Saturday, November 15, 2025

35>|| আমাদের শ্রীশ্রীমা ||স্বামী গৌতমানন্দ

 

   35>|| আমাদের শ্রীশ্রীমা ||স্বামী গৌতমানন্দ।
পৃষ্ঠা::----199
শ্রীশ্রীমা স্বয়ং শব্দব্রহ্ম: ব্রহ্মাণ্ডপ্রসবিনী। অথচ সাধারণ মহিলার মতো কঠোর পরিশ্রম করতেন এবং বলতেন, "ঠাকুরের কাজ করবে, আর সাধন-ভজনও করবে: কিছু কিছু কাজ করলে মনে বাজে চিন্তা আসে না। একাকী বসে থাকলে অনেকরকম চিন্তা আসতে পারে।” ভোর তিনটে থেকে শ্রীশ্রীমায়ের দিন শুরু হত। গঙ্গাস্নান করে জপধ্যান করতেন। মায়ের বিন্দুমাত্রও অবসর ছিল না। সর্বদাই তাঁর মন ঈশ্বরচিন্তায় ডুবে থাকত। তবুও অন্যান্যদের কাছে উদাহরণস্বরূপ একটি আদর্শ প্রতিস্থাপন করতে তিনি বলতেন, এক মুহূর্তও কাজ ছেড়ে থাকতে নেই, কারণ অলস মনে যত কুচিন্তার উদয় হয়। শ্রীশ্রীমা খুব ভাল রাঁধতে পারতেন। পান সাজা, মা কালীর মালা গাঁথা সব কাজই অতি অনায়াসে সুচারুভাবে করতেন।
সকলের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের প্রতি মায়ের সযত্ন দৃষ্টি ছিল তাঁর শাশুড়ি-মা, শ্রীরামকৃষ্ণ এবং আগত ভক্তশিষ্য সবার ওপর। তিনি খুব ভাল সাঁতার জানতেন, জলে তাঁর যেমন ভয় ছিল না, তেমনই সংসারে কেউ হাবুডুবু খাক তাও মা চাইতেন না। পড়তে-লিখতে শিখেছিলেন; যখন অধিকাংশ মেয়েই লেখাপড়া জানতেন না। শ্রীশ্রীমা তাদের জন্যও একটি অনুসরণীয় আদর্শ স্থাপন করেছিলেন। খুব সুন্দর গানও গাইতেন; একদিন একটু জোরে গান গাওয়ায় শ্রীরামকৃষ্ণ শুনতে পেয়ে বলেছিলেন, "তুমি তো বেশ গাও। তা বেশি উঁচু গলায় গেও না, আপনমনে নিজেকে শোনাবার জপধ্যান ও প্রার্থনায় তিনি ছিলেন অদ্বিতীয়। সব মতো গুনগুন করে গাইবে।" আর অবশ্যই মেয়ের কর্তব্য এগুলি শিক্ষা করা, বিশেষ করে পবিত্রতা, সহানুভূতি, সুরক্ষা, আত্মশক্তি, সেবা, জপ, ধ্যান প্রভৃতির অনুশীলন। নারীদের উচিত নিজেদের দৈহিক দিক থেকে সক্ষম রাখা। শ্রীশ্রীমা পঞ্চাশ পেরিয়েও একাই আট কিলো আটা ঠেসে রুটি গড়তে পারতেন। তিনি বলতেন, ছেলেমেয়েদের ইংরেজি শেখা উচিত, কারণ ভবিষ্যতে দেশ-বিদেশ থেকে ঠাকুরের কত শিষ্য আসবে, তাদেরকে শ্রীরামকৃষ্ণের কথা, কামারপুকুর, জয়রামবাটা, বেলুড় মঠ প্রভৃতি স্থানের পবিত্রতা ও মাহাত্ম্যের কথা, আমাদের সংস্কৃতি, দর্শন সব ব্যাখ্যা করে বলতে হবে। এটি তাঁর দূরদর্শিতার এক উল্লেখযোগ্য নিদর্শন। এসব কথা মা বলেছেন ১৯১০-১১ সালে। আর এখন সেসমস্ত সত্যিই ঘটছে। স্বামীজীও নিজের মাতৃভাষা, ও সংস্কৃত ভাষা চর্চার সঙ্গে সঙ্গে ইংরেজি শেখার উপরও জোর দিতেন, যেহেতু ইংরেজি আন্তর্জাতিক ভাষা।
শ্রীশ্রীমা নারী-স্বাধীনতায় উৎসাহ দিতেন। শ্রীরামকৃষ্ণের প্রতি গভীর প্রেমে তিনি তাঁর প্রতিটি বাক্য মেনে চলতেন। কিন্তু তিনি ছিলেন স্বাধীন, কখনও কারও কাছে মাথা নোয়াননি, মেয়েদেরও তিনি সাহস, আত্মবিশ্বাস অবলম্বন করতে উৎসাহ জোগাতেন। একবার তেলোভেলোর মাঠ পার হওয়ার সময় শ্রীশ্রীমা ডাকাতের সম্মুখীন হন,
 
সেসময় তিনি বয়সে তরুণী। তিনি বিচলিত না। হয়ে স্থিরভাবে ডাকাতের মুখোমুখি হয়ে বললেন, “বাবা, আমার সঙ্গীরা আমাকে ফেলে গেছে, আমি বোধহয় পথ ভুলেছি; তুমি আমাকে সঙ্গে করে যদি তাদের কাছে পৌঁছে দাও।” ইতোমধ্যে ডাকাতের স্ত্রীও এসেছে। শ্রীশ্রীমা তার হাত ধরে বললেন, “মা, আমি তোমার মেয়ে সারদা, সঙ্গীরা ফেলে যাওয়ায় বিষম বিপদে পড়েছিলুম; ভাগ্যে বাবা ও তুমি এসে পড়লে, নইলে কি করতুম বলতে পারি নে।” এইরকম সাহস প্রত্যেকের থাকা উচিত, যা আসে পবিত্রতা ও ঈশ্বরে বিশ্বাস থেকে এবং আমরা নিঃসঙ্গ নই, ঈশ্বর সর্বদা সঙ্গে রয়েছেন-এটি নিত্য স্মরণে রেখে।
একবার শ্রীশ্রীমা জয়রামবাটী থেকে বিষ্ণুপুর যাত্রা করেছেন। পথে একটি বন পেরোতে হয়, সেখানে ডাকাতের ভয়। পালকিতে বসে মায়ের পা ধরে গেছে, তাই মা দোকান দেখতে পেয়ে একটু তেল আনতে বললেন। সেইসময় মাকুদির জলতেষ্টা পাওয়ায় তিনিও জল খেতে চাইলেন। দোকানের সামনে ত্রিশ-বত্রিশজন মানুষের জটলা দেখে আর সকলে যখন ভয় পেলেন, মা তখন নির্বিকার বললেন পুকুরে গিয়ে জল খেয়ে আসতে। কোনও পরিস্থিতিতেই মা সাহস হারাতেন না।
অত্যাধুনিক নগরে এবং শহরেও কোনও না কোনও কুসংস্কার থাকেই। যেমন, বিধবারা মস্তক মুণ্ডন করবেন, তাঁরা কোনও অলংকার পরবেন না, বা পাড়যুক্ত শাড়ি পরবেন না। শ্রীরামকৃষ্ণের মহাসমাধির পর শ্রীশ্রীমা তাঁর হাতের বালা খুলে ফেলতে চেয়েছিলেন, কিন্তু শ্রীরামকৃষ্ণ তাঁর সামনে আবির্ভূত হয়ে বললেন, “আমি কি মরেছি যে, তুমি এয়োস্ত্রীর জিনিস হাত থেকে খুলে ফেলছ?” শ্রীশ্রীমায়ের হাতের বালা আর খোলা হল না, লালপাড় শাড়ি পরাও অব্যাহত রইল। তিনি বলতেন, “ঠাকুর আমাকে রেখে গেছেন ঈশ্বরের মাতৃভাব জগৎসংসারে প্রচারের জন্য।” শ্রীশ্রীমাকে দেখে নারীদের মধ্যে অর্থহীন কুসংস্কার এবং পাপের ভয়, যার সঙ্গে আধ্যাত্মিক জীবনের কোনও সম্পর্ক নেই তা ত্যাগ করার সাহস বিকশিত হয়ে উঠছে।
শ্রীশ্রীমা শান্তির উৎস। একটি বালবিধবা মেয়ে তাঁর কাছে এসেছে, শোকে দিশেহারা। মা তাকে নানাভাবে শান্ত করলেন, শেষে বললেন, “কচি বয়সে বিধবা হয়েছ, তাতে কি হয়েছে? ভগবান তোমাকে আজীবন একটি পুরুষের দাসত্ব থেকে মুক্তি দিয়েছেন। অল্পবয়সে বিধবা হয়েছ, এ তো মহা সৌভাগ্য!” কার কখন, কী কারণে মৃত্যু হবে, কেউই বলতে পারে না। মানুষের মৃত্যুর জন্য দায়ী তার আপন কর্মফল। অপরের কর্মের এতে কোনও ভূমিকা নেই। ঈশ্বরের ইচ্ছায় মানুষের জন্ম হয়, ঠিক সেভাবে তাঁরই ইচ্ছায় মানুষের মৃত্যু হয়। বৈধব্যও বহু শুভকর্মের ফলস্বরূপ হতে পারে। শ্রীরামকৃষ্ণের ভাইঝি লক্ষ্মীর যখন বিয়ে হয়, তিনি বলেছিলেন, “ও বিধবা হবে।” পাত্র নির্বাচন ঠিকঠাক হয়নি। লক্ষ্মী শীতলা দেবীর অংশ। দেবীর বিবাহ কোনও সাধারণ মানুষের সঙ্গে হতে পারে না। তাঁর বৈধব্য কোনও পাপের ফলে নয়, বরঞ্চ স্বামীর তুলনায় তাঁর মহত্তর সত্তার কারণে হয়েছিল।
মেয়েদের শ্রীশ্রীমা উপদেশ দিতেন, "মেয়েদের আসল অলংকার পবিত্রতা ও দিব্য ভাব। অতএব আপন পবিত্রতা রক্ষা করে চলবে। পরিবার, স্বামী, সন্তানের আস্থাভাজন হয়ে থাকতে হয়। পবিত্রতার চেয়ে মূল্যবান অলংকার আর হয় না। নিজের
২০০
========================
পরের পৃষ্ঠা 201---->

মধ্যে মাতৃত্বের প্রকাশ ঘটাও। এটাই তোমার একমাত্র কাজ। সরল ও অনাড়ম্বর জীবনযাপন করো।” শ্রীশ্রীমায়ের মতো সরল অথচ মহিমময়ী আর কাউকে আমরা দেখি না। সুস্বাস্থ্য, আধ্যাত্মিক চিন্তা ও পবিত্র চরিত্র-এই হল সৌন্দর্যের সংজ্ঞা। যখন মনে বিরাজ করে মহৎ চিন্তারাশি এবং সেইসঙ্গে প্রত্যেকের প্রতি হৃদয় থেকে উৎসারিত হয় মাতৃস্নেহ, এর থেকে বেশি সৌন্দর্য আর কী হতে পারে?
ভোগবাদী সমাজে শ্রীশ্রীমায়ের ধারণা সর্বদা প্রাসঙ্গিক, যেহেতু তিনি সমস্যার মূল দেখেন। তিনি শিখিয়েছেন, যা আছে তাই নিয়েই সন্তুষ্ট থাকতে হয়, জিনিসপত্র ব্যবহার করার সময় সাশ্রয়ের দিকটা দেখতে হয়। আনাজপাতি কিনে এনে ঝুড়িটা ফেলে দিতে নেই। কার্পণ্যও নয়, আবার বেহিসাবি খরচও নয়, এই দুইয়ের মাঝামাঝি অর্থাৎ মধ্যম পন্থা অবলম্বন। যখন প্রয়োজন, কেবল তখনই খরচ করতে হবে। শ্রীশ্রীমা বলতেন, "যার যেটি প্রাপ্য সেটি তাকে দিতে হয়। যা মানুষে খায়, তা গরুকে দিতে নেই; যা গরুতে খায়, তা কুকুরকে দিতে নেই; গরু ও কুকুরে না খেলে পুকুরে ফেললে মাছ খায় তবু নষ্ট করতে নেই।” মা খুবই সাশ্রয়ী ছিলেন, কোনওকিছু অপচয় করতেন না। একজন ঘর ঝাঁট দিয়ে ঝাঁটাটি ছুঁড়ে ফেললে মা বলেছিলেন, “ও কি গো, কাজটি হয়ে গেল, আর অমনি ওটি অশ্রদ্ধা করে ছুঁড়ে দিলে? ছুঁড়ে রাখতেও যতক্ষণ, আস্তে ধীর হয়ে রাখতেও ততক্ষণ। ছোট জিনিস বলে কি তুচ্ছবোধ করতে আছে? যাকে রাখ, সেই রাখে। আবার তো ওটি দরকার হবে? তাছাড়া, এ সংসারে ওটিও তো একটা অঙ্গ। সেদিক দিয়েও তো ওর একটা সম্মান আছে। যার যা সম্মান, তাকে সেটুকু দিতে হয়।
ঝাঁটাটিকেও মান্য করে রাখতে হয়। সামান্য কাজটিও শ্রদ্ধার সঙ্গে করতে হয়।"
শ্রীশ্রীমায়ের বেশ কৌতুকবোধ ছিল। আমাদের জীবনেও এর প্রয়োগ শিখতে হবে। সাংসারিক ঝড়ঝাপটার দিনেও আমাদের হাসিখুশি থাকা দরকার। নিজেকে নিয়ে হাসতে শেখা উচিত। একবার নিবেদিতা গভীর শ্রদ্ধা সহ শ্রীশ্রীমাকে বললেন, "মাতাদেবী, আপনি হন আমাদের কালী।” ক্রিস্টিনও ইংরেজিতে একই কথার পুনরাবৃত্তি করলেন। কথাগুলি শুনে মা হাসতে হাসতে বললেন, "না, বাপু, আমি কালীটালী হতে পারব না। জিব বার করে থাকতে হবে তাহলে।”১০ লীলাবসানের কিছুকাল আগে, খুব অসুস্থ অবস্থায় শ্রীশ্রীমাকে পথ্য হিসাবে কেবল বার্লি খেয়ে থাকতে হচ্ছিল। আগে তিনি সামান্য ফলমিষ্টি যা কিছু খেতেন, তার অবশিষ্টাংশ প্রসাদরূপে ভক্তদের মধ্যে বিতরণ করা হত। যখন কেবল বার্লি-জল খেয়ে থাকতেন, তখন মা বলতেন, “কি গো, আজ যে প্রসাদে ভক্তি নেই?"
এমন একটি সর্বাঙ্গসুন্দর কল্যাণময় জীবন অনুধ্যান করলে আমাদের সর্বতোমুখী কল্যা হবে। আমাদের বিনম্র প্রার্থনা, "মা, আমাদে মানুষ করো।"

---------------------
                  সহায়ক গ্রন্থ
১। স্বামী গম্ভীরানন্দ, শ্রীমা সারদা দেবী, উে
কার্যালয়, কলকাতা, ২০১২
প্রবন্ধটি 'Vedanta Kesari' পত্রিকার জা ২০০২ সংখ্যায় প্রকাশিত 'The Holy Mo প্রবন্ধের সুমনা সাহা কৃত অনুবাদ।
পৃষ্ঠা ২০১
======================
        (সংগ্রহীত)
      নিবোধত--39 বর্ষ,  সংখ্যা--3
      সেপ্টেম্বর----অক্টোবর
      পূজাসংখ্যা--2025

No comments:

Post a Comment