Thursday, November 21, 2024

24>|| মুখমণ্ডলে দীপ্তির প্রকাশ ||

    24>|| মুখমণ্ডলে দীপ্তির প্রকাশ ||


মঠ মিশনের  মহারাজদের মুখন্ডল দেখলেই মনে হয় যেন জ্যোতি ঠিকরে পড়ছে।

সত্যি বলছি দেখেছিস প্রত্যেক মহারাজের কি গ্ল্যামার ! দেখলেই ভক্তি করতে ইচ্চা করে। সদা হাস্য মুখ , কথা বার্তা তে যেন মুক্তা ঝরে।



প্রশ্ন এসে যায়, বেশিরভাগ রামকৃষ্ণ মিশনের মহারাজদের মুখমণ্ডল কেন এত জ্যোতির্ময় হয় ? সে বিষয়ে আলোচনা প্রসঙ্গে মহারাজ শোনাচ্ছিলেন এক মা এবং তার যুবক ছেলের গল্প, যারা মনে করেন ফ্রিতে দুধ আর ফল পেলে মুখের গ্ল্যামার ধরে রাখা যায়।


স্বামী অন্নপূর্ণানন্দ বললেন – “ সেই ছোকরাকে বললাম, আয় তোকে ফ্রিতে দুধ আর ফল খাওয়াবো, রামকৃষ্ণ মিশনে থাকবি আয় ।“


সে শুনে মা ছেলে পেছন ঘুরে দৌড়।

আমরা সকলেই হেসে উঠলাম, আর যাই হোক ঘর সংসার ছেড়ে মহারাজ চাট্টিখানি কথা নয়।

ব্যাপারটা আপাতদৃষ্টিতে হাস্যাস্পদ শোনালেও প্রশ্নটা থেকেই যায়, মহারাজদের জ্যোতির রহস্য কি ?


এই জ্যোতি বেলুড় মঠের বিদ্যামন্দিরেও চোখে পড়েছে। মাইন্ডস্ট্রোলজি এবং রামকৃষ্ণ মিশন বিদ্যামন্দির আয়োজিত ডিজিটাল মিডিয়া কোর্সের জন্য বেশ কয়েকবার বেলুড় মঠ যেতে হয়েছে।এখানে প্রত্যক্ষ করেছি তাদের মুখমণ্ডলের জ্যোতি, চির যৌবনের তেজ এবং দীপ্তি। বিশেষত দেবর্ষি মহারাজের কথা না বললেই নয় । তাদের কর্মব্যস্ততা দেখে কখনোই মনে হয়নি যে কর্পোরেট লিডারদের চেয়ে কোন অংশে তারা কম কাজ করেন কিংবা তাদের কাজের চাপ কম। তাদের খাদ্যাভ্যাস অত্যন্ত সাধারণ এবং সীমিত।

তাহলে কি সংযত আহারই আমাদের শরীরে দীপ্তি আনে? নাকি সাংসারিক টানা পড়েন আমাদের আপাত বার্ধক্যের দিকে নিয়ে যায়? দুশ্চিন্তার ভাঁজ কি আমাদের কপালে বলিরেখা তৈরি করে ?

এগুলোর কোন বাক্যই অস্বীকার করা যায় না, তথাপি জ্যোতি রহস্য নিরুত্তর থেকে যায়।

আর এই সুযোগে ফেয়ার এন্ড লাভলীর বিজ্ঞাপন আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে।ল্যাকমি প্রোডাক্ট আসে প্রত্যেক ঘরে ঘরে ।সেই আপাত উজ্জ্বল্যকে উপেক্ষা করে কিছুদিনের মধ্যেই প্রকৃত স্বরূপের বহিঃপ্রকাশ হয়।


★★★

অর্থাৎ বাহ্যিকভাবে আমরা যতই চেষ্টা করি , শারীরিক উজ্জ্বল্য পেতে অভ্যন্তরীণ বিকাশ অপরিহার্য। মানসিক বিকাশ, অবচেতনের সেই স্তর করায়ত্ব না হলে সেই জ্যোতির প্রকাশ ঘটে না।

অভ্যন্তরীণ বিকাশের যে দশটি গুণ বারংবার সাক্ষাতে আমি মহারাজের মধ্যে প্রত্যক্ষ করেছি, তা সংক্ষেপে লিপিবদ্ধ করলাম।


১) এক কাজ থেকে অন্য কাজে যাওয়াই বিশ্রাম। নিজেকে ব্যস্ত রাখা এবং নিজের মন যা চায় সে নিয়ে আমৃত্যু কাজ করাই জীবনের সুখী হওয়ার মন্ত্র। মনে রাখবেন, অলস মস্তিষ্ক আসলে শয়তানের কারখানা।


২)সারল্য - কোন ছেলের সঙ্গে কেবলমাত্র স্নেহ বাৎসল্য নয়, শিশুদের মত সরলতা নিয়ে মিশে যাওয়া এক বিশাল বড় গুণ। মনে রাখবেন জটিলতা অনেক সময় সীমাবদ্ধতা তৈরি করে, যেটাকে অবচেতনের ভাষায় বলে মেন্টাল ব্লক, আর সারল্য ধারণ করে অনেক ক্ষমতা, অসীমকে জয় করার দুঃসাহস।জীবন হয়ে ওঠে আনন্দময়।


৩) অন্যের জন্য কাজ করাতেই সবচেয়ে বড় সুখ। আপনি যতই নিজের ব্যাপারে ভাববেন, ততই মায়া জালে জড়িয়ে যাবেন। অন্যের থেকে আশা আপনাকে কষ্ট দেয়, অন্যকে সাহায্য করা আপনাকে আনন্দ দেয়। আমরা বাস্তবে ঠিক উল্টোটি করি।


৪) জীবনের বেশিরভাগ সুখী হওয়ার উপাদান ফ্রি। মুক্ত মনে হাসা, অন্যকে ভালোবাসা, প্রকৃতির মধ্যে থাকা, অন্যকে ভাল রাখা, সবই বিনামূল্যে করা যায়। তাই আপনার সুখী হওয়ার জন্য অর্থ লাগেনা।


৫) নিরন্তর শিখে যাও। শিক্ষার চর্চা, আমাদের ব্রেনকে অবচেতনের নতুন স্তরে উন্নীত করে। প্রত্যেকটি মহারাজ দিনে কোন না কোন সময় পঠন পাঠন নিয়ে ব্যস্ত থাকেন।


৬) ধ্যান বা সূর্য প্রণাম - মনকে স্থির করতে, কিংবা নিজের অবচেতনকে সংযত রাখতে এর চেয়ে বড় শক্তি নেই। বেলুড় মঠে ঘন্টার পর ঘন্টা আরতি প্রকারান্তরে একটা ধ্যানেরই রূপক।


৭) সর্বদা ইতিবাচক - এটি একটি বিশাল বড় গুন।এই পৃথিবীতে খুব কম লোকের মধ্যে এই গুনটি দেখেছি। আমাদের চিন্তার শতকরা ৭৮ ভাগ নেতিবাচক। রাজ্য এবং কেন্দ্র সরকার রামকৃষ্ণ মিশনের ডোনেশন অনেকাংশে কম করেছে, অথচ হা হুতাশ না করে, বিকল্প সমাধানের পথ খুঁজতে মহারাজরা বদ্ধপরিকর।


৮) অহেতুক পারস্পরিক তুলনা আমাদেরকে নেতিবাচক চিন্তায় নিয়ে যায়, এটা মহারাজদের কোনদিন করতে দেখিনি।


৯) কৃতজ্ঞতা - ওনারা যার যার প্রতি কৃতজ্ঞ , উন্মুক্তচিত্তে স্বীকার করেন। কৃতজ্ঞতার চেয়ে বড় থেরাপি এই মহাবিশ্বে দ্বিতীয়টি নেই I  সদ্য তৈরি হওয়া নিউটাউনের বিবেক তীর্থের জন্য শ্রী দেবাশীষ সেন এবং HIDCOর প্রতি তারা অসীম কৃতজ্ঞ I ধন্যবাদ জ্ঞাপনে  কখনো পিছপা হতে দেখিনি মহারাজদের । স্বয়ং শ্রী রামকৃষ্ণ বলেছেন -  "মন কে শান্ত করতে হলে, তোমার কাছে যা আছে তার জন্য ঈশ্বর কে মন থেকে ধন্যবাদ জানাও, তার সাথে প্রেমের বন্ধন তৈরি কর দেখবে মনের অশান্তি কোথায় হারিয়ে গেছে।" 


১০) আপনি আপনার চিন্তার মতন বড়। আপনি এই বিশ্বকে যত ভালো ভাবেন, আপনার মস্তিষ্ক ততখানি উন্নত । মুখমণ্ডল কেবল তার বহিঃপ্রকাশ। কারো প্রতি ঘৃণা নয়, কেবল ভালোবাসা, কারো কাছে ঠকে যাওয়ার ভয় নয়, তাকে অকৃত্রিমভাবে সাহায্য করা, অমলিন চিত্তে ঠাকুর আর  স্বামীজীর প্রার্থনা করা, তাদের বাণী বারংবার উচ্চারিত করলে অবচেতন ঐশ্বরিক মন্ত্রে দীক্ষিত হয়, তার দীপ্তি মুখমণ্ডলে প্রকাশ পায়।


মহারাজদের জীবন প্রমাণ করে মানব জীবন আনন্দময়।

নিরলস শ্রম, অকৃত্রিম জীবে প্রেম, অদ্বৈত রামকৃষ্ণ বিবেকানন্দ সাধনা, অকুণ্ঠ জ্ঞানপিপাসা, সর্বদাই পৃথিবীকে বাসযোগ্য ভাবা, হাস্যকৌতুক এবং আনন্দের মধ্যে দিয়ে জীবনের রস গুলোকে উপভোগ করা। আর যখন কঠিন পরিস্থিতি আসবে  সুচিন্তার মাধ্যমে নেতিবাচক শক্তিদের পরাস্ত করে  আপনিও জ্যোতির্ময় হবেন। 


সৌজন্যে : মাইন্ডস্ট্রোলজি


Collected From Swami Sarvapriyananda Maharaj speech

                (সংগৃহীত)

============================

No comments:

Post a Comment