Friday, November 14, 2025

34>|| মাতৃপ্রসঙ্গ ||স্বামী সুহিতানন্দ

     34> ||  মাতৃপ্রসঙ্গ ||স্বামী সুহিতানন্দ

স্বামী সুহিতানন্দ

পরমপূজনীয় সহ সঙ্ঘাধ্যক্ষ, রামকৃষ্ণ মঠ ও রামকৃষ্ণ মিশন

এ কটি ব্যক্তিগত ঘটনা দিয়ে শুরু করি। ১৯৬৪ সাল, কাশীধামে স্বামী প্রেমেশানন্দ মহারাজ আছেন। তখন তিনি অন্ধ এবং অথর্ব। দিনরাত তাঁকে সেবা করতে হয়। আমিও তাঁর সেবকমণ্ডলীর মধ্যে একজন ছিলাম। রাত্রি দেড়টার সময় তাঁর সেবা করার জন্য গিয়েছি। নিজের পরিচয় দিয়ে আমি তাঁকে একটা প্রশ্ন করলাম-

আচ্ছা মহারাজ, ঠিক এইসময় আপনি কী ভাবছেন? উনি সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিলেন-সর্বব্যাপী শ্রীরামকৃষ্ণ।

তা আমি বললাম-মহারাজ, শ্রীরামকৃষ্ণ কী তা বুঝলাম। সর্বব্যাপী চৈতন্য বা ব্রহ্ম এটাও বুঝতে পারি; কিন্তু বুঝতে পারছি না যে সর্বব্যাপী এবং শ্রীরামকৃষ্ণ-এটা কীরকম করে হয়? উনি উত্তর দিলেন-হচ্ছে তো! এই বলে চুপ করে গেলেন। আমি আর কোনও প্রশ্ন করতে সাহস করলাম না। কিছুকাল পর আশুতোষ মিত্রের লেখা 'শ্রীমা' বইটি পড়ছিলাম। সেখানে দেখলাম, মা বলছেন, “একবার দেখি কী তা জান? দেখি না, ঠাকুর সব হয়ে রয়েছেন। যেদিকে দেখি, সেই দিকেই ঠাকুর। কানাও ঠাকুর, খোঁড়াও ঠাকুর, ঠাকুর ছাড়া আর কেউ নেই। একটা ডেয়ো পিঁপড়ে যাচ্ছে, রাধু তাকে মারবে-দেখলাম কি তা জান? দেখলাম সেটা পিঁপড়ে তো নয়, ঠাকুর। ঠাকুরের সেই নাক, কান, মুখ, চোখ-সব সেই। রাধিকে আটকালুম। ভাবলুম-তাই তো, সবই যে ঠাকুরের। আমি আর কী করতে পারছি। কজনকে দেখতে পাচ্ছি? তিনি যে সকলের ভার আমার উপর দিয়েছেন। সকলকে দেখতে পারতুম, তবে তো হত!” মায়ের জীবনের ঘটনাগুলি যদি আমরা পর্যালোচনা করি, তাহলে দেখতে পাব এই সর্বব্যাপী শ্রীরামকৃষ্ণের সাধনাই তাঁর জীবনের মূল সুর।

২০২

======================

পৃষ্ঠা====203

দেওঘরের ঘটনা। আমি সেইসময় সেখানকার দায়িত্বে। একদিন ঘরে গিয়েছি, হঠাৎ টেলিফোন বেজে উঠল। টেলিফোনের অপরপ্রান্তে এক ভদ্রমহিলা, তাঁর সন্তান দেওঘর বিদ্যাপীঠে পড়ে।

তিনি ব্যাকুল হয়ে আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, "মহারাজ ও কেমন আছে?” বললাম, "ভাল আছে।" উনি বললেন, "আপনি ঠিক বলছেন? ভাল আছে?” আমি বললাম, "হ্যাঁ, আমি এই তো দেখে এলাম, ও ফুটবল খেলছে, গোলপোস্টে আছে। গোলকিপার হয়ে খেলছে।” তবু উনি বললেন, "ঠিক বলছেন?" দুবার বললেন, তারপর ফোন ছেড়ে দিলেন। আবার ফোন বেজে উঠল।

আমাদের ইনডোর হসপিটাল থেকে ফোন এসেছে, ওই ছেলেটির কমপাউন্ড ফ্র্যাকচার হয়ে গেছে, ওকে এখনই কলকাতার হাসপাতালে পাঠাতে হবে।

এরকমভাবেই সকল মা তাঁদের সন্তানের কষ্ট বুঝতে পারেন বা সন্তানের জন্য কষ্ট অনুভব করেন। দেশ-কালের গণ্ডি ছাড়িয়ে এই যে মাতৃত্ব, দুনিয়ার সব মায়েদের হৃদয়ের এই যে অনুরণন, এটিকে যদি সাকার বিগ্রহ রূপ দেওয়া যায়, তাহলে সেই রূপটিই হবেন আমাদের মা সারদা। প্রেমেশানন্দ মহারাজ লিখেছেন, "নিখিলমাতৃ-হৃদয়সাগর-মন্থনসুধামুরতি।" পৃথিবীর সব মাতৃত্বকে যদি একত্র করা যায়, সেই মাতৃত্বের প্রকাশ বা সাকার রূপ শ্রীশ্রীমাকে বলা যাবে।

ভগিনী নিবেদিতা বলেছেন: সত্যই ভগবানের অপূর্ব রচনাগুলি সবই নীরব। তা অজানিতে আমাদের জীবনের মধ্যে প্রবেশ করে-যেমন বাতাস, যেমন সূর্যের আলো, বাগানের মধুগন্ধ, গঙ্গার মাধুরী-এইসব নীরব জিনিসগুলি সব তোমারই মতো (মায়ের মতো)।

মায়ের কাছে দীক্ষা নিতে প্রভু মহারাজ গেছেন জয়রামবাটীতে। মা তখন পুরনো বাড়িতে দীক্ষা দিতেন। মহারাজ দক্ষিণ ভারত থেকে এসেছেন,

বাংলা জানেন না। পরে তাঁকে প্রশ্ন করা হল-"মায়ের কথা আপনি বুঝতে পারলেন কী করে?" উনি বললেন, "কী জানি। আমি যা বললাম মা বুঝলেন, আবার মাও যা বললেন আমি সবই বুঝতে পারলাম।" আরও আকর্ষণীয়ভাবে একথা বলেছেন গুরুদাস মহারাজ-অতুলানন্দ স্বামী। তিনি জাতিতে ডাচ। আমেরিকায় তিনি স্বামীজীর সংস্পর্শে আসেন এবং ভারতবর্ষে চলে এসে জীবন দিয়ে স্বামীজীর সেবা করেন। তাঁকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল-"আপনি মায়ের সঙ্গে কী করে কথা বলেছিলেন দীক্ষার সময়?" তিনি বললেন অপূর্ব ভাষায়: "যখন শিশু মায়ের কোলে জন্ম নেয়, সে মায়ের সঙ্গে কোন ভাষাতে কথা বলে? আমিও ঠিক ওই ভাষাতেই মায়ের সঙ্গে কথা বলেছিলুম।"

মায়ের এই বিশ্বমাতৃত্বকে কীভাবে বুঝব? শ্রীরামকৃষ্ণ বলেছেন, ঈশ্বরলাভ না হলে বোঝা যায় না যে স্ত্রীলোক কী বস্তু। সুতরাং শ্রীশ্রীমায়ের ভিতরে 'স্ত্রীভাবটি কী রূপে ছিল ঠাকুরই বুঝেছিলেন, স্বামীজীও কিছুটা বুঝেছিলেন। অনেক সাধক অনুভব করেন-তোতাপুরীর মতো-জলে মা, স্থলে মা, অন্তরিক্ষে মা-"ঘটে ঘটে বিরাজ করেন।” এই সর্বব্যাপী রূপটি কোনও কোনও ভাগ্যবান সাধক উপলব্ধি করে থাকেন।

প্রেমেশানন্দ মহারাজের মুখে আর একটি ঘটনা শুনেছিলাম। একবার তিনি জয়রামবাটী গিয়েছেন। মা ঠাকরুন পা মেলে বসে আছেন, মহারাজ গিয়ে

মাকে প্রণাম করলেন। মায়ের ঘোমটা টানা আছে, মুখটা দেখা যাচ্ছে না। উনি বাচ্চা ছেলের মতন ঘোমটার তলা দিয়ে মায়ের মুখখানি দেখার চেষ্টা করছেন। দেখছেন মায়ের দুটি চোখ যেন দুটো জ্বলন্ত টর্চ। মহারাজ মজা করে বলছিলেন, "মা বেটি এইরকম করেই সমাধিস্থা থাকতেন।” মায়ের মন সবসময় না জানি কোন উঁচুস্তরে থাকত! পতঞ্জলির যোগসূত্রে আছে, একে বলে 'ধর্মমেঘ সমাধি'।

২০৩

====================

পৃষ্ঠা--204


পৃষ্ঠা--204

যখন জগতের সবকিছু সাধকের করতলগত তখনও। তিনি জগতের ঐশ্বর্য থেকে সম্পূর্ণ নিস্পৃহ থাকেন। এই সমাধির নাম ধর্মমেঘ সমাধি। মা এইরকম একটা অবস্থায় থাকতেন। এইরকম ধর্মমেঘ অবস্থাতেই তাঁর প্রতিটি চলন, বলন, কথাবার্তা-যার দ্বারা জগতের কল্যাণ ছাড়া আর কিছুই হয় না।

সুহাসিনী দেবী একবার অনুযোগ করে মাকে বলেছিলেন, "আমরাও তো আপনার পেটে হইনি, তা বলে কি আমরা আপনার ছেলেমেয়ে নই?" শুনে মা বললেন, "কী বললে, আমার পেটে হওনি? তবে কার পেটে হয়েছ? আমার ছেলেমেয়ে নও? তবে কার ছেলেমেয়ে? আমি ছাড়া মা আর কেউ আছে নাকি? সব মেয়ের ভেতরেই আমি, সব মায়ের মধ্যেই আমি রয়েছি। যে যেখান থেকেই আসুক সব্বাই আমার ছেলেমেয়ে। এটা সত্যি সত্যি জানবে।"

শ্রীরামকৃষ্ণ শ্রীমা সম্পর্কে বলেছেন, "ও কি যে সে? ও আমার শক্তি।" বলেছেন, "ও সারদা, সরস্বতী, জ্ঞান দিতে এসেছে।" স্বামীজীও বলেছেন, "রামকৃষ্ণ পরমহংস ঈশ্বর ছিলেন কি মানুষ ছিলেন, যা হয় বলো... কিন্তু যার মায়ের উপর ভক্তি নাই, তাকে ধিক্কার দিও।"

স্বামীজী, বলরামবাবু, রাজা মহারাজ, বাবুরাম মহারাজ, নিরঞ্জন মহারাজ-এঁরা শ্রীরামকৃষ্ণের সময় থেকেই ঈশ্বরজ্ঞানে মাকে হহৃদয়ের ভক্তি, ভালবাসা দিয়েছেন। বলরামবাবুই হোন বা গিরিশবাবু, প্রত্যেকেই সমাজে লব্ধপ্রতিষ্ঠ। প্রায় সকলেই সচ্ছল পরিবারের ছেলে এবং উচ্চশিক্ষিত। এমন মানুষ তাঁরা কেউই নন যে, মা-ঠাকরুন শুধু পরমহংসদেবের স্ত্রী বলেই তাঁরা মনপ্রাণ তাঁর পায়ে সঁপে দেবেন। মা তাঁর নিজস্ব মর্যাদায়, তাঁর সাধনাতে, তাঁর পবিত্রতাতে, তাঁর সিদ্ধিতে-এমন একটা পর্যায়ে ছিলেন যে, যখন শ্রীরামকৃষ্ণ

স্কুলদেহে নেই, মায়ের সঙ্গে তাঁদের কোনও প্রত্যক্ষ যোগাযোগ নেই, তবু মাকে না দেখতে পেয়েও তাঁরা হৃদয়ের ভক্তি মায়ের প্রতি উজাড় করে দিয়েছেন।

মায়ের আশীর্বাদে তাঁর এই অপরূপ রূপ আমরা পেয়েছি। শ্রীরামকৃষ্ণের মাত্র চারখানা ছবি আমরা পাই। তুলনায় মায়ের অনেক ছবি পাওয়া গেছে। এর জন্য আমরা কৃতজ্ঞ আশুতোষ মিত্র এবং গণেনের কাছে। তাঁরাই মায়ের রূপটি ধরে রেখেছেন। এক্ষেত্রেও মায়ের মাতৃত্বই দেখা যায়। লজ্জাপটাবৃতা মা ধ্যান করছেন, পুজো করছেন-সেইসব ছবি সন্তান তুলছেন। মা আপত্তি করছেন না। কেন? মা বলেছিলেন, "ছেলেদের জন্য আমি সব করতে পারি।" ঘটনাটি এইরকম উদ্বোধনে মায়ের একদিন দুপুরে প্রসাদ পাওয়া হয়ে গেছে। দেখা গেল যে একজন সন্তান আসবে কিন্তু তাকে দেওয়ার মতো প্রসাদ নেই। তখন মা আবার একটু অন্ন নিয়ে প্রসাদ করে দিলেন। তা দেখে পরে একজন তাঁকে বলল, "মা, আপনি বামুনের মেয়ে হয়ে দুবার ভাত খেলেন-মুখ এঁটো করলেন?” মা উত্তর দিলেন, "ছেলেদের কল্যাণের জন্য আমি সব করতে পারি।" সন্তানদের জন্য সব করতে পারেন বলেই দুর্লভ সম্পত্তির মতো মায়ের এই ছবিগুলি আমরা পেয়েছি।

তাছাড়া রয়েছে মায়ের লীলা। লীলা না করলে মানুষের পক্ষে অবতারের ভাব চিন্তা করা বড় কঠিন।

মানুষের ধীরে ধীরে আধ্যাত্মিক উন্নতি হবে। মু সেজন্য আমাদের মতো হয়ে তাঁরা নেমে আসেন, এসে মানুষের মতো ব্যবহার করেন। মায়ের লীলায় দেখি অতুলনীয় সেবিকার রূপ। এটিই সর্বব্যাপী শ্রীরামকৃষ্ণের পূজা। অনন্ত মাধুর্য নিয়ে তিনি সর্বব্যাপী শ্রীরামকৃষ্ণের সেবিকারূপে আবির্ভূতা হয়েছেন। তাঁর এইসব লীলা চিন্তা করতে করতে মানুষের ধীরে ধীরে  আধ্যাত্মিক উন্নতি হবে।

২০৪

 ( সংগ্রহীত)

       নিবোধত

     পূজাসংখ্যা--2025

XXXXXXXXXXXXXXX

====================


No comments:

Post a Comment