর্বাদধন্য।
মানুষকে আপন করার এই শক্তি, অপাঙ্ক্তেয়কেও সমান মান দেওয়া-শ্রীরামকৃষ্ণের এই 'সমাজসংস্কার'-এর ভূমিকাটি নিয়ে আমরা বড় একটা কথা বলি না। উনিশ শতকের সমাজ-ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে তাঁর এই জনহিতের দর্শনকে বিশ্লেষণ করা দরকার। রাজনীতি, সমাজ ও দর্শনের নানান তত্ত্বে 'মানুষ' আর 'ধর্ম'কে শুধু পৃথক করেই নয়, দুই বিপরীত মেরুতে রেখে বিবেচনা করা হয়। শ্রীরামকৃষ্ণের দর্শন বলে, এই দুই পরস্পরের সম্পূরক, আর দুইয়ে মিলে আবার নতুন এক পথের সন্ধান মেলে: অনন্ত পথ, অনন্ত মত।
শ্রীরামকৃষ্ণের এই শাশ্বত প্রেমের আদর্শ রবীন্দ্রনাথকেও আকর্ষণ করেছিল। তিনি বলেছিলেন, 'পরমহংসদেব'কে তিনি ভক্তি করেন, কারণ ধর্মনৈতিক ধ্বংসবাদের যুগে তিনি আমাদের আধ্যাত্মিক সম্পদ ও তার সত্যতা উপলব্ধি করেছিলেন। শ্রীরামকৃষ্ণের সরল অনাড়ম্বর জীবনযাত্রাও সকলের বিস্ময়ের উদ্রেক করত। মালঞ্চ উপন্যাসে অসুস্থ নীরজার শয়নকক্ষে তার মাথার উপরের দেওয়ালে শ্রীরামকৃষ্ণের ছবিকে স্থান দিয়েছেন লেখক রবীন্দ্রনাথ, অসুস্থ নায়িকার মন প্রাণ সর্বস্ব যেন সেই ছবিতে সমর্পিত। রবীন্দ্রনাথেরই রাজা নাটকে দেখি, নানা দেশ থেকে আসা রাজারা এসে লক্ষ করছেন, এখানে পৌঁছনোর নির্দিষ্ট কোনও একটি পথ নেই। তাঁরা নিজেদের মধ্যে আলোচনা করছেন, যে পথ দিয়েই আসা হোক না কেন, শেষ পর্যন্ত এক গন্তব্যেই পৌঁছনো যাবে। এও যেন শ্রীরামকৃষ্ণের বাণীরই বহিঃপ্রকাশ।
=====================
দার্শনিক সন্ধিক্ষণ
অসিতবরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রবন্ধ 'ভাঙতে নয়, গড়তে আসা' (১৯-২) শ্রীরামকৃষ্ণকে নতুন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখার সুযোগ করে দেয়, এক জন ধর্মসাধক হিসেবে নয় শুধু, বরং সমাজমননের নির্মাতা রূপে। উনবিংশ শতাব্দীর বঙ্গসমাজ' ছিল আত্মপরিচয়ের সন্ধিক্ষণে। এক দিকে ঔপনিবেশিক আধুনিকতা, অন্য দিকে কুসংস্কার ও ধর্মীয় সঙ্কীর্ণতা-সমাজ বিভক্ত, আত্মবিশ্বাস ক্ষীণ। এই প্রেক্ষাপটে শ্রীরামকৃষ্ণের আবির্ভাব কেবল ধর্মীয় ঘটনা নয়, ছিল এক গভীর দার্শনিক সন্ধিক্ষণ।
তিনি মতের বিরোধে নয়, সত্যের ঐক্যে বিশ্বাসী। তাঁর উপলব্ধি 'যত মত, তত পথ' আসলে বহুত্ববাদী মানবতাবাদের এক মৌলিক ঘোষণা।
★শ্রীরামকৃষ্ণের দর্শনের কেন্দ্রে ছিল 'অভিজ্ঞতা'; তিনি তত্ত্বকে জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন করেননি। হিন্দু, ইসলাম, খ্রিস্ট ধর্ম, বিভিন্ন সাধনপথ অনুশীলন করে তিনি দেখিয়েছিলেন, ধর্ম বিভাজনের কারণ নয়, আত্মোপলব্ধির বিভিন্ন ভাষা।
★এই দৃষ্টিভঙ্গি পরবর্তী কালে স্বামী বিবেকানন্দের মাধ্যমে বিশ্বমঞ্চে উচ্চারিত হয়; শিকাগোর ধর্মমহাসভায় তাঁর বক্তব্য বহুত্বের দর্শনকে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি দেয় এবং ভারতীয় আত্মবিশ্বাসকে পুনরুজ্জীবিত করে।
★সমাজগঠনের ক্ষেত্রে শ্রীরামকৃষ্ণের প্রভাব আপাতদৃষ্টিতে পরোক্ষ হলেও গভীর ছিল।
তিনি সরাসরি প্রতিষ্ঠান-নির্মাতা না হলেও, তাঁর জীবনাদর্শ থেকেই গড়ে ওঠে রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশনের মতো সংগঠন, যা শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও মানবসেবায় আধুনিক ভারতে এক নীরব বিপ্লব ঘটায়। 'জীবে দয়া' তাঁর কাছে তাত্ত্বিক উচ্চারণ নয়, আধ্যাত্মিক অনুশাসন- এখানেই মানবধর্ম শিক্ষার নৈতিক ভিত শক্ত হয়।
শ্রীরামকৃষ্ণের দর্শনকে যদি আমরা রামমোহন রায়ের যুক্তিবাদ, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের মানবিক সংস্কার ও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিশ্বমানবতার সঙ্গে তুলনা করি, তবে দেখা যায়- সবার লক্ষ্য ছিল মানুষকে বৃহত্তর চেতনার দিকে উত্তরণ; পার্থক্য ছিল পদ্ধতিতে।
★★শ্রীরামকৃষ্ণ সেই উত্তরণের আধ্যাত্মিক ভিত্তি নির্মাণ করেছিলেন। এই বিভক্ত ও উত্তেজিত সময়ে তাঁর দর্শন আরও প্রাসঙ্গিক, কারণ তিনি শিখিয়েছিলেন মতভেদকে শত্রুতা নয়, অভিজ্ঞতার বৈচিত্র হিসেবে দেখতে। শিক্ষা যদি কেবল তথ্য সঞ্চয় না-হয়ে চরিত্রগঠন ও সহমর্মিতার চর্চা হয়, তবে সমাজগঠনের প্রকৃত শক্তি সেখানেই নিহিত। তিনি আমাদের মনে করিয়ে দেন, সভ্যতার অগ্রগতি বাহ্যিক উন্নতিতে নয়, অন্তরের প্রসারে। শ্রীরামকৃষ্ণ ছিলেন সমাজমননের এক নির্মাতা, এসেছিলেন মানুষের তা অন্তরের মানুষকে জাগাতে।
অলোক কুমার মুখোপাধ্যায় সোদপুর, উত্তর ২৪ পরগনা
================
তাঁরই প্রভাবে
অসিতবরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের 'ভাঙতে নয়, গড়তে আসা' প্রবন্ধ প্রসঙ্গে কিছু কথা। জটিল দার্শনিক তত্ত্বের অনুধাবন না করেও, সরল বিশ্বাস, ভক্তি ও নিখাদ প্রেমের মাধ্যমে পরমেশ্বর বা পরম সত্যকে পাওয়া সম্ভব- এই ছিল শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের মূল বাণী। তাঁর সর্বজনবিদিত উক্তি, 'টাকা মাটি, মাটি টাকা' অর্থাৎ পার্থিব ধনসম্পদ ও মাটির মধ্যে কোনও মৌলিক তফাত নেই। অর্থ যেন লালসা বা অনর্থের উৎস না-হয়ে ওঠে, এই ছিল জনসাধারণের প্রতি তাঁর সতর্কবার্তা।
রামকৃষ্ণদেবের প্রভাব রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ছাড়াও সমসাময়িক ও পরবর্তী কালের বহু লেখকের রচনায় ধরা পড়েছে। দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের লেখায় প্রায় সর্বত্রই 'যত মত, তত পথ' দর্শনের মানবিক দিকটি লক্ষ করা যায়। তাঁর সাহিত্য ও নাটকে বাংলার ধর্মীয় পুনর্জাগরণ এবং ধর্মের উদার দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন স্পষ্ট।
মোহিতলাল মজুমদার তাঁর বিবিধকথা গ্রন্থে রামকৃষ্ণের আধ্যাত্মিকতা ও জাতীয় চেতনার দিকটি উন্মোচিত করেছেন। পরবর্তী কালে কাজী নজরুল ইসলাম রামকৃষ্ণের ভাবধারায় উদ্বুদ্ধ হয়ে হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের সেতুবন্ধনে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখেন।
তা ছাড়া শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের অন্নদাদিদি-সহ একাধিক নারীচরিত্রে নিঃস্বার্থ জীবনচর্চার যে পরিচয় মেলে, তা 'শিবজ্ঞানে জীবসেবা'-র আদর্শেরই এক সাহিত্যিক প্রতিফলন। তাঁর রচনায় রামকৃষ্ণ-বর্ণিত মাতৃভাব ও ত্যাগের মহিমা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ভাবে প্রকাশ পেয়েছে। ঠাকুরের মতে, 'আমি' বলে কোনও সত্তা নেই। যেমন পেঁয়াজের খোসা ছাড়াতে ছাড়াতে শেষে আর কিছু অবশিষ্ট থাকে না, তেমনই আত্ম-অনুসন্ধানে 'আমি' ক্রমশ বিলীন হয়ে যায়; শেষ পর্যন্ত যা থাকে, তা আত্মা বা চৈতন্য। অথচ মানুষ সেই 'আমি'-র আমিত্ব খুঁজতে গিয়ে ভ্রমের শিকার হয়। এই অবিদ্যা থেকেই জন্ম নেয় নীচতা, কুসংস্কার, হিংসা, বিবাদ ও লোভ। মানুষ তখন গড়ার কথা ভুলে গিয়ে কেবল ভাঙতেই থাকে।
গীতিকা কোলে
No comments:
Post a Comment